Monday, 4 April 2016

নববর্ষ উদযাপন ও বর্তমান বাংলাদেশ

নববর্ষ উদযাপন ও বর্তমান বাংলাদেশ
ড. একে এম শাহনাওয়াজ | প্রকাশ : ১৬ এপ্রিল ২০১৫
ঋতুর বিচিত্র খেয়ালে প্রকৃতি নববর্ষের দিনে এবার রুদ্ররূপে সাজেনি। তবুও বৈশাখ আবহমান বাঙালি সত্তার কথাই মনে করিয়ে দেয়। বৈশাখে আকাশ যেমনই থাক, তবু কল্পনায় কালো করে আসা মেঘ, বজ্রের ডমরু, উন্মাতাল ঝড় প্রতিবাদী বাঙালির প্রতীক হয়েই আছে। এবার চৈত্রের শেষেই কয়েকটি বজ্র-বর্ষণ হয়ে গেছে। গ্রীষ্মের খরতাপে বিপর্যস্ত জীবনে বারিধারার অমিয় বর্ষণে নরম হয়ে যাওয়া বিগলিত মাটি বাঙালির কোমল হৃদয়কেই যেন মেলে ধরে। বাঙালি জীবনের এ বিচিত্র রূপের মোহনীয় আবেশে নতুন বছরের যাত্রা শুরু হয়েছে দু’দিন আগে। নানা রঙে রাঙিয়ে সব আয়োজনের ডালি সাজিয়ে বাঙালি নববর্ষ বরণ করেছে। রংবেরঙের পোশাকে ঢাকঢোল আর নানা বাদ্যে মাতোয়ারা সব কণ্ঠে সুধা ঢেলে সুর লহরি ছড়িয়ে দিয়েছে ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো’। কবিগুরুর মতো আমাদের প্রত্যাশা, যা কিছু গ্লানি যা কিছু জরা- সব ধুয়ে মুছে যাক। বৃষ্টি ধোয়া আকাশ আর প্রকৃতি যেমন নিষ্পাপ-নির্দোষ, তেমনি আবেশ মেখেই যেন নতুন বছরের শুভ উদ্বোধন হয়েছে। ঢাকের শব্দে মাতোয়ারা হয়েছে চারপাশ। চঞ্চল হয়ে উঠেছে ঢুলির হাতের কাঠি। নাচ-গানে ছন্দময় হয়েছে চারপাশ। পিঠাপুলি আর পায়েসের মৌ মৌ গন্ধ ছড়িয়ে দিয়েছে দখিনা বাতাস।
বৈশাখ এভাবে বারবার আসে নিজের চিরপরিচিত সাজে। সমাজ ও রাজনীতির অসুস্থ অবয়ব প্রতিবার শুদ্ধ করতে যেন অপেক্ষা করতে হয় বৈশাখের। ক্ষমতার রাজনীতির প্রচণ্ড স্বার্থপরতা ও অমানবিক আচরণ বিপর্যস্ত করে তুলেছে সংগ্রামী বাঙালির জীবন। সম্প্রতি রাজনীতির নামে অতিষ্ঠ করে তুলেছে জনজীবন এ দেশেরই রাজনীতি অঙ্গনের মানুষ। এজন্য সংশ্লিষ্ট রাজনীতিকদের কোনো পরোয়া যেন নেই। কোনো ক্ষমা ভিক্ষা নয়, নয় দুঃখ প্রকাশ বা সমবেদনা জানানো। আবহমান বাঙালির জীবনবোধের সঙ্গে এর কোনো মিল নেই।
তবে মানতে হবে, সব অনাচার থেকে বাঙালিকে মুক্ত করতে বৈশাখ বরাবরই প্রাসঙ্গিক। সময়ের প্রয়োজনে বারবারই নিজের রূপে পরিবর্তন এনেছে সে। আজ যেভাবে নানা রঙে-বর্ণে বৈশাখের আয়োজন, আদিতে এমনভাবে নববর্ষের আয়োজন হয়নি। বাঙালির পঞ্জিকা বৈদিক যুগের সৌর পঞ্জিকার ধারাতেই তৈরি হয়েছিল। উৎসটি অভিন্ন থাকায় মিথিলা, আসাম, কেরালা, তামিলনাড়–, উড়িষ্যা, পাঞ্জাব, নেপাল, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, শ্রীলংকা ইত্যাদি জায়গার মতো মধ্য এপ্রিলে বাংলায় নববর্ষ পালিত হতো।
মোগলযুগের প্রথম দিকে হিজরি সন অনুযায়ী খাজনা আদায় করা হতো। তবে এতে সমস্যা ছিল। হিজরি সন তৈরি হয়েছে চান্দ্র পঞ্জিকা অনুসরণ করে। কৃষকের ফসল তোলার সঙ্গে এর সম্পর্ক নেই। তাই বিরুদ্ধ ঋতুতে খাজনা পরিশোধ করা কৃষকের জন্য কষ্টসাধ্য ছিল। এ বাস্তব সংকটটি সম্রাট আকবরের দৃষ্টিগোচর হয়। তিনি এর সমাধান খোঁজার দায়িত্ব দেন সে সময়ের প্রখ্যাত পণ্ডিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফতেহউল্লাহ সিরাজীকে। সিরাজী বৈদিক সৌর পঞ্জিকা ও হিজরি চান্দ্র পঞ্জিকার সমন্বয়ে বাংলা সন হিসাবের জন্য একটি পঞ্জিকা তৈরি করলেন। একে সম্পর্কিত করা হল কৃষকের ফসল কাটার সময়ের সঙ্গে। সাধারণের মুখে মুখে সনটির নাম হয়ে গেল ফসলি সন। অর্থাৎ কৃষিবর্ষ। পরে এ সনের নাম হয় বঙ্গাব্দ। সম্রাটের উদ্দেশ্য পরিষ্কার ছিল। কৃষকের গোলায় ফসল উঠবে। খাজনা পরিশোধে তাকে কোনো চাপে পড়তে হবে না। নতুন বাংলা সনের প্রবর্তন হয় বৈশাখ মাসের প্রথম দিন। তখন ইংরেজি ক্যালেন্ডারে তারিখ ছিল ১৫৮৪ সালের ১০ অথবা ১১ মার্চ। তবে এই সন গণনা কার্যকর হওয়ার কথা ঘোষণা করা হয় সম্রাট আকবরের সিংহাসনে বসার দিন থেকে। অর্থাৎ ১৪ ফেব্র“য়ারি (মতান্তরে ৫ নভেম্বর) ১৫৫৬ সালে।
এসব ইতিহাসের সন-তারিখ বাদ দিলেও বলা যায়, নববর্ষ আদিকাল থেকে বাঙালি ঋতুভিত্তিক উৎসব হিসেবে পালন করত। কৃষির সঙ্গে ছিল এর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। ইরানি ভাবধারার প্রভাবে মোগলরা জমকালোভাবে নববর্ষ বা নওরোজ উৎসব পালন করত। বাংলা নববর্ষ প্রবর্তিত হওয়ার পর থেকে দিনটি সাড়ম্বরে উদযাপিত হতে থাকে। সম্রাট আকবরের সময় থেকে (১৫৫৬-১৬০৫) বিশ শতকে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলার গ্রাম-গঞ্জে আনন্দ-উদ্দীপনায় নববর্ষ পালিত হতো। বুঝতে হবে আজকের কলুষিত রাজনীতি এবং সামাজিক ও প্রশাসনিক দুর্নীতিকবলিত জীবনবোধের সঙ্গে আবহমান বাঙালির ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতার কোনো সম্পর্ক নেই।
জমিদারি যুগে নববর্ষ পালনে বিশেষ রেওয়াজ ছিল। জমিদার ও ছোট-বড় ভূস্বামীদের কৃষক চৈত্রের শেষ দিন পর্যন্ত খাজনা পরিশোধ করত। নববর্ষের দিন প্রসন্ন চিত্তে জমিদাররা প্রজাদের মিষ্টিমুখ করাতেন। এ উপলক্ষে মেলাসহ নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। জমিদারদের মাধ্যমে এমনি করে আনুষ্ঠানিকভাবে নববর্ষ পালনের যাত্রা শুরু হয়। পরে বাঙালির জীবনে পহেলা বৈশাখ একটি বড় উৎসবে পরিণত হয়। জমিদারদের এ ধরনের অনুষ্ঠানের একটি বৃহত্তর রূপ ছিল পুণ্যাহ অনুষ্ঠান। প্রথমদিকে পুণ্যাহের সঙ্গে বাংলা নববর্ষের সরাসরি সম্পর্ক ছিল না। পরে উনিশ শতকের মাঝামাঝি পুণ্যাহ অনুষ্ঠান নববর্ষের একটি অনুষ্ঠানে পরিণত হয়। ব্রিটিশ-পূর্ব যুগে বিশেষ করে নবাবি আমলে পুণ্যাহ অনুষ্ঠানের প্রচলন ছিল বলে জানা যায়। এটি ছিল নবাব বা নবাবের দিউয়ানের কাছে জমিদার ইজারাদারদের বার্ষিক খাজনা পরিশোধের অনুষ্ঠান। খাজনা পরিশোধের ওপর ভিত্তি করে এদিন নতুন করে ভূমি বন্দোবস্ত দেয়া হতো। আনুষ্ঠানিকতার সঙ্গে নবাব ভূমি বন্দোবস্ত পাওয়ার যোগ্য জমিদার ইজারাদারদের সম্মানসূচক পোশাক পরিয়ে দিতেন। একইভাবে জমিদার তার প্রজাদের জন্য পুণ্যাহ পালনের অনুষ্ঠান করতেন। পুণ্যাহ উপলক্ষে নাচ-গান, যাত্রা-পালা, নৌকাবাইচ ইত্যাদি বিনোদনের আয়োজন করা হতো। সে যুগে নববর্ষ ঘিরে নয়, ফসল কাটাকে কেন্দ্র করেই পুণ্যাহের উৎসব হতো। উনিশ শতকের মাঝপর্বে এসে পুণ্যাহ অনুষ্ঠান নববর্ষের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। এরপর থেকে প্রতিবছর পহেলা বৈশাখে নিয়মিতভাবে পুণ্যাহ উদযাপন হতে থাকে। ১৯৫০ সালে জমিদারি ব্যবস্থার বিলোপ ঘটার পর থেকে পুণ্যাহ উৎসবেরও অবসান ঘটে। এই যে পারস্পরিক দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধের মধ্য দিয়ে জীবনযাত্রার ভারসাম্য, তা কি আমরা রক্ষা করতে পেরেছি বর্তমানের কঠিন বাস্তবতায়। রাজনীতির কুশলী শব্দে সাধারণ নাগরিককে রাষ্ট্রের মালিক বলছি আর প্রতিদিন তাদের জীবনকে করে তুলছি বিষময়।
যুগ যুগ ধরে ব্যবসায়ী, কৃষক ও নাগরিক সমাজের মানুষ ভিন্ন ভিন্ন গুরুত্ব ও বৈচিত্র্য নিয়ে নববর্ষ পালন করত। এখনও বনেদি ব্যবসায়ীর কাছে নববর্ষ একটি পবিত্র দিন। এ ধারার ব্যবসায়ীরা বাংলা সনের হিসাবেই সাধারণত ব্যবসা পরিচালনা করে থাকেন। তাই ব্যবসাকে ঘিরে হালখাতা ও খেরোখাতা দুটি শব্দের বাস্তবতা অনেক বেশি প্রত্যক্ষ। হালখাতা উৎসব উপলক্ষে নববর্ষের আগেই যথাসম্ভব বাকি আদায় করা হয়। হালখাতা অর্থাৎ নববর্ষের দিন হিন্দু ব্যবসায়ী নিয়মমতো পূজা-অর্চনা করে সবার মধ্যে মিষ্টি বিতরণ করেন। মুসলমান ব্যবসায়ী মিলাদ পড়ে মিষ্টি বিতরণ করেন। এভাবে একটি অসাম্প্রদায়িক চরিত্র নিয়ে যুগে যুগে নববর্ষ আমাদের সামনে এসে উপস্থিত হয়েছে।
প্রাচীনকাল থেকেই বাংলার কৃষকের কাছে নববর্ষ একটি পবিত্র দিন। তাদের বিশ্বাস, নববর্ষের দিন ভালো কাটলে এর প্রভাব সারা বছর প্রতিফলিত হবে। নববর্ষকে কৃষিজীবী মানুষ কৃষির সাফল্যের প্রত্যাশায় বিশেষভাবে বরণ করত। এদিন ঘরবাড়ি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হতো। চেষ্টা করা হতো ভালো খাবার পরিবেশন করতে। নতুন কাপড় কেনার সামর্থ্য না থাকলে মানুষ ধোয়া কাপড় পরত। আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব পরস্পরের খোঁজখবর নিত। শুভেচ্ছা বিনিময় করত। গ্রামে গ্রামে গেরস্থের বাড়িতে হরেক পিঠাপুলিসহ নানা লোকজ খাবারের আয়োজন করা হতো। গ্রামেগঞ্জে বৈশাখী মেলার আয়োজন ছিল নববর্ষের বিশেষ আকর্ষণ। এ সময় কৃষকের গোলায় থাকত ধান, ট্যাকে থাকত টাকা। ফলে নববর্ষের অনুষ্ঠান হতো আনন্দঘন।
নগরকেন্দ্রিক বৈশাখী উৎসবে একটি নতুন মাত্রা যুক্ত হয় ১৯৬৫ সালে। পাকিস্তানি শাসকরা বাঙালি সংস্কৃতির ওপর আঘাত হানতে শুরু থেকেই সক্রিয় ছিল। একপর্যায়ে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের আমলে রবীন্দ্র চর্চার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পাঁয়তারা চলতে থাকে। এই অশুভ উদ্দেশ্যকে মোকাবেলা করার জন্য ঢাকার সাংস্কৃতিক কর্মীরা ছায়ানট নামে সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে তোলে। বাঙালি সংস্কৃতি লালন করার জন্য ছায়ানট পথে নেমে আসে। নববর্ষের প্রত্যুষে ঢাকায় রমনার বটমূলে সঙ্গীত মূর্ছনার মধ্য দিয়ে শুরু করে নববর্ষের আনন্দ আয়োজনের। এই আনন্দ পল্লবিত হয় নগরীর নানা অলিগলিতে, যা এখনও অব্যাহত রয়েছে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিকটি হচ্ছে বাংলা নববর্ষের ঐতিহ্যিক শক্তি। অভিন্ন ছাতার নিচে বাঙালি জাতিকে এমনভাবে একত্রিত করার আর কোনো দিবস আমাদের নেই। একটি জাতির পরিপূর্ণ বিকাশে সাংস্কৃতিক শক্তির ভূমিকা সবচেয়ে প্রবল। এই সাংস্কৃতিক শক্তি সঞ্জীবিত করার জন্য এমন প্রণোদনা প্রদায়ী আর কোনো দিবস বাংলা নববর্ষের বিকল্প হতে পারে না। প্রমাণ তো আমরা বারবার পেয়েছি। শোষক আর নিপীড়ক শক্তি যুগে যুগে ভয় পেয়েছে বাঙালি শক্তির আবাহনকে। তাই এককালে সেন রাজারা বাঙালির সংস্কৃতি চর্চাকে উপড়ে ফেলতে চেয়েছিল। ব্রাহ্মণ সেন রাজারা শূদ্র অভিধায় কোণঠাসা করে রাখা বাঙালির শিক্ষা চর্চাকে নিষিদ্ধ করেছিল। একইভাবে সংস্কৃতিশূন্য করে দেয়ার জন্য বাংলা ভাষাকে গ্রাস করতে চেয়েছিল পাকিস্তানি শাসকচক্র। কিন্তু বাঙালির দৃঢ়তা ও আত্মত্যাগে তা সম্ভব হয়নি। স্বাধীন বাংলাদেশেও কি এই ষড়যন্ত্র থেমে ছিল? একই মানসিকতার শক্তি রমনার বটমূলে বোমা হামলায় মর্মান্তিকভাবে মানুষ হত্যা করে বাঙালির সংস্কৃতি চর্চাকে স্তব্ধ করে দিতে চেয়েছে। কিন্তু লাভ হয়নি। যুগ যুগ ধরে নববর্ষে সংস্কৃতি চর্চার যে নবায়ন, তা বাঙালির আত্মপ্রত্যয়কে বেগবান করেছে। ফলে বোমা হামলার পরের বছর থেকে নববর্ষে বাঙালি মুখরিত হয়েছে আরও অনেক শক্তি নিয়ে। রাজধানীকেন্দ্রিকতা ছাড়িয়ে সমগ্র দেশে নববর্ষের আনন্দ মিছিল পল্লবিত হয়েছে।
এই বাস্তবতা বলে দেয়, নববর্ষ উদযাপন শ্রেণী-ধর্ম নির্বিশেষে বাঙালির যে মিলনমেলা- এর প্রচণ্ডতা সব পংকিলতা ও অন্যায় থেকে বাঙালিকে রক্ষা করবে। এ সত্য সুবিধাবাদী ও লোভীগোষ্ঠী যত তাড়াতাড়ি বুঝতে পারবে, ততই সবার মঙ্গল।
ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

বিশ্বনবী (সা.)-এর মেরাজ

বিশ্বনবী (সা.)-এর মেরাজ
মো. লুৎফুর রহমান    ২৩ মে, ২০১৪ ০০:০০  173 শেয়ার মন্তব্য()প্রিন্ট

অ- অ অ+

আমাদের কাছে শবে মেরাজ খুবই পরিচিত একটি নাম। বিশ্বে এ দিবসকে মুসলমানরা পালন করে থাকে নানা আয়োজনে- সভা, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও মিলাদ-মাহফিলের মাধ্যমে। রেডিও, টিভি ও সংবাদপত্রে এ দিবসে প্রবন্ধ, নিবন্ধ ও খবর প্রচার হয়ে থাকে। (যদিও এসব কাজে সওয়াব অর্জনের কথা শরিয়তে প্রমাণিত নয়)

'মেরাজ' মূলত মানুষের ইতিহাসে একটি বিস্ময়কর ঘটনা। মেরাজ মানে ঊর্ধ্বারোহণ। কিন্তু এই ঊর্ধ্বারোহণ কোনো সাধারণ ঊর্ধ্বারোহণ নয়, আকাশে কিংবা চাঁদে যাওয়া নয়, মঙ্গল গ্রহে যাওয়াও নয়। এটি হলো এমন ঊর্ধ্বারোহণ, যেখানে আরশে আজিম অর্থাৎ আল্লাহপাকের আরশ কুরছি ও লওহে মাহফুজ (পবিত্র কোরআন যেখানে সংরক্ষিত) রয়েছে। ঠিক সেখানেই রাসুলে পাক (সা.)-এর গমন।

এটি সত্যি বিস্ময়কর একটি ঘটনা শুধু ইতিহাসের জন্য নয়, বিজ্ঞানের জন্যও। যখন বিমান কিংবা রকেটের আবিষ্কার হয়নি, তখন একজন মানুষ যন্ত্রবিহীন পৃথিবী ছেড়ে সাত আসমান ভেদ করে 'সর্বশেষ ফটক' বা ছিদরাতুল মুনতাহা ভেদ করে স্বয়ং আল্লাহর সান্নিধ্যে উপস্থিত হওয়া এবং সেখানে অবস্থান করে পৃথিবীর মানুষের জন্য সৃষ্টিকর্তার সব নিদর্শন দেখে ও নির্দেশনামা নিয়ে আবার পৃথিবীর বুকে অক্ষত অবস্থায় ফিরে আসা এক অকল্পনীয় বিস্ময়।

এখানে উল্লেখ্য যে ছিদরাতুল মুনতাহা হলো সেই ফটক, যে ফটকে হজরত জিবরাইল (আ.) এবং অন্য ফেরেশতাদেরও যাওয়ার কোনো অনুমতি নেই।

প্রথম ঘটনা : যাহোক, বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে সেই সর্বশেষ ফটক অতিক্রম করে আল্লাহর সামনে উপস্থিত হওয়ার মতো ঘটনা স্বয়ং আল্লাহই প্রকাশ করেছেন বিস্ময়সূচক 'সুবহান' শব্দ ব্যবহার করে। যেমন সুরা বনি ইসরাইলে প্রথমেই সুবহানাল্লাজি আসরা বি-আবদিহি...বলে এ ঘটনার সূত্রপাত করেছেন অর্থাৎ 'পবিত্র ও মহিমান্বিত (সেই আল্লাহ!) যিনি তাঁর (এক) বান্দাকে রাতের বেলায় মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসায় নিয়ে গেলেন, যার পারিপাশ্বর্িকতাকে আমি (আগেই) বরকতপূর্ণ করে রেখেছিলাম, যেন আমি তাকে আমার (দৃশ্য-অদৃশ্য) দেখাতে পারি, (মূলতঃ) সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা তো স্বয়ং তিনিই।' (বনি ইসরাইল : ১)।

নবীদের সঙ্গে নামাজ : ইবনে কাইয়েম লিখেছেন, সঠিক বর্ণনানুযায়ী জানা যায়, নবী সাইয়েদুল মুরসালিনকে স্বশরীরে বোরাকে তুলে হজরত জিবরাইল (আ.)-এর সঙ্গে মসজিদে হারাম থেকে প্রথমে বায়তুল মাকদাস পর্যন্ত ভ্রমণ করানো হয়। নবী করিম (সা.) সেখানে মসজিদের খুঁটির সঙ্গে বোরাক বেঁধে যাত্রাবিরতি করেন এবং সব নবীর ইমাম হয়ে নামাজ আদায় করেন।

প্রথম আসমানে প্রবেশ : এরপর সে রাতেই রাসুল (সা.)-কে বায়তুল মাকদাস থেকে প্রথম আসমানে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে নবী (সা.) হজরত আদম (আ.)-কে সালাম করেন। হজরত আদম প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.)-কে মারহাবা বলে সালামের জবাব দেন। তাঁর নবুয়তের স্বীকারোক্তি করেন। তখন আল্লাহপাক হজরত আদম (আ.)-এর ডানদিকে নেককার ও বামদিকে পাপীদের দেখান প্রিয় নবী (সা.)-কে।

দ্বিতীয় আসমানে প্রবেশ : প্রথম আকাশ থেকে হজরত জিবরাইল (আ.) নবী (সা.)-কে নিয়ে দ্বিতীয় আসমানে যান। আকাশের দরজা খুলে দেওয়া হয়। সেখানে সাক্ষাৎ হয় হজরত জাকারিয়া (আ.)-এর সঙ্গে। সাক্ষাতেই নবী (সা.) সালাম করেন। সেখানে হজরত ঈসা ইবনে মরিয়মও ছিলেন। সালাম বিনিময় শেষে তাঁরা আখেরি নবীর নবুয়তের স্বীকৃতি দেন।

তৃতীয় আসমানে প্রবেশ : এরপর রাসুল (সা.)-কে হজরত জিবরাইল (আ.) তৃতীয় আসমানে নিয়ে গেলেন। সেখানে সাক্ষাৎ হয় হজরত ইউসুফ (আ.)-এর সঙ্গে। এখানে সালাম বিনিময় হয়। নবী (সা.)-কে তিনি স্বাগত জানান।

চতুর্থ আসমানে প্রবেশ : তৃতীয় আকাশ থেকে চতুর্থ আকাশে যান। সঙ্গে হজরত জিবরাইল (আ.)। সেখানে সাক্ষাৎ হয় হজরত ইদ্রিস (আ.)-এর সঙ্গে। দুজন দুজনকে সালাম করেন। এরপর হজরত ইদ্রিস (আ.) নবী (সা.)-কে মোবারকবাদ জানান এবং তাঁর নবুয়তের স্বীকৃতি দেন।

পঞ্চম আসমানে প্রবেশ : এরপর রাসুল (সা.)-কে পঞ্চম আকাশে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তিনি হজরত হারুন (আ.)কে দেখে সালাম দেন। তিনি সালামের জবাবে মোবারকবাদ জানান এবং তাঁর নবুয়তের কথা স্বীকার করেন।

ষষ্ঠ আসমানে প্রবেশ ও মুসা (আ.)-এর ক্রন্দন : নবী (সা.)-কে এরপর ষষ্ঠ আকাশে নেওয়া হয়। সেখানে সাক্ষাৎ হয় হজরত মুসা (আ.)-এর সঙ্গে। তিনি সালাম করেন। হজরত মুসা (আ.) তাঁকে স্বাগত জানান এবং রাসুলের নবুয়তের স্বীকার করেন। এরপর নবী (সা.) সামনে এগিয়ে গেলেন। তখন হজরত মুসা (আ.) কাঁদতে লাগলেন। নবী (সা.) জানতে চাইলেন আপনি কাঁদছেন কেন? হজরত মুসা (আ.) বললেন, আমার পরে একজন নবী আবির্ভূত হয়েছেন তাঁর উম্মতরা আমার উম্মতের চেয়ে সংখ্যায় বেশি জান্নাতে যাবে।

সপ্তম আসমানে প্রবেশ : নবী করিম (সা.)-কে এরপর সপ্তম আকাশে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। তিনি তাঁকে সালাম করেন। হজরত ইবরাহিম (আ.) সালামের জবাব দেন এবং নবী পাক (সা.)-কে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন ও তাঁর নবুয়তের কথা স্বীকার করেন।

সিদরাতুল মুনতাহা পার হওয়ার ঘটনা : প্রথম আসমান থেকে সপ্তম আসমান পর্যন্ত যাওয়ার পর নবী (সা.)-কে সিদরাতুল মুনতাহায় নিয়ে যাওয়া হয়। এটি আল্লাহর কাছে পৌঁছার প্রথম গেট। যে গেট দিয়ে হজরত জিবরাইল (আ.)ও যেতে পারেন না। এরপর নবী (সা.) একাই আল্লাহপাকের আরশে পৌঁছে যান। সেখানে পৌঁছার পর নবী (সা.) আল্লাহকে অভিবাদন জানিয়ে বলেন, 'আত্তাহিয়াতু লিল্লাহ...। আল্লাহ পাক জবাবে বলেন, আস্সালামু আলাইকা আইয়ুহান্নাবি। আল্লাহপাকের সালামের জবাবে রাসুল (সা.) বলেন, আস্সালামু আলাইনা ওয়ালা ইবাদিল্লাহিস সালেহিন। এরপর আল্লাহপাক নবী (সা.)-কে যা দেওয়ার দিয়ে দেন, যা ইচ্ছা ওহি নাজিল করেন এবং ৫০ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করেন।

পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ অর্জন : আরশে আজিমের সেই মহা সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক, উপঢৌকন ও নামাজের আদেশ পেয়ে ফেরার পথে সাক্ষাৎ হয় হজরত মুসা (আ.)-এর সঙ্গে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন আপনাকে আল্লাহ কী কাজের আদেশ করেছেন? নবী (সা.) বললেন, ৫০ ওয়াক্ত নামাজ। হজরত মুসা (আ.) বললেন, আপনার উম্মত এত নামাজ আদায়ের শক্তি রাখে না। আপনি আল্লাহর কাছে ফিরে গিয়ে নামাজ কমিয়ে আনার দরখাস্ত করুন। এ সময় নবী (সা.) হজরত জিবরাইল (আ.)-এর দিকে তাকালে তিনি ইশারা করলেন। এরপর নবী (সা.) ফিরে গিয়ে নামাজ কমিয়ে দেওয়ার আবেদন করলে আল্লাহপাক ৪৫ ওয়াক্ত নামাজ দান করেন। ফিরে আসার পথে আবার মুসা (আ.) জিজ্ঞেস করেন এবং ৪৫ ওয়াক্ত নামাজের ব্যাপারে একই কথা বলেন। নবী (সা.) এভাবে আল্লাহ পাকের দরবারে আটবার গেলেন এবং প্রত্যেকবার পাঁচ ওয়াক্ত করে কমিয়ে দেওয়া হলো। অবশেষে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ যখন আল্লাহ নির্ধারণ করলেন, তখন হজরত মুসা (আ.) এ সংখ্যাকেও বেশি মনে করলেন এবং নবী (সা.)-কে আবারও দরখাস্ত পেশ করতে বললেন। নবী (সা.) বারবার যেতে লজ্জাবোধ করলেন এবং বললেন আমি আল্লাহর এ আদেশের ওপরই মাথানত করলাম। ফেরার পথে কিছুদূর আসার পর আওয়াজ হলো, 'আমি আমার ফরজ নির্ধারণ করে দিয়েছি এবং আমার বান্দাদের জন্য কমিয়ে দিয়েছি।'

এ সময়ও নবী (সা.)-এর শাককুস সদর বা বক্ষ বিদার ঘটে। এ সফরে রাসুল (সা.)-কে কয়েকটি জিনিস দেখানো হয়। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো জান্নাত ও জাহান্নাম। (জাদুল মা'আদ)

মেরাজের ঘটনা শেষে রাসুল (সা.) যখন পৃথিবীতে এলেন, তখনো রাসুলের ওজু করা পানি গড়িয়ে পড়ছিল। এদিকে এ ঘটনা জানতে পেরে কাফেররা তিরস্কার করা শুরু করল। হজরত আবু বকর (রা.) আবু জাহেলের মুখে ভর্ৎসনার সুর শুনে তিনি বললেন, যদি আল্লাহর নবী মুহাম্মদ (সা.) এ কথা বলে থাকেন, তবে আমি খাঁটি ইমানে বিশ্বাস করলাম। সেই ঘটনা থেকেই হজরত আবু বকর (রা.)-এর নামের সঙ্গে সিদ্দিক বা সত্যায়নকারী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। (ইবনে হিশাম ১ম খণ্ড, পৃ : ৬৯৯)।

লেখক : সাংবাদিক

- See more at: http://www.kalerkantho.com/print-edition/dhormo/2014/05/23/87498#sthash.BJlX5Mys.dpuf

মিরাজ রজনীর আধ্যাত্মিক ভ্রমণ


সৈয়দ গোলাম মোরশেদ | প্রকাশ : ২৩ মে ২০১৪
মিরাজ একটি গভীর অন্তর্ব্যাপী, আধ্যাত্মিক তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় ও আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা। রজনীযোগে ভ্রমণ বিষয়টি পবিত্র কোরআনে মিরাজ-সংক্রান্ত আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। নবুয়ত প্রকাশের দশম বছর, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ৫০ বছর বয়সকালে, ২৭ রজব ওই অলৌকিক ঘটনা সংঘটিত হয়। মিরাজ নিয়ে মুসলিম দার্শনিক, তত্ত্বজ্ঞানী, ধর্মবিষয়ক লেখকরা আলোচনায় খুব একটা প্রবৃত্ত হয়েছেন বলে মনে হয় না। সাহাবিদের কিছু কিছু বর্ণনা কাহিনী আকারে হাদিস গ্রন্থগুলোতে দেখা যায়। এ বিষয়ে তাত্ত্বিক মতামত, গবেষণা, পর্যালোচনা নেই বললেই চলে। কোনো কোনো লেখক সাহাবিদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন, যেহেতু এটি আমলি বিষয় নয় সেহেতু এ বিষয়ে চিন্তা করা বা এর কোনো মর্ম বা তাত্ত্বিক আলোচনার দরকার নেই। অথচ আগামী সোমবার রাতে সারাদেশে পবিত্র শবেমিরাজ পালিত হবে। মিরাজ ঘটনাটি ইসলামকে মহিমান্বিত করেছে। প্রিয় নবীকে (সা.) শ্রেষ্ঠত্বের আসনে আসীন করেছে। সর্বোপরি মহান আল্লাহর সঙ্গে তাঁর প্রিয় হাবিব (সা.)-এর মহামিলন ঘটিয়েছে। এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের মর্ম, দর্শন, তাত্ত্বিক আলোচনা ও গবেষণা এড়িয়ে যাওয়া ইসলাম সম্পর্কে আধ্যাত্মিক জ্ঞানের দৈন্য ও বিমুখতা বৈ আর অন্য কিছু নয়। মানব ইতিহাসে মানব জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ সফলতা হচ্ছে এই মিরাজুন্নবী (সা.)। মূলত মানবাত্মা এবং পরমাত্মার মহামিলন-সংক্রান্ত ঘটনাবলীই হচ্ছে মিরাজ। মিরাজ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনের আয়াতগুলো এরকম পরম পবিত্র ও মহিমাময় তিনি, যিনি তাঁর বান্দাকে রজনীযোগে ভ্রমণ করিয়েছেন মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসায়। যার পরিবেশ আমরা করেছিলাম বরকতময়, তাঁকে আমাদের নিদর্শনসমূহ দেখানোর জন্য, নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা [১৭:১]।
অন্তর্গামী নক্ষত্রের শপথ, তোমাদের সঙ্গী বিভ্রান্ত নন, পথভ্রষ্টও নন এবং তিনি আপন প্রবৃত্তি থেকে কোনো কথা বলেন না। এটা তো অহি যা তাঁর প্রতি প্রত্যাদেশ হয়েছে। মহাশক্তিধর তাঁকে শিক্ষা দিয়েছেন। চির প্রকাশমান শক্তিধর, কাজেই তিনি পূর্ণতা লাভ করলেন। যখন তিনি সর্বোচ্চ দিগন্তে ছিলেন এবং এরপর নিকটবর্তী হলেন এবং অতি নিকটবর্তী। ফলে তাঁদের মধ্যে দুধনুকের ব্যবধান রইল, অথবা তার চেয়েও কম। তিনি তাঁর বান্দার প্রতি যা অহি করার, করলেন। তিনি যা দেখলেন তাঁর অন্তঃকরণ তা অস্বীকার করেনি। তিনি যা দেখেছেন সে সম্পর্কে কি তোমরা তাঁর সঙ্গে বিতর্ক করবে? নিশ্চয় তিনি তাঁকে আর একবার দেখেছিলেন প্রান্তবর্তী বদরি বৃক্ষের কাছে, যার নিকটেই জান্নাতুল মাওয়া। যখন বৃক্ষটি আচ্ছাদিত হল, যা দিয়ে আচ্ছাদিত হওয়ার কথা। তখন তাঁর দৃষ্টি বিভ্রান্ত হয়নি। নিশ্চয় তিনি তাঁর প্রভুর শ্রেষ্ঠ নিদর্শনগুলো দেখেছিলেন। [৫৩:১-১৮]।
মিরাজ শব্দটি পবিত্র কোরআনে নেই। এফ, স্টেইন গাসের আরবি ইংরেজি অভিধানে মিরাজ শব্দের অর্থ লেখা হয়েছে tairs, Ladder Ascension অর্থাৎ সিঁড়ি, মই বা উন্নতি লাভের সিঁড়ি বা আরোহণ। মিরাজ বলতে যা বুঝানো হয়েছে তাতে তা উন্নতি লাভের সোপান হিসেবেই বেশি প্রযোজ্য। তবে অধিকাংশ তাফসিরকারক মিরাজ অর্থ ঊর্ধ্ব গমন বা ঊর্ধ্ব আরোহণ বুঝিয়েছেন।
মিরাজ অর্থ উন্নতির সোপান বলেই অধিক যুক্তিগ্রাহ্য বলে মনে হয়। সূরা বনি ইসরাইলের ১নং আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহ তাঁর প্রিয় রাসূলকে (সা.) মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসায় রজনীতে ভ্রমণ করিয়েছেন। মসজিদুল হারাম বলতে পবিত্র কাবা শরিফকেই যে বুঝানো হয়েছে এতে কারও দ্বিমত নেই। পবিত্র কাবাঘরকে পবিত্র কোরআনে মসজিদুল হারাম বলে একাধিক বার উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু বায়তুল মুকাদ্দাসকে মসজিদুল আকসা বলে পবিত্র কোরআনে কোথাও উল্লেখ করা হয়নি। মসজিদুল আকসা অর্থ দূরবর্তী মসজিদ। পবিত্র কোরআনের আয়াত দৃষ্টে মনে হয় নবী করিমকে (সা.) উন্নত থেকে উন্নতর স্থানে বা অবস্থানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সুতরাং হজরত আদম (আ.) এবং পরে হজরত ইব্রাহিম (আ.) ও হজরত ইসমাইল (আ.) কর্তৃক আল্লাহর নির্দেশে নির্মিত পৃথিবীর আদি মসজিদ, মসজিদুল হারাম (যা প্রিয়নবী (সা.) এবং তাঁর উম্মতের কাবা) থেকে হজরত সোলায়মান (আ.) কর্তৃক নির্মিত বায়তুল মুকাদ্দাস কীভাবে উন্নতর হল তা মোটেই বোধগম্য হয় না। পবিত্র কোরআনে মসজিদুল আকসা বলতে বায়তুল মামুরকেই বুঝানো হয়েছে বলে মনে হয়। কবি গোলাম মোস্তফা তার বিখ্যাত, বিশ্বনবী কিতাবের ১৫৬ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন, দূরতম মসজিদ বলতে বায়তুল মামুরকে গ্রহণ করলে মিরাজের দার্শনিক তাৎপর্য বুঝতে সহজ হয়। মক্কার কাবা হচ্ছে বস্তুজগতের কাবা আর বায়তুল মামুর হচ্ছে আধ্যাত্মিক বা ধ্যান জগতের কাবা। কাজেই কাবা থেকে বায়তুল মামুরে নেয়া হয়েছে। এ কথার দ্বারা বুঝা যায় যে, বস্তুজগৎ হতে রাসূলুল্লাহকে (সা.) উচ্চতর আধ্যাত্মিক বা ধ্যান জগতে নেয়া হয়েছিল। সূরা নজমের ৫নং আয়াতে বলা হয়েছে, মহাশক্তিধর তাকে শিক্ষা দিয়েছেন। এখানে মহাশক্তিধর বলতে তাফসিরকারকরা জিব্রাইলকে (আ.) বুঝিয়েছেন। মহাশক্তিধর শব্দটির জন্য পবিত্র কোরআনে যে শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে তা হল, শাহিদুল কুওয়া। পবিত্র কোরআনে এ শব্দ আরও অনেক জায়গায় আল্লাহর গুণবাচক নাম হিসেবে একমাত্র আল্লাহরই জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন- শাদিদুল ইকবা, কুওয়াতিল মাতিন। এসব জায়গায় তাফসিরকারকরা ও শব্দগুলোকে আল্লাহর নামবাচক হিসেবেই লিখেছেন। সূরা নজমে এসে যখন রাসূলুল্লাহকে (সা.) শিক্ষা দেয়ার প্রশ্ন এলো তখনই তা আল্লাহর পরিবর্তে জিব্রাইল হয়ে গেল। এটাই হয়তো তাদের ধারণা হবে যে, আল্লাহ কেন মুহাম্মদকে (সা.) শিক্ষা দিতে যাবেন? আরও অধস্থান কারও কাছ থেকে শিক্ষার ব্যবস্থা করাই বুঝি ভালো হয়! অথচ তারা ভুলে গেছেন যে, আল্লাহপাক নিজেই মানুষের মহান শিক্ষক। আসমাগুলো (নামগুলো) স্বয়ং আল্লাহপাকই হজরত আদমকে (আ.) শিক্ষা দিয়েছিলেন, আর আদমই (আ.) তা ফেরেশতাদের শিক্ষা দিয়েছিলেন, যেখানে হজরত জিব্রাইলও (আ.) ছিলেন। সুতরাং আদমই ফেরেশতাদের শিক্ষক। আদমের এ শ্রেষ্ঠত্বের জন্য ফেরেশতারা আল্লাহর হুকুমে আদমকে (আ.) সিজদা করেছিলেন। এ কথা পবিত্র কোরআনেরই কথা। সুতরাং পবিত্র কোরআনের দলিল অনুযায়ী জিব্রাইল (আ.) কস্মিনকালেও প্রিয়নবীকে (সা.) শিক্ষাদানের যোগ্যতা ও অধিকার রাখেন না।
সূরা নজমের ৬নং আয়াতে বলা হয়েছে, চির প্রকাশমান শক্তিধর, কাজই তিনি পূর্ণতা লাভ করলেন। তাফসিরকারকরা এ আয়াতে তিনি বলতে জিব্রাইলকে (আ.) বুঝিয়েছেন। অথচ এ সর্বনামে প্রিয় নবীকেই (সা.) বুঝানো হয়েছে। জিব্রাইল (আ.)-এর পূর্ণতা হাসিলের কিছুই নেই। ফেরেশতাদের আল্লাহপাক যেটুকু জানান, কেবলমাত্র সেটুকুই তারা জানতে সক্ষম। এর বাইরে কোনো এলম, যোগ্যতা বা পূর্ণতা হাসিলের কোনো প্রচেষ্টাই তারা করতে অক্ষম। একমাত্র মানুষই পারে সাধনাবলে যোগ্যতার শ্রেষ্ঠতম আসনে আসীন হতে। সপ্তম, অষ্টম ও নবম আয়াতে বলা হয়েছে, যখন তিনি সর্বোচ্চ দিগন্তে ছিলেন এবং নিকটবর্তী হলেন, অতি নিকটবর্তী, ফলে তাঁদের মধ্যে রইল দুধনুকের ব্যবধান অথবা তার চেয়েও কম। এখানেও তাফসিরকারকরা তিনি বলতে জিব্রাইলকে টেনে এনেছেন এবং তাঁদের বলতে জিব্রাইল ও মুহাম্মদকে (সা.) বুঝিয়েছেন। হাব-ভাব দেখে মনে হচ্ছে, প্রিয়নবী (সা.) যেন জিব্রাইলের সঙ্গেই মিরাজ করার জন্য ঊর্ধ্ব গমন করেছিলেন। মহিমাময় আল্লাহ এখানে একেবারেই অনুপস্থিত! সুফি এবং সুধী সমাজ এ ধরনের ভাবধারা গ্রহণ করতে নারাজ। কবি গোলাম মোস্তাফা তার বিশ্বনবীতে উল্লেখ করেছেন, তিনি হলেন মুহাম্মদ (সা.) এবং তাঁদের বলতে আল্লাহ ও রাসূলকেই (সা.) বুঝানো হয়েছে। দশম আয়াতে এ কথার যথার্থতা পাওয়া যায়, কারণ এখানে আল্লাহ লেখা হয়েছে। ত্রয়োদশ আয়াতে বলা হয়েছে, নিশ্চয় তিনি তাঁকে আর একবার দেখেছিলেন। এখানেও তাফসিরকারকরা তিনি বলতে মুহাম্মদ (সা.) এবং তাঁদের বলতে জিব্রাইল ও মুহাম্মদকেই (সা.) বুঝিয়েছেন।
অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়- তাফসিরকারকরা আল্লাহর সঙ্গে প্রিয়নবী (সা.)-এর সাক্ষাৎ করাতে নারাজ। তাই জিব্রাইলকে বারবার টেনে নিয়ে আসা। অথচ তারা একথা বেমালুম ভুলে গেছেন, জিব্রাইল তো শুরু থেকে প্রিয়নবী (সা.) এর সঙ্গেই আছেন। সুতরাং তাকে (জিব্রাইল) আবার নতুন করে দেখার এবং তার কাছ থেকে শিক্ষা নেয়ারই বা কি আছে? মিরাজের আয়াতগুলোর সার কথা হল, মহিমান্বিত আল্লাহর সঙ্গে তাঁর প্রিয় হাবিব (সা.) এর মুলাকাত বা দিদার। এ দিদার লাভ কেউ বলেন আধ্যাত্মিকভাবে আবার কেউ বলেন, স্বশরীরে হয়েছে। আমরা কোনোটাকেই অসম্ভব বলে মনে করি না। ইমাম গাজ্জালী (রহ.) তার কিমিয়ায়ে সাদাআতে উল্লেখ করেন, মুহাম্মদ (সা.) মিরাজের বেহেশতের অবস্থা দর্শন করেছেন বলে যে সংবাদ প্রদান করেছেন তা কেবল জিব্রাইলের মুখে শুনে নয়, বরং তিনি তা স্বচক্ষে দেখেছেন। তিনি চাক্ষুস দৃষ্ট ঘটনা জগতে প্রকাশ করেছেন। ইহজগৎ থেকে কেউ বেহেশতের অবস্থা জানতে পারে না, এ কথা সত্য কিন্তু রাসূল (সা.) এর দৃষ্টি এ জগৎ অতিক্রম করে পরলোক পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। তাঁর এ অবস্থাকে দ্বিবিধ মিরাজের এক ধরনের মিরাজ বলা যায়। জীবাত্মার মৃত্যুতে মানবাত্মার মিরাজ হয় অথবা জীবাত্মা দুর্বল হলে মানবাত্মার মিরাজ সংঘটিত হয়। নূরে মুহাম্মদী (সা.) হচ্ছেন সৃষ্টির আদি নূর, যাবতীয় সৃষ্টির অন্তর্নিহিত সত্তাসার। প্রিয়নবী (সা.) হচ্ছেন নূরুন আলা নূর। পবিত্র কোরআনে আল্লাহপাক ঘোষণা করেন, নিশ্চয় তোমাদের কাছে এসেছে আল্লাহর নূর এবং সুস্পষ্ট কিতাব (৫:১৫)। তাছাড়া হাদিস শরিফে প্রিয়নবী (সা.) বলেছেন, আনা মিন নূরিল্লাহ, অ কুল্লে শাইয়িম মিন নূরী। অর্থাৎ আমি আল্লাহর নূর হতে আর সমগ্র সৃষ্টি আমার নূর হতে। সুতরাং পবিত্র কোরআন ও কোরআন সমর্থিত সহি হাদিসের আলোকে প্রিয়নবী (সা.) এর মর্যাদা ও অবস্থান নির্ণয় সাপেক্ষে মিরাজের গূঢ়তত্ত্ব ও রহস্য উন্মোচন করার কাজে ব্রত হওয়া প্রত্যেক ইসলামী দার্শনিকের একান্ত কর্তব্য

Tuesday, 12 January 2016

বাংলাদেশ এগিয়ে যাক শান্তি ও সমৃদ্ধির পথে -- কামাল লোহানী

সহনশীলতা আর গ্রহণযোগ্যতার উদার মানসিকতা শীতের কুয়াশার মতন লক্ষ করছি বর্তমানের রাজনীতিতে এ কি অব্যাহত থাকবে? যদি থাকে তবেই ভালো। সংসদীয় রাজনীতির দ্বান্দ্বিক পরিবেশ গোটা দেশটাকে ‘জিম্মি’ করে ফেলেছে। এই পরিস্থিতি মোকাবেলা করার মতন সাংগঠনিক শক্তি অন্য কারও নেই। ‘সশস্ত্র বিপ্লব’-এর রাজনীতি যারা করতেন, তারাও ঝুঁকেছেন সংসদের প্রতি, তবে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে। আত্মশক্তির যে উত্থান তৈরি হয়েছিল সত্তরের দশকে গত শতাব্দীতে, তবে খেই হারিয়ে ফেলে, দেশীয় রাজনীতিতে একমাত্র বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি হতে পারত যারা, তারা আজ কৃষক-শ্রমিকের কথা মুখে বলেন কিন্তু জনগণের আদতশক্তি হিসেবে সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারা নিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে না গিয়ে উপরি রাজনীতিতেই ‘গোঁত্্তা খেয়ে’ পড়ে আছেন। মানুষ কিন্তু বিকল্প চায়। অথচ গোটা দেশটা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে ৪৪টা বছর কাটিয়ে দিল দেশ আর জনগণের প্রগতির দিকে। অথচ মহান মুক্তিযুদ্ধের আগে থেকে পূর্বপুরুষের ঐশ্বর্যম-িত রাজনৈতিক ধারাকে অনুসরণ করে ঔপনিবেশিক নিপীড়ক শক্তির বিরুদ্ধে গণসংগ্রামের মাধ্যমে দেশটাকে শত্রুমুক্তির দ্বারপ্রান্তে ১৯৭১ সালে এনে দিয়েছিলেন। কিন্তু গত শতাব্দীর মহত্তম লড়াইÑ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকে নানা অপশক্তির কৌশলে নিগৃহীত হতে হয়েছে কত যে বার তার কোনো ইয়ত্তা নেই। সেই অপকৌশল জয়ী হয়েছে আমাদের দুর্বলতার কারণে। মুক্তিযুদ্ধকে যারা সমর্থন করেছিলেন, সশস্ত্র লড়াইয়ে জানকবুল করে নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন দেশকে পাকিস্তানি নিপীড়ক দস্যু আর নরপিশাচ হায়েনার দলকে বিতাড়িত করে মাতৃভূমিকে পুনরুদ্ধার করতে। অথচ দেশ শত্রুমুক্ত হওয়ার পর থেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তির মধ্যে রাজনৈতিক আদর্শভিত্তিক ফারাক ক্রমে বাড়তে থাকলে মুক্তিফোজ এবং মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যের বন্ধনও ক্রমে ঢিলে হতে থাকল রাজনৈতিক একদর্শিতার কাছে। অন্যদিকে চক্রান্ত, কুমতলব আর আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার হতে থাকল এবং স্থানীয় নরপিশাচ শক্তিÑ ঘাতক, দালাল-দোসর-জল্লাদ গোষ্ঠী গোপনে একত্রিত হতে হতে গোপন আস্তানা ছেড়ে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর জেনারেল জিয়ার অপরিপক্ব রাজনীতি এবং ক্ষমতালিপ্সার সুযোগ নিয়ে দেশীয় রাজনীতিতেই পাখা মেলে দিল। ক্রমে ক্রমে রাজনীতি হয়ে উঠল মুক্তিযুদ্ধ চেতনার বিরোধীশক্তি।
বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে ইতিহাসের চাকা ঘোরাতে গিয়ে জেনারেল জিয়া কর্নেল তাহেরকে বিনা বিচারে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে জলাঞ্জলি দিয়ে পাকিস্তানি কায়দায় সেনাশাসন জারি করেছিল দেশে। এর বিরুদ্ধে যে জনমত তার সুযোগ গ্রহণ করে জিয়া শাসনের অবসান ঘটিয়ে জেনারেল এরশাদ গদিনসীন হলেন। প্রায় এক দশকে তার স্বৈরশাসন দেশবাসীকে হত্যা, গুম, খুন, নিপীড়ন-নির্যাতনের শিকারে পরিণত করে ফেলল। তারপর সবাই মিলে এরশাদকে হটিয়ে একটা আপসরফায় ক্ষমতাবদল হলো।... কত নির্মম ইতিহাস রচিত হলো। তারপর নিরবধি দিনরাত্রির সংগ্রামী আমাদের আবার গণতন্ত্রের পথে পৌঁছে দিল। কিন্তু কী অদ্ভুত! জিয়ার স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জিতে গেলেন। অতঃপর যেসব কুৎসিত রাজনীতির নামে যে ঘটনাবলি হয়েছে, তার কোনো শেষ নেই। আর আমরা তো এই দেশেরই লড়াকু মানুষ, সব অঘটন-অপশাসনকে কখনো কিছুটা সহ্য করে আবার কখনো বিদ্রোহ করে জানিয়ে দিয়েছি আমাদের মতামত। তাই গণতন্ত্রের যাত্রা যদিও বা শুরু হলো, তা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলতে থাকল। কারণ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ধারণ করেন না এমন একজন গৃহবধূ নির্বাচিত হলেন, দেশের প্রধানমন্ত্রী হলেন। একনায়কতন্ত্রের অবসান হলো না, গণতন্ত্রের নামে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী কা-কারখানা ইতিহাস বিকৃতি, জামায়াত-শিবিরকে পুনর্বাসন নয়, শুধু তাদের মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশে মন্ত্রী সাজিয়ে তাদের গাড়িতে লাল-সবুজের পতাকা উড়িয়ে দিলেন খালেদা। মুক্তিযুদ্ধ না করা এবং সেই মুক্তিযুদ্ধের হন্তারক-নরখাদক জল্লাদের মিতালি দেশটাকে ধর্মান্ধাতার গহ্বরে নিমজ্জিত করতে শুরু করে সর্বত্র জামায়াতিদের অবস্থানকে পোক্ত করে ফেলল বিএনপির কাঁধে চেপে।
বঙ্গবন্ধু হত্যার পর থেকে অপশাসন, দুঃশাসনে আমরা যেভাবে নিষ্পিষ্ট হয়েছি, তার ফিরিস্তি দিতে গেলে কালক্ষেপণ এবং চকিত চর্বণ দুটোই হবে। সূচনাতেই পরিবর্তনের যে আভাস-ইঙ্গিতের উল্লেখ করেছি তাকে একটু খুঁজে দেখি, বিষয়টি শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে ঠেকে।
ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক মহল যারা কোনোদিন রাজনীতিতে পা দেন না ক্ষমতারোহণের জন্য, তারা সচেতন জনগণ এবং দেশের সাধারণ মানুষÑ কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র-জনতা। নারী-পুরুষ আবলবৃদ্ধবনিতা, তারা দেশকে নিঃশর্তে ভালবাসেন; তারা সবাই চান দেশে জিয়া বা এরশাদ গণতন্ত্র নয়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসমৃদ্ধ অন্যতম প্রধানস্তম্ভÑ গণতন্ত্র কার্যকর হোক দেশে। অবশ্য বর্তমান ক্ষমতাসীন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণকারী ১৪ দলীয় সরকার যে পুরো গণতান্ত্রিকতা প্রাকটিস করছে তা বলা যাবে না।
অতীতকে দূরে ঠেলে রেখে বর্তমানকেই যদি গ্রহণ করি, তবে আমার কাছে মনে হচ্ছে ‘গণতান্ত্রিক মানসিকতা’ বোধহয় নিজস্বার্থ ও অস্তিত্ব রক্ষার খাতিরে ক্রমেই চেতনোদয় ঘটতে শুরু করেছে, বিশেষ করে দেশের বড় দুটি দলÑ আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে মুখে আক্রমণাত্মক বুলি কপচালেও এখন মনে হচ্ছে, কথার ধারটা ক্রমেই কমে আসছে। পারস্পরিক উদারতার পরিবেশ তৈরি হতে শুরু হয়েছে। সহনশীলতা আসবে শিগগিরই মনে হচ্ছে। কারণ বিএনপি যে ভুল করেছিল গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে, তা নিয়ে প্রচুর রাজনৈতিক গোঁয়ার্তুমি করে দেখেছে মহাজোট সরকার এবং বিশেষ করে দলীয় ভিত্তিতে আওয়ামী লীগকে কাবু করা যাচ্ছে না। খালেদা জিয়া কত নাটকীয় রাজনীতি করলেন কিন্তু জমাতে পারলেন না। ৯৩ দিন নিজ-অবরোধ গুলশান কার্যালয়ে আলিশান ব্যবস্থাপনায় ৩০-৪০ সহচর-সহচারী নিয়ে দিনরাত্রি যাপন করলেন। ফায়দা কিছুই হলো না। মাঝখান থেকে ১৬৪ জন নিরীহ-গরিব মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করার অপরাধে ভবিষ্যতে অপরাধের সম্মুখীন হতে হবে। খালেদা শেখ হাসিনাকে উৎখাত করতেও চেয়েছিলেন পারেননি। এখনো পর্যন্ত যে সেনাবাহিনীর প্রতি দারুণ বিরাগভাজন ছিলেন বেগমসাহেবাÑ ইদানীং তিনি তাদের তোষামোদি করে কথা বলছেন। আমলাদের আক্রমণ করছেন বটে তবে রয়ে-সয়ে। অন্যদিকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব, যুগ্ম মহাসচিব রিজভীসহ অনেক নেতাকর্মী কারামুক্তি পাচ্ছেন জামিনে। তারা আবার সংবাদ সম্মেলন করে ‘বামপন্থায় অভ্যস্ত শব্দাবলিতে ক্ষমতাসীনদের বেশ ভালোই আক্রমণ করছেন। আরেক যুগ্ম মহাসচিব সালাউদ্দিন তো ভারতে অনুপ্রবেশের মামলায় আটকে থাকলেও জামিনে দিন গুজরান করছেন। তবে খালেদাপুত্র তারেক পলাতক জীবন কাটাচ্ছেন ব্রিটিশদের করুণায় লন্ডনে। সেখানে বসে যে বেয়াদবি ও ইতিহাস নিয়ে ছেলেখেলা করছিল, অজ্ঞতার হাস্যকর দৃষ্টান্ত স্থাপন করছিল, তাও যেন থেমে গেছে।
নির্বাচন না করার যে খেসারত বিএনপিকে দিতে হয়েছে, একটি সংসদীয় রাজনীতি করা দল হয়েও তা বোঝার মতন ক্ষমতা তাদের ছিল না। দলের অভিজ্ঞ কর্মী-সংগঠকদের তো কোন পাত্তাই নেই, নেতারাও বেগম জিয়ার ওপর দিয়ে কথা বলতে পারেন না বলে একক সিদ্ধান্তকেই মেনে নিতে হয়েছে। কিন্তু মনে সর্বস্তরে প্রচ- ক্ষোভ জমেছিল নেতৃত্বের ওপর। জামায়াতকে নিয়ে রাজনীতি করায় দলীয় ইমেজ যে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে অবশেষে তারা বুঝতে পেরেছেন, ক্ষমতাসীন হাসিনা সরকার বিএনপির শীর্ষ নেতাদের ছেড়ে দিচ্ছেন ক্রমেই। যত মামলাই থাকুক না কেন, ইদানীং সেসব মামলা থেকে জামিনে মুক্তি দেওয়া হচ্ছে। মামলার দিন-তারিখ পড়ছে বেশ দূরে দূরে। তাই বিএনপি এখন নিজেদের গুছিয়ে সংগঠনকে ‘শক্তিশালী’ করার চেষ্টা করছে। কারণ ক্ষোভ ও ক্রোধÑ দুটোই তৃণমূল পর্যন্ত পৌঁছেছে। এখন শুরু হয়েছে জোট ত্যাগের ঘোষণা। এই জোটে যারা আছে, তাদের সাংগঠনিক শক্তি যাই থাকুক না কেন, সংখ্যা তো বাড়িয়ে দিয়েছিল ২০ হোক আর ১৮-ই হোক, কিছু যায় আসে না কারণ এদের জনসম্পৃক্ততা নেই এবং বৃহদান্ত ধর্মান্ধ রাজনীতিতে বিশ্বাসী, যা সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। ২০০৮ সালের নির্বাচনেই তার প্রমাণ মিলেছে। তাই এবার যখন পৌর নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল, তখনো মানুষ তাদের ওপর আস্থা রাখতে পারেননি। ভেবেছিলেন, ছুঁতার তো অভাব নেই, যে কোনো অজুহাত তুলে বিএনপি হয়তো নির্বাচন ছেড়ে চলে যাবে। কিন্তু তা করেনি। এ থেকে তাদের নির্বাচন ফল এতটা মর্মান্তিক! শিক্ষা এভাবেই হচ্ছে। ফলস্বরূপ, তৃণমূলে যখন যাচ্ছেন তখন তারা বোধহয় বুঝতে পারছেন, এভাবে রাজনীতি বা ক্ষমতারোহণ সম্ভব নয়। তাই এবার ঘর পোড়া গরুর মতোন সামনে সিঁদুরে মেঘে ভয় পাচ্ছে। এবার তাই দল গোছানোর কাজ করার কর্মসূচি নিয়েছেন। অদ্ভুত ব্যাপার, রাজনৈতিক এতবড় দল গত বছর হরতাল, সন্ত্রাস, অবরোধ, রোডমার্চÑ যা কিছুই ডেকে থাকুক, কোনোটাই সফল হয়নি। ২০১৩ থেকে আজ পর্যন্ত ভুল সিদ্ধান্ত তাদের কুরে কুরে খাচ্ছে। ওপর-নিচের যে উপলব্ধি তার মূল্যায়ন এতদিন না করলেও পৌর নির্বাচনের ফলাফলে যত চিৎকারই করুক না কেন, তারা প্রার্থী বাছাইয়ে অনভিজ্ঞতা, রাজনৈতিক চর্চাবহির্ভূত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তারই প্রমাণ মিলেছে।... এখন বিএনপি জোট ও দলের মধ্যেও পরিবর্তন আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। ইসলামী ঐক্যজোট বেরিয়ে গেছে বটে, তারা বেরিয়ে তো ভবিষ্যতে রাজনৈতিক দল করতে পারবে না। তাছাড়া এরা তো রাজনৈকিত দল নয়, এরা ধর্মান্ধ গোষ্ঠী, নিজেদের সৃষ্ট তরিকার ছত্রচ্ছায়ায় পীর কিংবা ধর্মীয় নেতার অনুসারী। ধর্মের নামে দল করা যাবে না, এটা মক্তিযুদ্ধ চেতনার দাবি। এ দাবি সরকারকে মানতে হবে। সে জন্য বিএনপি নিজেদের গুছিয়ে, পুনর্গঠিত করে, নেতৃত্ব অদল-বদল করে জাতীয়তাবাদী দলকে নতুন ছাঁচে চালতে চেষ্টা করবে সামনে। দলীয় স্থবিরতার প্রকৃষ্ট নমুনা সংসদীয় অন্যতম প্রধান দল বিএনপির ভেতরে ভেতরে চলছে খুরারোগ। গঠনতন্ত্রে তিন বছর অন্তর কাউন্সিলর হওয়ার কথা, দু’বছরে হয়নি। এবার বাধ্য হবে কাউন্সিল করতে। কারণ হরতাল ডেকে নেতাকর্মী কাউকেই রাজপথে তেমন পায়নি, তাই পরিবর্তন আনতেই হবে যদি রাজনীতিতে টিকে থাকতে হয় এবং জামায়াতনির্ভরতাকে বিসর্জন দিতে হবে। লন্ডনে পলাতক তারেক জিয়ার রাজনৈতিক পরামর্শে দেশে পলিটিক্স চলবে না। ফলে প্রবীণদের প্রতি অনীহা প্রকাশ পাচ্ছে তৃণমূলে। তাই তাকে বাদ না দিয়ে ‘সম্মান’ দেওয়ার চেষ্টা থাকবে তবে নতুন মুখের অধিষ্ঠান হবে বলে অনেকে মনে করছেন। এছাড়া বিএনপিকে টিকিয়ে রাখা যাবে না। মহাজোট যেভাবে কঠিন হাতে দমন-পীড়ন চালাচ্ছিল তা অনেকটা ঢিলে হয়েছে। ফলে দম পাবে বিএনপি। একটা নির্বাচন গেল আরেকটা বুঝি মার্চেÑ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন। এদিকে মহাজোট সরকারের অংশীদার এরশাদ প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হয়েও সব ধরনের কুৎসিত মন্তব্য করছেন সরকার সম্পর্কে এবং পৌর নির্বাচনে নিজদলের যে আসন প্রাপ্তির আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন তা অসত্য প্রমাণিত হয়েছে।
সত্যি কথা বলতে কী, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবারে সরকারের কর্মপরিকল্পনা যেভাবে প্রণয়ন  করেছেন, তাতে তিনি যে কঠিন হয়েছেন, হচ্ছেন এবং ভবিষ্যতেও হবেন তা সুস্পষ্ট। সেই সঙ্গে তিনি দলকেও গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে পরিচালনার জন্য সব দিক থেকে আটঘাট বেঁধেই কাজ করছেন। পৌর নির্বাচন কীভাবে হয়েছে, কতটা স্বচ্ছ, গ্রহণযোগ্যতা, তা বিচারের সময় এখন আর নেই। বিএনপি তো এবারে গোটা নির্বাচনে অংশ নিয়ে গোহারা হেরেছে। ছাপমারা, কেন্দ্র দখল, ভোটারদের ধমকি-হুমকি যত অভিযোগই মহাজোটের ওপর আরোপ করা হোক না কেন, ক্ষমতা হাসিনার পক্ষেই। সামনের ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন মার্চ-এপ্রিলে। এ নির্বাচনও দলীয় প্রতীকেই হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এখানে আবার সত্যিকার জনপ্রিয়তা যাচাই করার আরেকটা সুযোগ পাবে বিএনপি। তাই ভেবেছিলাম, আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি দুই দল নিজেদের কাউন্সিল করে ভবিষ্যতেও যদি জনগণের কাছে যায়, তখন পরীক্ষা হবে একেবারে তৃণমূল পর্যায়ে, কে জনগণের কাছাকাছি যেতে পেরেছেন বা পারবেন। সরকারি দল তো অনেকটাই ছাড় দিয়েছে এবং ৫ জানুয়ারি নিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পুলিশ বিএনপি ও আওয়ামী লীগ কাউকেই দেয়নি। আমি মনে করি, পুলিশ গণতান্ত্রিক আচরণ করেছে। বিএনপি আবার এ নিয়ে কোনো নাটক চালবে কিনা কে জানে। তবে দুই দলই নিজেদের অফিসের সামনে সমাবেশ করেছে। তবে আক্রমণের ভাষা তেমন ধারালো ছিল না। কিন্তু একটা বিষয় মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কাছে প্রশ্ন রাখব, ৪৫ বছর পর যারা শহীদের সংখ্যা, স্বাধীনতার ঘোষক নিয়ে প্রশ্ন ওঠান, তাদের সঙ্গে কি কোনো ‘গণতন্ত্র’ রক্ষা করার প্রয়োজন আছে? যারা বুদ্ধিজীবী হত্যার প্রশ্নে বুদ্ধিজীবীদের নির্বোধ করার মতন ধৃষ্টতা দেখাতে পারে, তাদের কি এ দেশে কোনো রাজনৈতিক অধিকার থাকা উচিত? ধীরে ধীরে যে ‘কনজিনিয়াল অ্যাটমোসফিয়ার’ তৈরি হয়েছে এবং এখনো আরও হতে হবে, তবেই সরকারকে অনুরোধ জানাব, আপনারা শহীদ জননী জাহানারা ইমামের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের যে লড়াই তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও শাস্তিবিধান করছেন বলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। কিন্তু একই ধর্মনিরপেক্ষতা হরণ করার মতন কোনো আচরণ না করার অনুরোধ জানাব। জামায়াত এবং ধর্মীয় নামধারী রাজনৈতিক দল ও সংগঠনগুলোকে নিষিদ্ধ করে দেশবাসী তাবৎ জনগণের আশিস গ্রহণ করুন। মনে রাখবেন, যত আপসই করুন, যতই এরপর সমর্থক পাবেন বলে আশা করছেন, সবকিছু তুচ্ছ করে জনগণের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করুন, তবেই সত্যিকার গণতন্ত্র স্থাপন হবে। ধর্মনিরপেক্ষতা রক্ষার কথা মুখে বুলি কপচিয়ে যতই বছরের পর বছর আস্ফালন করুন, জনগোষ্ঠীর লোকসংখ্যা ক্রমেই কমে যাওয়ার দিকে নজর দিন।
বিএনপিকে সনির্বন্ধ অনুরোধ, জামায়াত থেকে সরে আসুন। মুক্তিযুদ্ধকে যারা অপশক্তি মনে করেন, তারা দলের অভ্যন্তরে, চাপ সৃষ্টি করুন। যেন দল আর কোনো কারণেই ওদের ওপর নির্ভর না করে।
তবেই সরকারকে অনুরোধ করব, দেশের আপসহীন বুদ্ধিজীবী, শিল্পী, সাহিত্যিক, লেখক, সাংবাদিক, প্রকৌশলী, চিকিৎসক, শিক্ষাবিদ, শিক্ষার্থী এবং সব পেশাজীবী প্রতিনিধি নিয়ে জাতীয় সংলাপ করে মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত সফল লাখো শহীদের অবদান গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশকে শান্তি ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে চলুন।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, কলামনিস্ট

Tuesday, 5 January 2016

৫ জানুয়ারি নির্বাচনের গুরুত্ব -- মিল্টন বিশ্বাস

সজীব ওয়াজেদ জয় ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি সম্পন্ন হওয়া জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে ফেসবুক স্ট্যাটাস লিখেছিলেন, ‘এটা ছিল সন্ত্রাসের মুখে অসাধারণ সংগ্রাম।’ তার এই মতামত যথার্থ ছিল এই কারণে যে, বিএনপি-জামায়াতের সহিংস মারমুখী অবস্থানের মধ্যেও ঝুঁকি নিয়ে ভোট দিয়ে আওয়ামী লীগকে বিজয়ী করার ঘটনা আমাদের দেশের ইতিহাসে অভূতপূর্ব। সন্ত্রাস ও মৌলবাদের বিরুদ্ধে কিন্তু গণতন্ত্রের পক্ষের সেই নির্বাচন দেশবাসীকে স্বস্তি দিয়েছে। তবু জামায়াত-বিএনপির অপতৎপরতা চলছে। ওইদিনটিকে তারা গণতন্ত্র হত্যা দিবস হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। ৩০ ডিসেম্বর (২০১৫) পৌরসভা নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াতের ভরাডুবি হয়েছে। কিন্তু বেগম খালেদা জিয়ার কোনো বক্তব্যে সহিংস রাজনীতি বা ইস্যুশূন্য আন্দোলন অবসানের কোনো সদিচ্ছা প্রকাশ পায়নি। বরং নাশকতার প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত দিচ্ছেন তিনি হরহামেশায়। আসলে তাদের প্রতিহত করার জন্য দরকার মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ঐক্য। নতুন সরকার হিসেবে দুই ও তার আগের পাঁচ বছর মোট সাত বছর যাবৎ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সেই ঐক্যের প্রচেষ্টায় নিয়োজিত রয়েছে। ২০১৪ সালের ৯ জানুয়ারি শপথ গ্রহণ করে আওয়ামী লীগসহ নতুন সংসদ সদস্যরা পুনরায় দেশকে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয়ে উদ্দীপিত হয়েছেন। এ জন্য ১২ জানুয়ারি নতুন সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে সাবেক মহাজোট সরকারের ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে। আপামর জনসাধারণের আকাক্সক্ষার প্রতিফলন রয়েছে এ নতুন সরকারের কর্মকা-ে।
তবে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের আগে-পরে যারা সন্ত্রাস সংঘটনে ইন্ধন দিয়েছে, সক্রিয়ভাবে নাশকতায় জড়িত থেকেছে এবং সহিংসতাকে রাজনীতির অন্যতম অনুষঙ্গে পরিণত করেছে তারা এবং তাদের সমর্থকরা সেই সময়ের মতো বর্তমানেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরির পাঁয়তারা করছে। পৌরসভা নির্বাচনের আগে খালেদা জিয়া এক অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানকারীদের সংখ্যা নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করে জনগণ কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন। অন্যদিকে ৫ জানুয়ারিকে কালো দিবস হিসেবে অভিহিত করে ওইদিনটিকে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনের নতুন অভিযাত্রা শুরুর দিন গণনা করাÑ সবই বিএনপি-জামায়াতসহ ২০ দলের ধৃষ্টতা ছাড়া আর কিছু নয়। অথচ বাংলাদেশের জনগণ ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের ওপর দৃঢ় আস্থা প্রদর্শন করেছে। আর বিএনপি-জামায়াতকে ডাস্টবিনে ছুড়ে ফেলেছে। কারণ বর্তমান প্রজন্মের কাছে শেখ হাসিনা এক আশ্চর্য সাহসী রাজনীতিকের নাম; যার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনায় ভবিষ্যতের বাংলাদেশ উন্নয়নের ধারায় এগিয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া শেখ হাসিনাবিহীন যুদ্ধাপরাধের বিচার ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ জন্য তরুণ প্রজন্ম প্রত্যাখ্যান করেছে বিএনপি-জামায়াতকে। আবার নির্বাচনের আগে বিএনপি-জামায়াতের সহিংসতার বীভৎস চিত্র গণমানুষকে আতঙ্কিত করে তোলায় তারা আওয়ামী লীগের ধারাবাহিকতায় সন্তোষ প্রকাশ করছে। এদিক থেকে ৫ জানুয়ারির (২০১৪) নির্বাচন আরও বেশি গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। বিএনপির অবরোধের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া ২০১৪-এর শেষও হয়েছিল জামায়াতের হরতালের মাধ্যমে। কিন্তু সহিংসতা আর জ্বালাও-পোড়াও করে তারা থামাতে পারেনি যুদ্ধাপরাধের বিচার। বরং ২০১৫ সালে তিন যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির রায় জনগণকে শেখ হাসিনার প্রতি আস্থাশীল করে তুলেছে অনেক বেশি। শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কৌশলের কাছে জামায়াতের বাঁচা-মরার আন্দোলনও দমে গেছে। অন্যদিকে দুই বছর ধরে বিএনপি কয়েক দফা আন্দোলনের হুঙ্কার দিয়েও মাঠ গরম করতে পারেনি। বরং জামায়াতের প্রধান মিত্র তারা এখন হরহামেশাই বলতে বাধ্য হচ্ছে, ‘জামায়াতের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নির্বাচনী রাজনীতি’র। শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নয়, কূটনৈতিক দিক থেকেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছেন। তিনি মেধা ও প্রজ্ঞা দিয়ে সব বিরূপ পরিস্থিতিকে নিজের অনুকূলে নিয়ে এসেছেন। তার মন্ত্রিসভায় যুক্ত হয়েছেন অভিজ্ঞ ও বর্ষীয়ান রাজনীতিকরা। কিছু বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতা সত্ত্বেও উন্নয়ন সহযোগী ও অংশীদার বানিয়ে ফেলেছেন রাশিয়া ও জাপানকে। প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের পরীক্ষিত বন্ধুত্বের বন্ধন আরও সুদৃঢ় হয়েছে। পূর্বমুখী কূটনীতির অংশ হিসেবে চিনের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কোন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছেন। নিজের সরকারের উন্নয়নের মডেল অন্যান্য দেশের কাছে উপস্থাপন করে প্রশংসিত হয়েছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী।
৫ জানুয়ারি নির্বাচনোত্তর দুই (২০১৪ এবং ২০১৫) বছর ধরে দেশের শান্তিপূর্ণ পরিবেশের মধ্যে জামায়াত-বিএনপি জোট আন্দোলনের ডাক দিয়ে যাচ্ছে; ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তারের চেষ্টা করছে। এ জন্যই আন্দোলনের নামে সামান্যতম নৈরাজ্য-সহিংসতা চালানোর চেষ্টা করা হলে ‘জিরো টলারেন্স’ অবস্থানের ঘোষণা এসেছে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে। বিএনপির আন্দোলন রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করতে রাজপথে সক্রিয় থাকছে আওয়ামী লীগ। এ কথা প্রমাণিত যে, বিএনপি-জামায়াত আন্দোলনের নামে জানমালের ক্ষতি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। দেশের মানুষ যেখানে স্বস্তি ও শান্তিতে আছে; যেখানে মানুষ নির্বিঘেœ চলাফেরা করছে সেখানে জ্বালাও-পোড়াও, পেট্রল ঢেলে বাসে আগুন দিয়ে মানুষ হত্যার মতো জঘন্য কাজ করতে চাইলে সরকার কঠোর পদক্ষেপ নেবে এটাই স্বাভাবিক। তাদের আন্দোলনের সঙ্গে জনগণ নেই। কারণ আন্দোলন করার মতো কোনো সংকট দেশে তৈরি হয়নি। দেশের উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রয়েছে। তাই আন্দোলনের ডাক দিয়ে কোনো লাভ হচ্ছে না। জনগণ তো দূরের কথা বিএনপির কর্মীরাই প্রস্তুত নয়; আর কর্মী তো দূরের কথা তাদের দলের নেতারা প্রস্তুত নন। আর আন্দোলন কখনো অঙ্ক কষে হয় না। যাদের নিয়ে কুচকাওয়াজ করে বিএনপি আন্দোলন করবে সেই জামায়াতের অবস্থা এখন নাজুক। এই জামায়াত-হেফাজতরা বিএনপিকে সঙ্গে নিয়ে ধর্মের নামে মানুষ হত্যা করেছে। ২০১৫ সালে মসজিদে হামলা চালিয়েছে, বিদেশিদের হত্যাসহ খ্রিস্টান যাজকদের হত্যার চেষ্টা করেছে। ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে-পরে সারা দেশে হিন্দু জনগোষ্ঠীর ওপর আক্রমণ, হামলা, নির্যাতনের ঘটনাকে হেফাজত ইসলাম আন্তর্জাতিক চক্রের গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ বলে দাবি করেছিল। আমাদের মতে, রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে সংখ্যালঘু হিন্দু জনগোষ্ঠীর ওপর হামলাকে ইসলামবিরোধী আন্তর্জাতিক চক্রের কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। মুসলিম রাষ্ট্রে অমুসলিমদের অধিকার, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সন্ত্রাস দমনে সরকারের দায়িত্ব রয়েছে বেশি। সেখানে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র কী করে আধিপত্য বিস্তার করেছে তা আমাদের কাছে বোধগম্য নয়। বরং খোদ রাজধানীসহ অনেক জায়গায় জঙ্গিবাদী গোষ্ঠীসহ ছাত্রশিবির ক্যাডারদের গোপন বৈঠকের সংবাদ আমাদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। দেশজুড়ে নাশকতায় লিপ্ত দলের এই গোপন বৈঠক নাগরিক সমাজের শান্তি বিঘিœত করছে এটা স্পষ্ট।  
অনেক আগেই দেশের বিশিষ্টজনরা যুদ্ধাপরাধী বা একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরু হওয়ার পর থেকে জামায়াতে ইসলামীর হরতাল ও নাশকতাকে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। গাড়ি-বাড়িতে আগুন, পেট্রল বোমা, পুলিশকে মারধর ও হত্যা করা এটি স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছিল। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীকে হত্যা ও পঙ্গু করা হয়েছে কয়েক বছর ধরে। আর এই জামায়াত-শিবিরের কর্মসূচিকে সমর্থন দিয়েছে বিএনপি। সহিংসতায় নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে জামায়াত-শিবির। টানা হরতাল-অবরোধে শিক্ষা, ব্যবসা আর বিদেশে দেশের ভাবমূর্তির অপূরণীয় ক্ষতিসাধিত হয়েছে। এমনকি ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের আগে আমেরিকা, ইংল্যান্ড প্রভৃতি দেশের নাগরিককে তাদের দেশের কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ ভ্রমণে নিরুৎসাহিত করেছিল। সুস্থ ধারার রাজনীতি থেকে এই বিচ্যুতি দেশের তরুণ প্রজন্মকে দিশেহারা করেছিল সাময়িকভাবে। কিন্তু সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ওপর হামলা পুনরায় গণজাগরণ মঞ্চকে সামনে নিয়ে আসে এবং তরুণদের অপশক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর ইতিহাসকে স্মরণ করিয়ে দেয়। ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের আগে-পরে ১৭ জন পুলিশ, ২ জন বিজিবি ও ২ জন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যকে হত্যা করে জামায়াত-বিএনপি সন্ত্রাসীরা। এছাড়া অসংখ্য সাধারণ জনতাকে হত্যা ও আহত করে আগুন দিয়ে, সেসব ঘটনা আমরা সবাই জানি। পুনরায় এখন বিএনপির ২০ দলীয় জোট আন্দোলনের হুমকি দিচ্ছে। আসলে রাজপথে সরকার পতনের মতো আন্দোলনের সাংগঠনিক ক্ষমতা না থাকায় এবং আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক অবস্থা ভালো হওয়ায় বিএনপি জনগণের কোনো আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়নি। বিএনপি-জামায়াত চারদলীয় জোট সরকার সামাজিক দুর্বৃত্তায়নকে পৃষ্ঠপোষকতা দেয়ায় অতীতে (২০০১-২০০৬) দেশ সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও লাগামহীন দুর্নীতির অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছিল। সে সময় রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় উন্মত্ত জোটের মন্ত্রী ও দলীয় নেতাদের তা-বের কথা আমাদের সবার মনে আছে।
রাজনীতির অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে দেশ ও জনগণের উন্নয়ন। আওয়ামী লীগ সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকা- ব্যাপক। ৫ জানুয়ারি নির্বাচনী প্রচারণায় আমরা দেখতে পেয়েছি অসাধারণ উপস্থাপনার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ তাদের সাফল্যগুলো নিরন্তর কয়েকটি টিভি চ্যানেলে প্রচার করে চলেছে। সেখানে তথ্যাদির নিরিখে উন্নয়নমূলক কর্মকা- প্রচার করা হয়েছিল। আর তা যে সম্পন্ন হয়েছে এটা জনগণের কাছে স্পষ্ট। না হয়ে থাকলে তার বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া কিংবা কোনো ভুল বা অতিরঞ্জিত তথ্য পরিবেশিত হলে তার সমালোচনা করা কারও পক্ষে সম্ভব হয়নি। তখন মহাজোট সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে যদিও কেউ কেউ মিথ্যাচার করেছেন। তবে উপস্থাপিত তথ্যাদি বা সরকারের উন্নয়ন না হওয়ার ব্যাপারে কোনো কথা বলেননি কেউ। সরকারের উন্নয়নের ব্যাপারে কোনো চ্যালেঞ্জ না করে নির্বাচনকে ভ-ুল করার জন্য উদ্ভট আর মিথ্যাচারের মাধ্যমে জনগণকে বিভ্রান্ত করতে চেয়েছিল বিএনপি-জামায়াত। শেষ পর্যন্ত তারা সরকারের উন্নয়নকে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে। আর সব দিক দিয়ে তাদের পরাজয় ঘটেছে বলেই দেশের উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে। অর্থাৎ আওয়ামী লীগ সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকা-ের ধারাবাহিকতা রক্ষায় ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের গুরুত্ব অপরিসীম।

লেখক : অধ্যাপক  এবং পরিচালক, জনসংযোগ, তথ্য ও প্রকাশনা দপ্তর, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
email- writermiltonbiswas@gmail.com

Saturday, 2 January 2016

চড়া ভুলের চড়া মাসুল দিয়েছে বিএনপি -- পীর হাবিবুর রহমান

চড়া ভুলের চড়া মাসুল দিয়েছে বিএনপি। ভুল করে ভুল পথে হেঁটে হেঁটে সর্বশেষ পৌর নির্বাচনেও ফল তুলতে পারেননি বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া। সরকারি দলের প্রকাশ্যে সিল মারা, কেন্দ্র দখল রুখে দাঁড়াবার মতো কোমর শক্ত সংগঠন বিএনপি আর নেই। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে কৌশলের পথ না নিয়ে একগুঁয়ে হঠকারী পথ নিয়েছিলেন। ভোট বর্জনের ডাক দিয়েই বসে থাকেননি, প্রতিরোধের জন্য জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে টানা তিন মাস সহিংস হরতাল-অবরোধের কর্মসূচিতে গিয়েছিলেন। বিএনপি নেতৃত্ব মনে করেছিলÑ বিদেশি শক্তি সেই ভোট এসে বন্ধ করে দেবে। কিন্তু শেখ হাসিনার একক ক্যারিশমায় প্রশাসনের ওপর নিয়ন্ত্রণ রেখে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হলেও ৫ জানুয়ারির কঠিন চ্যালেঞ্জ উতরে যান সংবিধানের দোহাই দিয়ে। অন্যদিকে ভোটের পর বিএনপি হঠাৎ আন্দোলনের ইতি টানলে সরকার একদিকে বিরোধী দল দমন, অন্যদিকে নিজেদের কর্তৃত্ব সংবিধানের দোহাই দিয়ে প্রতিষ্ঠা করে ফেলে। সেই নির্বাচনের আগে সরকারের বিরুদ্ধে শেয়ার কেলেঙ্কারি, ব্যাংক লুট ও পদ্মা সেতু বিতর্কে যে জনমত তৈরি করেছিল সেটি বিএনপির দিকে ঝুঁকেছিল বলেই ৭টি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের শক্তিশালী প্রার্থীদের বিরুদ্ধে দুর্বল প্রার্থী দিয়ে বিস্ময়কর বিজয়লাভ করে বিএনপি। নির্বাচন প্রতিরোধ করতে না পেরে আন্দোলনে হুট করে ইতি দিয়ে তিন মাসের হরতাল-অবরোধে দলীয় শক্তিক্ষয়ই করেনি, দেশের অর্থনৈতিক লোকসানের কলঙ্ক মাথায় তোলে। নেতাকর্মীরা ডোবে হতাশায়। নির্বাচিত মেয়র আর নেতারা কারাগার আর আদালতমুখী হন।
পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, সেই নির্বাচনের আগে বিএনপি সাতটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিস্ময়কর জয় নিয়ে সাংগঠনিকভাবে যে যৌবন অর্জন করেছিল আর দল যেভাবে উঠে দাঁড়িয়েছিল তাতে চ্যালেঞ্জ হিসেবে ভোটে গেলে আজকের এই করুণ পরিণতি দেখতে হতো না। অদৃশ্য শক্তির সঙ্গে লন্ডনে নির্বাসিত পুত্র তারেক রহমান আর খালেদা জিয়ার গৃহের রহস্যময় লোকজনই তত্ত্বাবধায়ক ছাড়া নির্বাচন নয়, এমন সিদ্ধান্ত অটল রেখে তাকে ভোট বর্জনের ফাঁদে ফেলে। ভোট বর্জনের ফাঁদে পড়ে বিএনপির যে পতন শুরু হয়েছিল তাতে দল নিজেই দেখেছে তার করুণ চেহারা পৌর ভোটে। তার আগে ঢাকা ও চট্টগ্রামের মেয়র নির্বাচন ছিল এর স্টেজ রিহার্সেল। মেয়র নির্বাচনের ক্ষেত্রে কোনো প্রতিরোধ দূরে থাক এজেন্টই দিতে পারেনি। আর এবার পৌর ভোটে এজেন্ট দিতে পারলেও, কোথাও কোথাও প্রতিরোধের চেষ্টা করলেও সমর্থকদের ভোট ধানের গোলায় তুলতে পারেনি। নৌকা ভরে নিয়ে গেছে সব।
আর এবার পৌর নির্বাচনের আগে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে শেখ হাসিনা নতুন ইমেজে প্রবল আত্মবিশ্বাসে রয়েছেন। সবকিছুই তার নিয়ন্ত্রণে। স্থলসীমান্ত চুক্তি, বিশ্বব্যাংককে চ্যালেঞ্জ করে পদ্মা সেতুর কাজ শুরু, উন্নয়ন কর্মকা- মিলিয়ে ৫ জানুয়ারির আগের সময়কার পরিস্থিতিতে নেই। নতুন এক সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন তিনি ও তার দল।
বিএনপি মনে করেছিল বিতর্কিত নির্বাচন সরকার হজম করতে পারবে না। অচিরেই আরেকটি নির্বাচনে যেতে হবে। কিন্তু সরকার উপজেলা নির্বাচনের পথ ধরে বছর পার করে ফেললে খালেদা জিয়া মিছিল ও সমাবেশ শুরু  করেন। সরকারের এক বছর পূর্তিতে গেল বছরের জানুয়ারির শুরুতে খালেদা জিয়াকে তার মিছিলে যেতে না দিলে তিনি দলের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই, মাঠকর্মীদের প্রস্তুত না করেই অনির্দিষ্টকালের হরতাল-অবরোধ কর্মসূচি দিয়ে বসেন। আন্দোলন পরিণত হয় পেট্রলবোমার সহিংস রাজনীতিতে। বিএনপির ওপর মানুষের নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়। অন্যদিকে, সরকার বিএনপিকে আন্তর্জাতিক মহলের কাছে মানুষ খুনের অভিযোগ এনে সন্ত্রাসবাদী সংগঠন হিসেবে তুলে ধরে। অবরোধ কর্মসূচি হয়ে পড়ে অকার্যকর। উল্টো খালেদা জিয়া অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন গুলশান কার্যালয়ে। বিএনপির শীর্ষ নেতা থেকে শুরু করে মাঠের কর্মীরা পর্যন্ত মামলার জালে বন্দি হয়ে কারা নির্যাতনের মুখে পড়েন। আন্দোলন করল বিএনপি, ফল তুলল সরকার।
৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে বিএনপি নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গণভবনের নৈশভোজ বৈঠকে যোগ দেননি। কিন্তু এই কর্মসূচিতে গিয়ে বিএনপির কোমর ভেঙে যাওয়ায় সরকারের প্রতি তাদের সংলাপের আহ্বান গুরুত্ব পায়নি। বিএনপির হঠকারী রাজনীতির পথে সরকার শুধু তাদেরই দমন করেনি, রাষ্ট্রীয় জীবনে পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সুযোগ পায়। প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের মন্ত্রীরা পরিষ্কার বলে দিয়েছেন, বিএনপি বা তাদের নেত্রীর সঙ্গে কোনো আলোচনা নয়। শিবিরের হরতালে ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির সঙ্গে পূর্বনির্ধারিত বৈঠক বাতিল করার সিদ্ধান্ত ছিল খালেদা জিয়ার জন্য সম্পূর্ণ আত্মঘাতী।
ইতোমধ্যে, হঠকারী পথ নেওয়ায় বিএনপি সিটি করপোরেশনগুলোতে যে জয়লাভ করেছিল সেই মেয়রদেরও বরখাস্তই শুধু করেনি, জেলেও পাঠায় সরকার। অথচ ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ নিলে বিএনপি নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ কয়েকটি মন্ত্রণালয়ে কর্তৃত্ব ফিরে পেত। ওই পরিস্থিতিতে সরকার গণরায় ছিনিয়ে নিলেও বিএনপিকে সংসদে শতাধিক আসন দিতে হতো। সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে ঠাঁই নিয়ে, বিএনপি সেই ৭ সিটির বিজয়কে সুসংহত করে, শক্ত মাটির ওপর দাঁড়িয়ে শক্তিশালী দল নিয়ে সরকারের ওপর অব্যাহত চাপ রাখতে পারত।
সংসদের ভেতরে-বাইরে বিএনপির নেতা-এমপিরা সরব থাকতে পারতেন। এতে আর যাই হোক ঢাকা-চট্টগ্রামের মেয়র নির্বাচনসহ সর্বশেষ দেশের পৌরসভার ভোটের লড়াইয়ে এ রকম ফল দেখতে হতো না। একের পর এক ভুল পথে পা বাড়ানো বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়াকে পশ্চিমারা চিহ্নত করলেও, দেশে নিন্দিত হলেও জামায়াতের সঙ্গ ছাড়তে পারেননি। এমনকি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে তার এবং দলের অবস্থান পরিষ্কার করা দূরে থাক উল্টো যেন সেই অদৃশ্য শক্তির কাছেই বেশি করে আপস করছেন। একাত্তরের পরাজিত পাকিস্তান যেখানে যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে দাঁড়িয়েছে, ’৭১-এ বাঙালি জাতির ওপর যে আক্রমণ ও নৃশংসতা চালিয়েছে তা অস্বীকার করেছে। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সন্তানদের অশ্রুজল দেখে তরুণ প্রজন্ম পাকিস্তানের প্রতি ঘৃণা পোষণ করছে। সেই সময়ে বিএনপি নেত্রী ৩০ লাখ শহীদের সংখ্যা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করায় পাকিস্তানি শাসকরা খুশি হলেও এদেশের জনগণ বিক্ষুব্ধ হয়েছে। অন্যদিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ^রচন্দ্র রায় মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বুদ্ধিজীবীরা ‘নির্বোধের মতো মারা গিয়েছিলেন’ এমন মন্তব্য করে তরুণ প্রজন্মের বুকে আগুন জ¦ালিয়ে দিয়েছেন। আমাদের সুমহান মুক্তিযুদ্ধ জাতির জীবনে সর্বোচ্চ আত্ম-অহংকার ও গৌরবের। পাকিস্তানের কণ্ঠে কথা বলা মানেই, মানুষের আবেগ-অনুভূতিতে আঘাত করা। বিএনপির নেতৃত্ব সেটিই করেছে। একাত্তরে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান বীরউত্তমের যে ভূমিকা সেটিকেও ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে। পথহারা বিএনপির এসব বক্তব্যকে সরকারি দল জনগণের সামনে সেভাবেই উপস্থাপন করতে পারছে, যেভাবে করলে মানুষ বিশ^াস করে একাত্তরের পরাজিত পাকিস্তানের সঙ্গে বিএনপির একটি গোপন সম্পর্ক রয়েছে।
পৌর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অসংখ্য প্রার্থী ভোটের মেয়র হলেও অনেকেই হয়েছে লুটের মেয়র। বিএনপি পরাজিত হলেও রাজনৈতিকভাবে সারা দেশে সংগঠিত হয়েছে। বিএনপিকে লং টার্ম চিন্তায় দলের রাজনীতিকে এখন ঢেলে সাজাতে হবে। মামলা ও কারাগার থেকে আগে নেতাকর্মীদের মুক্ত করতে হবে। ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের জীবনে কঠিন দুঃসময় এসেছিল। সেনাশাসনকবলিত বাংলাদেশে জুলুম নির্যাতন সয়েও একদিকে আন্দোলনের পথে ধীরলয়ে হেঁটেছে তেমনই মিডিয়া ক্যু ও প্রহসনের নির্বাচন জেনেও রাষ্ট্রপতি থেকে সংসদ নির্বাচন কোনোটাকেই বিনা চ্যালেঞ্জে ছাড়েনি।
আওয়ামী লীগ এদেশে গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে যেভাবে রাজপথে হেঁটেছে এবং সাফল্য তুলেছে বিএনপিকে সেই পথ থেকেই শিক্ষা নিতে হবে।
লেখক: প্রধান সম্পাদক, পূর্বপশ্চিমবিডি ডটকম - See more at: http://www.dainikamadershomoy.com/2016/01/02/66046.php#sthash.tuoMEhek.dpuf

Wednesday, 16 December 2015

অস্ত্র সমর্পণ

হেলাল হাফিজ

মারণাস্ত্র মনে রেখো ভালোবাসা তোমার আমার।
নয় মাস বন্ধু বলে জেনেছি তোমাকে, কেবল তোমাকে।
বিরোধী নিধন শেষে কতোদিন অকারণে
তাঁবুর ভেতরে ঢুকে দেখেছি তোমাকে বারবার কতোবার।

মনে আছে, আমার জ্বালার বুক
তোমার কঠিন বুকে লাগাতেই গর্জে উঠে তুমি
বিস্ফোরণে প্রকম্পিত করতে আকাশ, আমাদের ভালবাসা
মুহূর্তেই লুফে নিত অত্যাচারী শত্রুর নি:শ্বাস।

মনে পড়ে তোমার কঠিন নলে তন্দ্রাতুর কপালের
মধ্যভাগ রেখে, বুকে রেখে হাত
কেটে গেছে আমাদের জঙ্গলের কতো কালো রাত!
মনে আছে, মনে রেখো
আমাদের সেই সব প্রেম-ইতিহাস।

অথচ তোমাকে আজ সেই আমি কারাগারে
সমর্পণ করে, ফিরে যাচ্ছি ঘরে
মানুষকে ভালোবাসা ভালোবাসি বলে।

যদি কোনোদিন আসে আবার দুর্দিন,
যেদিন ফুরাবে প্রেম অথবা হবে না প্রেম মানুষে মানুষে
ভেঙে সেই কালো কারাগার
আবার প্রণয় হবে মারণাস্ত্র তোমার আমার।

Monday, 30 November 2015

উজানে সাঁতার কাটছি, পরাজিত হতে আসিনি

প্রিয় পাঠকগণ, আপনাদের অভিবাদন।
আমার সাংবাদিকতা জীবন খোলা বইয়ের মতো আপনাদের সামনে উন্মুক্ত। মানুষের জীবনে ভুল-ত্রুটি থাকে, কর্মজীবনে আমারও হয়তো ভুল-ত্রুটি ছিল। কিন্তু রিপোর্টার থেকে কলামিস্ট হিসেবে উঠে আসার পুরোটা সময় পেশাগত কাজকে আমি ইবাদতের মতো নেওয়ার চেষ্টা করেছি। মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বুকে নিয়ে যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে আমার বেড়ে ওঠা। একটি বৈষম্যহীন, অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র আমার চিন্তা ও চেতনায় লালিতই হয়নি, অস্থিমজ্জায় বসত গেঁড়েছে। স্রোতের বিপরীতে সাঁতার-কাটা মানুষ আমি। পেশাগত জীবনে নানামুখী টানাপোড়েন ও ঝুঁকি মোকাবেলা করেছি ধৈর্য্য, সাহস ও সহনশীলতা নিয়ে। জীবন মানেই যে সংগ্রাম- এই পাঠ আমি নিয়েছি ইতিহাসের পূর্বসুরীদের আদর্শ থেকে।
মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমার আদর্শ। শৈশবে দেখা মুক্তিযুদ্ধ আমার অহংকার। আমার দলের নাম মানুষ। তাই কোনো দলীয় সংকীর্ণতা নয় দেশ ও মানুষের স্বার্থই আমার কাছে বড়। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রাণশক্তি যুগিয়েছেন বার বার। তার ‘সত্য যে কঠিন, কঠিনেরে ভালবাসিলাম’ পংক্তি আমার এগিয়ে চলার মূলমন্ত্র। পেশার তারে জড়ানো জীবনে ভলতেয়ারের হৃদয়-ছোঁয়া উক্তি ‘আমি তোমার মতের সঙ্গে একমত নাও হতে পারি, কিন্তু তোমার মত প্রকাশের স্বাধীনতার জন্য জীবন দিতে পারি’ এই চিন্তা ও চেতনা লালন করে পথ হেঁটেছি। জীবনের উপলব্ধি থেকে কবি নজরুলের বাণী বিশ্বাস করতে শিখেছি ‘বিবেক বেঁচে থাকলে সুখ মরে যায়’।

জীবনের এই কঠিন সময়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, প্রথাগত চাকরি আর নয়। কবি জীবনানন্দ দাশের ভাষায়, “পৃথিবীতে নেই কোনো বিশুদ্ধ চাকুরি”। যত জায়গায় কাজ করেছি, আন্তরিকতা নিয়েই করেছি। সেইসব প্রতিষ্ঠানের প্রতি কৃতজ্ঞ।

কোনো শাসক বা ক্ষমতাবানের করুণাশ্রিত জীবন নয়, পেশাগত জীবনে আত্মমর্যাদার সঙ্গে সুলুকসন্ধানীর মতো চোখ-কান খোলা রেখে সত্যের মুখোমুখি হবার চেষ্টা করেছি। দেশ ও মানুষের স্বার্থের প্রশ্নে আপস করিনি। করপোরেট সংস্কৃতির এই যুগে চাকরি করা যত কঠিন, চাকরি না করে টিকে থাকার সংগ্রাম আরো কঠিন। আমি শেষ চ্যালেঞ্জটি গ্রহণ করেছি।

প্রিয় পাঠকগণ, আমি কখনো সম্পাদক হতে চাইনি। আপনাদের মতো আমিও জানি দলবাজি, সুবিধাবাজি, আর মূল্যবোধের অবক্ষয়ে রক্তাক্ত ক্ষত বিক্ষত আমাদের সমাজে আজ সাংবাদিকতার মতো মহান পেশাও অন্যান্য পেশার বাইরে যেতে পারেনি। সাংবাদিকতা পেশায় আজকাল কেউ তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, আবুল মনসুর আহমদ, জহুর চৌধুরী, কিংবা নিদেনপক্ষে এবিএম মুসা বা আতাউস সামাদ হতে চান না। সরকারি আনুকুল্য, রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে অনুকম্পা, আনুগত্য, সরকারি পদ পদবি নিতে চান। বরাবর ছোটখাটো সাধারণ মানুষ হয়েও নিজেকে সেই সব পূর্বসুরীদের উত্তরাধিকারীত্ব বহন করার চেষ্টা করেছি যারা এই মহান পেশাকে গৌরবের মর্যাদায় আসীন করেছিলেন। একদম সাধু ফেরেস্তা নই, তবুও অন্তহীন বেদনা, দহন, নানামুখী টানপোড়েন, ঝুঁকির পথকেই বেছে নিতে হয়েছে।

কিছু কিছু মানুষেরা পৃথিবীতে আলো ঝলমলে পরিবেশে আসেন, ভোগ বিলাসের রঙ মাখতে মাখতে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে চলে যান। কিছু কিছু মানুষ আসেন, সৃষ্টিশীলতার নেশায়। নতুনত্বের হাতছানিতে অন্তহীন বেদনা ও হাহাকার সয়ে হৃদয় ক্ষয়ে পথ হাঁটেন। লেখক, সাংবাদিক, কবি হন। যেমন আমাদের পূর্বসুরীরা জীবন ক্ষয়ে রাজনীতিবিদি হয়েছিলেন। এই সব মানুষেরা ঘোর অন্ধকার সময়ের মুখোমুখি হয়ে দীর্ঘ সুরঙ্গ কেটে আলোর সন্ধান করেন। আমি তাদের পথটিই গ্রহণ করেছিলাম। দুই দুই বার হৃদযন্ত্র মেরামত করার পরেও আমার স্বাধীনচেতা জাগ্রত বিবেকের ক্রন্দন, আকুলতা, দগ্ধ করেছে জীবনের পরতে পরতে। তাই না পেয়েছি স্বস্তি, না পেয়েছি নিরাপদ নিশ্চিন্ত জীবন। মত ও পথের অমিলের কারণে ৫২ বছরের জীবনের অর্ধেকেরও বেশি সময় পেশাগত জীবনে কাটালেও স্থায়ী ভাবে ঘর বাঁধতে পারিনি কোথাও। দশ বারেরও বেশি চাকরি ছেড়েছি।
জীবনে একবার এই বেলাতে এসে চাকরি খোয়াতে হয়েছে কেন তা অনেকেই জানেন। এর কারণ ব্যাখ্যা করে হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে চাই না। জীবনের মধ্যগগনের সূর্য অতিক্রম করে নিউজ পোর্টাল পূর্বপশ্চিমবিডি ডটকমের চ্যালেঞ্জ নিয়ে পথ হাঁটতে শুরু করেছি আজ। একদল অভিজ্ঞ আত্মমর্যাদা সম্পন্ন সাংবাদিকদের ছায়ায় তৈরি হয়েছে একটি উদ্যমী সংবাদকর্মীর টিম। পূর্বপশ্চিম ক্রিয়েটিভস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অনুজ প্রতিম সৈয়দ সারওয়ার রহমান, নিউজ পোর্টালের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক মুহাম্মদ রায়হানুর রহমান পীর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তথ্য প্রযুক্তিতে প্রথম শ্রেণী নিয়ে শিক্ষকতা করেছিলেন। সেটি ছেড়ে তারা তথ্য প্রযুক্তি খাতে নিজেদের মেধা ও মননশীলতাকে বিনিয়োগ করেন। তাদেরকে সঙ্গে নিয়েই আমাদের এই পূর্বপশ্চিম পরিবার। পূর্বপশ্চিম পরিবারের চৌকস মেধাবী সদস্য এস. জি ফারুক কলিন্সের পরিচালনায় মহিউদ্দিন মারুফ, একে মোহাম্মদ শরিফুল আলম, তানজীর আহমেদ দ্রুত সময়ে অফিস সাজিয়ে দিয়ে অনন্য ভুমিকা রেখেছেন। প্রিন্স ও রায়হান, দিবারাত্রি পরিশ্রম করে ওয়েবপোর্টাল ডিজাইনের কাজ সম্পন্ন করেছেন। পূর্বপশ্চিম বিডি ডটকমের উপদেষ্টা দেশবরেণ্য শিল্পী ধ্রুব এষ একুশের বইমেলা সামনে রেখেও তার ব্যস্ত সময়ের ফাঁকে গভীর আন্তরিকতা দিয়ে নিউজ পোর্টালের লোগো তৈরি করে দিয়েছেন। মত ও পথের অমিলে নানাসময়ে গণমাধ্যমে বাহাস হলেও আমার বন্ধু লেখক সাংবাদিক এবং গবেষণা সংস্থা পরিপ্রেক্ষিত ও বিজ্ঞাপনী সংস্থা ক্রিয়েটিভ মিডিয়ার চেয়ারম্যান সৈয়দ বোরহান কবীর পরামর্শ দিয়েছেন। দুটি নান্দনিক টেলিভিশন বিজ্ঞাপন তৈরি করে দিয়েছেন সৃষ্টিশীলতার সাক্ষর রেখে। অর্থমূল্য নেননি, হৃদয় মূল্য দিয়েছেন। পূর্ব পশ্চিম পরিবারের সঙ্গে উপদেষ্টা হিসেবে যুক্ত হয়ে ঢাকা স্টক এক্সেচেঞ্জের সাবেক পরিচালক ও লেখিকা খুজিস্তা-নুর ই নাহরীন মুন্নী, অভিনেত্রী নির্মাতা রোকেয়া প্রাচী, সংগীত শিল্পী সেলিম চৌধুরী, রাকসুর সাবেক পত্রিকা সম্পাদক জাকিরুল হক টিটন, স্থপতি লেখক ও নাট্যকার শাকুর মজিদ, নিয়মিত মিটিংয়ে থেকে তাদের হৃদয় নি:সৃত আন্তরিকতাই দেননি, নানামুখি আইডিয়াও দিয়েছেন। চিত্রনির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীও তার হৃদয় নিয়ে উপদেষ্টা হিসেবে পাশে দাঁড়িয়েছেন। নির্বাহী সম্পাদক দীপু হাসান, সহযোগী সম্পাদক শাকির আহমদ, উপ সম্পাদক সুবীর দাশ, শরীফ তালুকদার, প্রধান প্রতিবেদক প্রতীক ইজাজ, বার্তা সম্পাদক বিপুল হাসান, সিনিয়র সহকারী সম্পাদক রনজু রাইম, সমন্বয়কারী সেজুল হোসেন, বিশেষ প্রতিনিধি খোন্দকার সোহেল, সিনিয়র নিউজ রুম এডিটর নিপু বড়ুয়া, নতুনদের নিয়ে কর্মশালা থেকে টানা দু’মাসের প্রস্তুতি যুদ্ধে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন।

প্রিয় পাঠকগণ, দেশবরেণ্য বিভিন্ন শ্রেণী পেশার অনেকে এই চ্যালেঞ্জে আমার পাশে দাঁড়িয়েছেন, বিভিন্ন কর্পোরেট হাউজের আলোকিত মুখগুলো যে ভাবে সাহায্য করেছেন তাতে আমি অভিভূত। বিভিন্ন গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব স্নেহের ঋণে বন্দী করেছেন। সারাদেশের প্রতিনিধিদের সম্মিলনে ও সংবাদকর্মীদের কর্মশালায় প্রশিক্ষণ দিয়ে বন্ধুবর সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা, সামিয়া রহমান, পলাশ আহসান ও চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক আর রাজি সাহায্য করেছেন। প্রবাসের মুখগুলো স্বত:স্ফুর্তভাবে আমাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন।

প্রিয় পাঠকগণ, বাংলাদেশ প্রতিদিনে থাকাকালীন আমাদের ভাই বন্ধু, পরম আপনজন ডাক্তার জাহাঙ্গীর সাত্তার টিংকু ব্রেইন টিউমারে অকাল মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুকে ঘিরে তার প্রথম তারুণ্যের হাত ধরে বেড়ে ওঠা বন্ধু মোজাম্মেল বাবু এবং প্রয়াতের স্ত্রী খুজিস্তা নুর ই নাহরীন মুন্নীকে এই অকাল মৃত্যু নিয়ে লিখতে অনুরোধ করি। খুজিস্তা নুর ই নাহরীন মুন্নী তার ১৮ বছরের জীবনসঙ্গী ডাক্তার জাহাঙ্গীর সাত্তার টিংকুকে নিয়ে একটি হৃদয়স্পর্শী লেখা পাঠান। সেটি ছাপা হওয়ার পর ক্যানসারে অকালে চলে যাওয়া আরেক চলচ্চিত্রকার চাষী নজরুল ইসলাম টেলিফোন করে লেখিকার টেলিফোন নাম্বার নিয়ে যোগাযোগ করেন। তিনি চেয়েছিলেন, এই লেখার ওপর ভিত্তি করে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করবেন। ঘাতক ক্যান্সার তাকে সেই সুযোগ দেয়নি। টিংকুর বাড়ির মেঝেতে তার ফোঁটা ফোঁটা অশ্রুবিন্দু শুধু দীর্ঘশ্বাসের স্মৃতিচিহ্ন হয়ে রয়েছে। সেই থেকে আমার দেখা এক আত্মপ্রত্যয়ী সংগ্রামী বিদুষী নারী খুজিস্তা নুর ই নাহরীন নিয়মিত লেখালেখিতে আসেন। একদিন তিনি আলাপকালে আগামীতে প্রিন্ট মিডিয়ার বদলে অনলাইন মিডিয়া জনপ্রিয়তা পাবে বলে মন্তব্য করেন। পশ্চিমা দুনিয়ায় ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে প্রিন্ট মিডিয়া মুখ থুবড়ে পড়লেও দক্ষিন এশিয়ায় প্রিন্ট মিডিয়া মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে বলে তর্কে জিতে যাই। সেই বিতর্কের অনেকদিন পর দেখা যায় পশ্চিমা দুনিয়াই নয় দক্ষিণ এশিয়া এমনকি বাংলাদেশেও অনলাইন মিডিয়া মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। সরকার নীতিমালা প্রনয়ণের তোড়জোড় শুরু করেছে। অন্যদিকে প্রিণ্ট মিডিয়া থেকে বেরিয়ে আসার মধ্য দিয়ে ভেতরে তৈরি হওয়া একগুয়ে, ক্ষেপাটে, জেদি, সৃষ্টিশীল মনে নিজের মতো করে দাঁড়াবার তাড়া দেয়। নিজের সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় আমার চিন্তায় নিউজ পোর্টাল ঠাঁই পায়। সেই বীজ ডালপালা মেলতে শুরু করে যখন গেল কোরবানীর ঈদে লন্ডন ও নিউ ইয়র্ক সফরে যাই। প্রবাসী সতীর্থদের সঙ্গে এ নিয়ে আমার কথাবার্তা হয়। দুনিয়াজুড়ে যেখানেই যাই বিমান বন্দর থেকে শপিং মল, হোটেল লবি সবখানেই মুঠোফোনে অনলাইনে খবরপাঠ এক চেনা দৃশ্য হয়ে গেছে।
দেশে ফিরে আমার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে বনানীতে স্থপতি শাকুর মজিদের অফিসে যাই। সেখানের আড্ডায় যেতে ফোনটি করেছিলেন সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা। অস্থির পায়চারী করতে করতে বললাম, এবার নিজেই কিছু করবো। তারা দুজন তাকালেন। বললাম নিউজ পোর্টাল অনলাইন। শাকুর মজিদ একটি নাম বললেন। আমার পছন্দ হলো না। বললাম, পূর্বপশ্চিম। ইশতিয়াক রেজা ও তিনি সমর্থন দিলেন। সহযোগিতার আশ্বাস দিলেন। পূর্ব দিগন্তে সূর্য ওঠে পশ্চিমে লাল আভা ছড়াতে ছড়াতে তামাম দুনিয়ায় কত খবর ঘটে যায়! শুধু কি তাই? প্রিয় লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে পূর্ব পশ্চিম নামে যে ইতিহাস নির্ভর উপন্যাস লিখেছেন সেটি আমাদের অহংকার। শাকুর মজিদ কাকে জানি ফোন করলেন। সঙ্গে সঙ্গে ক্রেডিট কার্ডে ডোমেইন কিনে দিলেন। তারপর প্রিন্স ও রায়হান হয়ে একটি স্বপ্নের পূর্ণতা পেলো ধীরে ধীরে। এইখানে সাবেক ছাত্র নেতা আব্দুল্লাহিল কাইয়ুম উৎসাহ দিয়ে বললেন নামেই অর্ধেক এগিয়ে গেছেন আপনি। আমার এই যাত্রাপথে ভালোবাসা ও হৃদয় দিয়ে যারা সাথী হয়েছেন তাদের ঋণ কখনো শোধ হবার নয়।

প্রিয় পাঠকগণ,
মার্কিন সংবাদপত্র এসোসিয়েশন জরিপ করে বলেছে ২০৫০ সালে পৃথিবীতে প্রিন্ট মিডিয়া থাকছে না। সানডে টাইমস জরিপ করে বলেছে ইংল্যান্ডে ৫ বছর পর প্রিন্ট মিডিয়া থাকবে না। আমাদের দেশে প্রিন্ট মিডিয়া কম হলেও আরো দুই যুগ থাকবে। যদিও অনেকে বাড়িয়ে বলছেন আগামী দিনে অনলাইন টিভির কাছে ইলেকট্রনিক মিডিয়াও মুখ থুবড়ে পড়বে।

প্রিয় পাঠকগণ,
বাংলাদেশের তরুণ সমাজ এখন অনলাইন মিডিয়াকে শক্তিশালী গণমাধ্যমে রূপ দিয়েছে। তারুণ্যের এই শক্তির ওপর ভর করে আমাদের চ্যালেঞ্জ পিছিয়ে না থাকার। একুশ শতকের কান সংবাদপ্রধান, এই শ্লোগান নিয়ে বহুরৈখিক সংবাদ, মতামত, শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, রাজনীতি, প্রশাসন, অপরাধ জগৎ নিয়ে সব মত পথের মহাসম্মিলনে বাংলা ভাষাভাষী মানুষের মুক্তচিন্তার প্লাটফর্ম হচ্ছে পূর্বপশ্চিমবিডি ডটকম।

আমাদের স্বপ্ন আকাশছোঁয়া। অর্ধেক জীবন পার করে নেয়া এই চ্যালেঞ্জে আপনারা পাশে থাকুন, সর্বাত্মক সহযোগিতা করুন, আমরা আপনাদের নিয়ে পূর্বপশ্চিম বিডি ডটকমের পথ চলতে শুরু করেছি। আপনারা লিখুন, আপনারা মতামত দিন, আপনারা পরামর্শ দিন, মানুষের শক্তির চেয়ে কোন শক্তিকে আমরা বড় মনে করি না। মহাত্মা গান্ধী বলেছেন অপর পক্ষের মতামত গ্রহণ করার মানসকিতা না থাকলে গণতন্ত্রেও বিবর্তন সম্ভব নয়।

একজন দার্শনিক বলেছেন সত্য কারো একার সম্পদ নয়। প্রিয় পাঠক, সত্য জানার আগ্রহ অধিকার প্রতিিিট নাগরিকের। প্রতিটি মানুষের। খবর বন্ধ রাখার কোন সুযোগ আজকের দুনিয়ায় নেই। আপনাদের কাছে অঙ্গীকার করছি আমরা একটি অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক সমাজে বিশ্বাসী। এমন সময়ে আমরা এসেছি যখন দেশ নয়, দুনিয়া জুড়েই ধর্মের নামে সন্ত্রাসবাদ ছড়িয়ে পড়ছে। এক শ্বাসরুদ্ধকর প্রতিকুল পরিস্থিতি অতিক্রম করছে বিশ^। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের অহংকার। সন্ত্রাসবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার প্রশ্নে আমাদের আপোস নেই। আপনাদেরকে কথা দিচ্ছি আপনাদের মতামত আমরা প্রাধান্য দেব। আপনাদের সমালোচনার জবাব দেব। গালমন্দটুকু শুধু মুছে দেব। নির্মোহ সত্য প্রকাশে দ্বিধাহীন যেমন থাকবো, তেমনি কারো প্রতি ব্যক্তিগত রাগ ক্ষোভ বা বিদ্বেষ নিয়ে মনগড়া রিপোর্টে যাবো না। বিশ্ব সংসার তন্ন তন্ন করে আপনাদের সামনে যেমন পূর্ণসত্য উপস্থাপন করবো তেমনি আমাদের সাফল্যের অংশীদার করবো দেশ ও মানুষকে। আপনারা আস্থা রাখুন, সঙ্গে থাকুন।


পীর হাবিবুর রহমান
প্রধান সম্পাদক: পূর্বপশ্চিমবিডি ডটকম

Sunday, 18 October 2015

শরণার্থী সমস্যা : -- আরব দেশগুলো কেন নিদায় নীরব?

ভূমধ্যসাগরতীরে মানবতার করুণ উপাখ্যান রচিত হচ্ছে প্রতিদিন। হাঙ্গেরিতেও কাঁটাতার পেরোতে গিয়ে পাঁচ বছর বয়সী ছেলেটার বাহু কেটে রক্তাক্ত হলেও সীমান্তরক্ষীরা শুনবে বলে সে একটুও কাঁদেনি। গর্ব করে তার বাবা বলেন, আমার ছেলেটা বীর। সাগরতীরে আয়লান কুর্দির লাশ হৃদয় ভেঙে দেয়, সৌদি আরব ও উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর উদাসীনতার দুর্গ তবু ভাঙে না।
৪০ লাখের বেশি সিরীয় দেশ থেকে দেশে, সীমান্ত থেকে সীমান্তে আশ্রয়ের সন্ধানে ভুগছে ও ছুটছে। অথচ যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব একযোগে নির্বিকার। সভ্যতার আঁতুড়ঘর বলা হতো ইরাক ও সিরিয়াকে। এখন তারা বধ্যভূমি। এখন খবর বের হচ্ছে আইএস তাদেরই সৃষ্টি। আর আইএস সৃষ্টি করছে লাখ লাখ উদ্বাস্তু। পাশ্চাত্যের মদদপুষ্ট জঙ্গিরা পৃথিবীতেই দোজখের মডেল দেখাচ্ছে। ব্যক্তিগতভাবেও
আরব ধনকুবেরদের দানে সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী এসব ধ্বংসের কারিগর। তুরস্কে আশ্রয় নেওয়া সিরীয় ওমর হারিরির কণ্ঠে তাই তিক্ত হতাশা, ‘তারা বিদ্রোহীদের সাহায্য করে, শরণার্থীদের দেখে না।’
উপসাগরীয় সালতানাতগুলো বিশ্বের শীর্ষ ধনী, অথচ শরণার্থীদের জন্য তাদের দরজা বন্ধ। যে কুয়েতিরা ১৯৯০ সালে ইরাকি হামলায় শরণার্থী হয়েছিল, সিরীয় শরণার্থীরা তাদের চোখে ‘ভিন্ন, আতঙ্কগ্রস্ত ও মানসিকভাবে অসুস্থ, আমাদের জীবনধারায় তারা বেমানান!’ ইরাক আক্রমণের পক্ষে জর্জ বুশের যুক্তিও ছিল এমন: তারা আমাদের জীবনধারা ধ্বংস করে দেবে। কিন্তু ভোগবিলাসে মত্ত থেকে স্বজাতি, স্বধর্মের আরবদের জীবন তছনছ করা কেমন সুস্থতা? ওদিকে ইয়েমেনে হামলা করে করে উদ্বাস্তুর ঢল প্রতিদিন বাড়িয়ে চলেছে সৌদি আরব। আরব উপদ্বীপ ও উপসাগরীয় দেশগুলোয় একজন সিরীয়ও আশ্রয় পায়নি। বরং আশ্রয় দেওয়ার পক্ষে বলায় আরব আমিরাত থেকে এক ফিলিস্তিনি ব্লগারকে বহিষ্কার করা হয়।
সিরিয়াকে অস্থিতিশীল করায় তুরস্কের ভূমিকাও কম নয়। তারপরও দেশটির ২০ লাখ আশ্রিত মানুষের মধ্যে ১৭ লাখ সিরীয় ও এক লাখ ইরাকি। লেবাননের প্রতি পাঁচজনের একজন সিরীয়। ইরাকেও আশ্রয় নিয়েছে আড়াই লাখ সিরীয়। আরবদের মধ্যে মিসর ও জর্ডানে রয়েছে যথাক্রমে ১ লাখ ৩০ হাজার ও ৬৩ হাজার সিরীয়। তিউনিসিয়ায় রয়েছে ২২ লাখ লিবীয়। আলজেরিয়ায় আছে ৫৫ হাজার।
শরণার্থীদের ডুবন্ত হাত যখন আরব শাসকেরা ফিরিয়ে দেয়, তখনই অগতির গতি হয় ইউরোপ। এ বছর ভূমধ্যসাগর পেরিয়েছে সাড়ে তিন লাখ শরণার্থী, এদের ২ হাজার ৬০০ জনের সলিলসমাধি ঘটেছে। গত সপ্তাহে অস্ট্রিয়ায় এক লরির ভেতর ৭১ জনের গলিত লাশ মেলে। তুরস্কের উপকূলে শিশু আয়লানের মৃত্যুদৃশ্যের অভিঘাতে পরদিনই জার্মানি সীমান্ত খুলে দেয়। তিন বছরের সেই শিশুটিই হয়ে ওঠে মানবতার আপন সন্তান। ইউরোপীয় বিবেক নড়ে ওঠে। নিজেদের হাতেও রক্ত ও কালিমার দাগ দেখে বিব্রত হয় তারা। ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী অভিবাসনকামীদের ‘পঙ্গপাল’ বললেও জনমতের চাপে দ্রুত অবস্থান বদলান। অথচ আরব িলগ, ওআইসি ও জিসিসি যেন অবশ। এ দেশগুলোর কোনোটিই শরণার্থীর অধিকার–বিষয়ক আন্তর্জাতিক কনভেনশনে স্বাক্ষর করেনি।
সৌদি আরবের অবস্থান তবু বদলায় না। আরব বসন্তের পর থেকে শিয়া, ফিলিস্তিনি ও সিরীয়দের আশ্রয় দেওয়ায় সেখানে নিষেধাজ্ঞা আছে। তাদের ভয়, এরা রাজতান্ত্রিক দুঃশাসন মানবে না বেশি দিন। সৌদি আরব ও আরব আমিরাত একজন শরণার্থীকেও আশ্রয় না দেওয়াকে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিনিধি ‘চরম লজ্জাজনক’ আখ্যা দেন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মুখপাত্রের ভাষায়, ‘দায়ের অংশীদার তারা হতে চায় না, তারা চায় অন্যরা বোঝা সামলাক, তারা কেবল চেক লিখে দিয়েই খালাস।’
সিরিয়ার বিপর্যয়ের দায় এককভাবে যুক্তরাষ্ট্রেরই বেশি। অথচ তাদের ‘রাইট টু প্রটেক্ট’ কিংবা ‘মানবিক হস্তক্ষেপের’ হাত সিরিয়ায় পৌঁছায় না। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের কিছু সদস্যের ভাষ্য, শরণার্থীরা সন্ত্রাসীদের পাইপলাইন বানাবে। অথচ যুক্তরাষ্ট্রই সেক্যুলার সিরিয়ায় গণতন্ত্র রপ্তানির নামে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের অস্ত্র দিয়েছে জঙ্গিদের। হাজার হাজার যুবককে প্রশিক্ষণ দিয়ে ‘মুক্তিযোদ্ধা’ খেতাব দিয়ে সন্ত্রাসের পাইপলাইন এখনো চালু রেখেছে।
জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেলের আট লাখ শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়ার অঙ্গীকার মহৎ দৃষ্টান্ত। জার্মানির এই উদারতার পেছনে রয়েছে অর্থনীতি ও সংস্কৃতি। তাদের জনসংখ্যা কমতির দিকে। উন্নতি বজায় রাখতে আরও শ্রমিক চাই। প্রচলিত কোটায় এত শ্রমিক আনা সম্ভব না। দ্বিতীয়ত, প্রধান দুই দল ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাট ও গ্রিন পার্টি একজোট হওয়ায় বর্ণবাদীদের আপত্তি ধোপে টিকছে না।
এই যুদ্ধের আগে সিরীয়রা কখনোই শরণার্থী হয়নি। পড়তে আসা সিরীয়রা আশ্রয়প্রার্থী হয়নি পাশ্চাত্যে। সেই সিরিয়ার এমন অবমাননায় আরবশাহির হাত থাকা লজ্জাজনক।

ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।
bagharu@gmail.com

মানুষ হত্যার এমন উৎসব আগে কখনো দেখা যায়নি

কোথাও যুদ্ধ হয়, বেশুমার মানুষ মরে। আমরা তার খবর পড়ি আর ভুলে যাই। বাড়ির পাশে ‘বন্দুকযুদ্ধ’ হয়, পরদিন খবরের কাগজ থেকে জানা যায়, আরও একটি লাশ পড়েছে। যুদ্ধে যে মারে তার জবাবদিহি হয় না। যাদের মারা যায়, তারাও জানে এসব হত্যার বিচার হবে না; হয় না কদাচিৎ। নিহত স্বজনের লাশ পাওয়ার আর আদরযত্নে আর শোকে তাকে দাফন করার সুযোগও থাকে না যুদ্ধের দিনে। যুদ্ধ থামলে হয়তো সুযোগ পেলে তারা স্বজনের শেষনিঃশ্বাস ছাড়ার জায়গাটা দেখে আসে। পারলে গণকবর খুঁজে বের করে ফুল দেয়। তারপর আবার ফিরে আসে যার যার জীবনে। জীবন এমন এক কঠিন কারাগার, যেখানে ফিরতেই হয়।
বাংলাদেশে অপঘাতে মৃত্যুও এক নাছোড় দানব, যার লাশের ক্ষুধা মেটাতে হয় প্রতিদিন। এখানে এখন গড়ে প্রতিদিন একজন মানুষ মারা যাচ্ছে ‘যুদ্ধে’। যুদ্ধই বলছি, কারণ সরকারি বাহিনীগুলো এসব হত্যাকাণ্ডকে যুদ্ধের পরিভাষা দিয়েই চিনিয়েছে: ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ ইত্যাদি। কথাশিল্পী মাহমুদুল হকের একটি গল্পের নাম ছিল ‘প্রতিদিন একটি রুমাল’। এখন আমাদের খবরের কাগজের শিরোনাম হয় ‘প্রতিদিন গড়ে একটি হত্যা’।
খুন করে নদীতে লাশ ভাসিয়ে দেওয়ার ‘ঐতিহ্য’ আছে বাংলাদেশে। প্রায়ই নদীর ধারে নিয়ে গিয়ে খুন করে লাশ ডোবানোর ঘটনা সংবাদে আসে। লঞ্চডুবির পরও অজস্র লাশ ভাসে। একাত্তর সালে, পাকিস্তানি বাহিনী নদীর ধারে সারবেঁধে বাঙালিদের দাঁড় করিয়ে গুলি করত। দেহগুলো নদীতে পড়ে ভাসতে ভাসতে কাক-শকুন আর মাছের খোরাক হতো। পুরাকালে সাপে কাটা কিংবা বেওয়ারিশ লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেওয়ার রীতিও ছিল। এখনকার রীতি হলো বন্দুকযুদ্ধ। সবাই জানে এসব আসলে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড।
এত মৃত্যুর জন্য পেশাদার বাহিনী লাগে, প্রয়োজন হয় ‘ডেথ স্কোয়াডের’। আমাদেরই চারপাশে তারা থাকে, খায়, ঘুমায়, আনন্দ করে, টহল দেয়। তারপর তালিকা ধরে ধরে মধ্যরাত থেকে ভোরের কোনো সময়ে নদীর বাঁধ বা খেতের কিনারে নিয়ে শিকারকে হত্যা করে। এ রকম করে প্রতিদিন একটি রুমাল এখন কার প্রয়োজন?
এই মৃত্যুর চানমারি শুরু হয়েছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরুদ্ধে জামায়াত-শিবিরের সহিংস প্রতিরোধের মাধ্যমে। যে সহিংসতা তারা শুরু করেছিল, আজ তা-ই বহুগুণে বড় হয়ে হয়ে তাদের বিনাশ করছে। সেই ককটেল, পেট্রলবোমা—যার শুদ্ধ নাম মলোটভ ককটেল খুবই গরিব-দরদি। বেছে বেছে মেহনতি মানুষকেই তারা হত্যা করত। সেটা এমন সময়, যখন সরকারি দলের সমর্থকদেরও কেউ কেউ বোমা-বারুদসহ জনতার হাতে ধৃত হয়েছে। অন্যদিকে বিরোধী দলের লোকেরা তো আগুন নিয়ে খেলছিলই। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর হঠাৎ সেই সব বোমাবাজ গায়েব হয়ে গেল। কোথায় গেল? এখন কেন আর তাদের প্রয়োজন হচ্ছে না?
এসব ককটেল আর পেট্রলবোমা সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছে সাধারণ মানুষের, দ্বিতীয় ক্ষতিগ্রস্ত বিরোধীদের ভাবমূর্তি। এর জন্য তাদের জনপ্রিয়তা কমেছে। অন্যদিকে হিসাব করলে বোঝা যায়, লাভবান হয়েছে ‘সরকার’। সেই লাভ এমনই লাভ যে নির্বাচন, গণতন্ত্র, জনপ্রতিনিধিত্ব—সবকিছুই ওই ‘পেট্রলবোমার’ ভয়ে উবে গেল, তেমন কোনো আহাজারিও করল না কেউ।
আগুন দিয়ে চলন্ত বাস-গাড়ি-ট্রাকে নিরীহ মানুষ পুড়িয়ে মারার মতো নৃশংসতা কি একাত্তরের পরে দেখেছে বাংলাদেশ? হ্যাঁ, কি স্বৈরশাসক, কি নির্বাচিত শাসক—সব আমলেই গুলি চলেছে। কিন্তু মানুষ হত্যার এমন উৎসব আগে কখনো দেখা যায়নি। ২০১৩ সালে এ রকম রাজনৈতিক সহিংসতায় ৫০৭ জন নিহত হন। এখন শোনা যাচ্ছে, জামায়াতি সন্ত্রাসীদেরই নাকি খুঁজে খুঁজে হত্যা করা হচ্ছে। সরকারের বিভিন্ন নেতা-নেত্রী পরোক্ষভাবে এসব হত্যাকাণ্ডকে জায়েজ করে বক্তব্য দিয়েছেন।
অবাক হওয়ার কিছু নেই, আমরা যাঁরা পকেটমারকে পিটিয়ে মেরে ফেলে উচিত শিক্ষা দিই, তাঁদের অনেকেই এ রকম আইনবহির্ভূত হত্যাকে সমর্থন করছেন। এই সমর্থনের শুরু হয়েছিল বিএনপি আমলের অপারেশন ক্লিন হার্টের সময়। তারপর এল ক্রসফায়ার। অনেকেই এটাকেই সন্ত্রাস দমনের ধন্বন্তরি পথ বলে বাহবা দিলেন। কিন্তু তাতে কি জনগণের নিরাপত্তাহীনতা কমেছে? রাজনীতি থেকে সহিংসতা দূর হয়েছে? নাকি তা আরও বহুগুণে বেড়েছে। এখন আর বিচ্ছিন্ন সন্ত্রাস হয় না। এখন হয় বেআইনি ও আইনি বাহিনীর সংঘবদ্ধ হত্যাযজ্ঞ। পৌরাণিক কাহিনিতে পরশুরাম পাপের বিনাশে কুঠার হাতে নিজের বংশকেই নাশ করেছিলেন। নদীর তীর ধরে তিনি হত্যা করতে করতে এগিয়ে গিয়েছিলেন। পরিণামে সেই কুঠার তাঁর হাতের অংশ হয়ে যায়, কোনোভাবেই তাকে ছাড়ানো যায় না। অবশেষে করতোয়া নদীর জলে হাত ধুলে সেই ঘাতক
কুঠার খসে। রাষ্ট্রের হাতে যাঁরা পরশুরামের কুঠার তুলে দিয়েছেন, আশা করছেন প্রতিপক্ষ বিনাশেই সেটা শেষ হবে, তাঁরা ভুল করছেন।
র‌্যাবের জন্ম দিয়েছিল বিএনপি, অথচ আজ তারাই এই বাহিনীর বিচারবহির্ভূত হত্যা নিয়ে সোচ্চার। যে আওয়ামী লীগ ২০০৮-এর নির্বাচনী ইশতেহারে ক্রসফায়ার বন্ধের কথা বলেছিল, আজ তারাই হয়েছে ‘বন্দুকযুদ্ধের’ প্রবর্তক। হত্যা আরও হত্যা ডেকে আনে; এই সত্য তারা ভুলে
যেতে পারে, কিন্তু নাগরিক হিসেবে আমাদের জন্য এমন বিস্মরণ হবে আত্মঘাতী।
যারা পেট্রলবোমায় মানুষ মেরেছে, তাদের বিচার করতে অসুবিধা কোথায়? এত মৃত্যু যাদের হাতে ঘটেছে, তাদের নিশ্চয়ই একটা পরিকল্পনা ছিল, উদ্দেশ্য ছিল, সহায়-সরঞ্জাম ও তহবিল ছিল। তার চেয়েও বড় কথা, তাদের ছিল ‘নিয়োগদাতা, হুকুমদাতা’। আটক করে বিচার করলে তাদের মুখ থেকে সম্পূর্ণ সত্যটা মানুষ জানতে পারত। যে রাজনীতি এ রকম হত্যার আয়োজন চালায়, তাদের মুখোশ খসে পড়ত। কিন্তু সরকার সেই জরুরি কাজটা কেন করছে না? সত্য উন্মোচনে তাদের কিসের ভয়? এ ধরনের রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড শেষাবধি রাজনীতিকেই হত্যা করে। হত্যা করে আইন, যুক্তি ও ন্যায়কে।
সত্য নেই, রয়েছে গুজব। ভূতের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি করে না আধুনিক কোনো সরকার; কিন্তু জগতে এমন সরকার কম যে গুজবের বিরুদ্ধে লড়াই করে না। এ যেন হাওয়ায় তরবারি চালিয়ে গুজবের আগামাথা তরমুজের মতো ফালাফালা করার কারবার। যখন সত্য বিতর্কিত বা জানার অতীত, তেমন সময়ই গুজবের বসন্ত। সময়ের জ্বলন্ত প্রশ্নগুলোয় যে-ই হাত দিচ্ছে, তার হাতই পুড়ে যাচ্ছে। সরকারি প্রেসনোটের মধ্যিখানে ফোকর ধরা পড়লে জানবেন, সত্যটা ওই পথেই পগারপার। এমন দিনেই তারে বলা যায়: মতিঝিলে নাকি...রানা প্লাজার রেশমা নাকি...বিএনপি নাকি..., বন্দুকযুদ্ধ নাকি... ইত্যাদি। গুজবে উত্তর থাকে না, থাকে সময়ের সবচেয়ে জ্বলন্ত ও জরুরি প্রশ্ন। সবলের বিরুদ্ধে গুজব দুর্বলের অস্ত্র। যখন সত্যের কারবারিরা জনমনের আস্থা হারায়, তখন ‘নাকি’ শব্দটা আমাদের বাক্যের মধ্যে খিল গেড়ে প্রতিষ্ঠিত মিডিয়াকে প্রশ্ন করে, ‘তোমরা নাকি...’। আমাদের কালের দুর্ধর্ষ গুজব রাশি সেসব প্রশ্নেরই উত্তর প্রস্তাব করে, একচক্ষু সরকার যার ওপর ধামা হয়ে চেপে বসেছে; যার উত্তর দিতে ব্যর্থ হয়েছে। বন্দুকযুদ্ধ নিয়ে, প্রতিদিন একটি বা ততোধিক হত্যা নিয়েও গুজব ডানা মেলা শুরু করেছে।
তাহলেও সরকার নড়বে না চড়বে না। সাগর-রুনির মতো ব্যাখ্যাতীত অনেক মৃত্যুর প্রতিকারে ব্যাখ্যাতীত দায়িত্বহীনতা দেখিয়েই যাবে। কেবল নদীমাতৃক বাংলাদেশের নদীগুলো মায়ের মতো অসীম মমতায় অপঘাতে নিহত সন্তানদের লাশ বুকে নিয়ে বইতে থাকবে। বইতেই থাকবে। যারা বন্দুকযুদ্ধ বা ক্রসফায়ার বা পেট্রলবোমায় নিহতদের লাশ আনতে যায়, সকালে বা সন্ধ্যায়, তাদের বোবা প্রতিবাদের ভাষা পড়ার ক্ষমতা জাতি হিসেবেই হয়তো আমরা হারিয়ে ফেলেছি।
তুর্কি চলচ্চিত্রকার ইলমাজ গুনের ছবি ইওল। ছবির একটি দৃশ্যে কুর্দিস্তানের বিদ্রোহীদের লাশ নিয়ে আসতে দেখা যায় সেনাদের। তাদের ট্রাকের পেছনটায় সার সার লাশ। ট্রাকটা একের পর এক কুর্দি গ্রামে ঢোকে, আর গ্রামবাসীদের বলা হয় লাশ শনাক্ত করতে। তারা বাধ্য হয় সারবেঁধে নির্বিকার মুখে একে একে লাশগুলো দেখে যেতে। একটি লাশের সামনে এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়াতে দেখা যায় এক বাবাকে। সেনারা এগিয়ে আসে, চোখে প্রশ্ন: আপনার? লোকটি নীরবে মাথা নাড়িয়ে সরে যায়। নিজের ছেলের লাশ শনাক্ত করাও যে বিপদ! বাংলাদেশে আমরা ধন্য, আমাদের বাবাদের নিহত ছেলের লাশ শনাক্ত করার সুযোগ আছে।

ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।
bagharu@gmail.com

সব বলে দিয়েছে শিশু আয়লান // ফারুক ওয়াসিফ

‘আমি খোদার কাছে সব বলে দেব’, মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার মুখে এই ছিল তিন বছর বয়সী অন্য এক সিরীয় শিশুর শেষ আর্তনাদ। বিশ্বের রাজাধিরাজেরা তখন শোনেননি। এরই সাড়ে তিন মাস পর একই বয়সী আরেকটি শিশুর নির্বাক প্রতিবাদ দুনিয়াকে কাঁপিয়ে দিল। যে মানবতা ভেসে গেছে, সেই অমানবতার সমুদ্রে ভাসতে ভাসতে শিশুটি এসে ঠেকেছিল তুরস্কের উপকূলে। সেই দৃশ্য কেউ তুললেন, কেউ তা ফেসবুকে দিলেন, কোনো পত্রিকা তা প্রকাশ করল, কোনো টেলিভিশনে তা প্রচারিত হলো। যে ব্রিটিশ ট্যাবলয়েড পত্রিকা সান আগের দিন সিরীয় উদ্বাস্তুদের প্রতি বিদ্বেষমূলক শিরোনাম করেছিল: উদ্বাস্তু ঠেকাও। পরদিন তারাই সমুদ্রের ঢেউ ছুঁয়ে থাকা আয়লানের ছবি ফলাও করে ছাপল। আবারও প্রমাণিত হলো, নিষ্পাপের মৃত্যু অসহনীয়, অবর্ণনীয়, ক্ষমার অযোগ্য। আয়লান একাই বিশ্বমানবতার ঘুম ভাঙিয়েছে, বিশ্বনেতাদের দাঁড় করিয়ে দিয়েছে দায়িত্বহীনতার কাঠগড়ায়, বিশ্ববাসীকে জানিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের ভয়াবহ দোজখের দুর্দশার কথা।

আয়লানের ওই ছবিটা যেন অপার্থিব বিষাদের প্রতীক। যেন সে ঘুমিয়ে আছে এক শুভ্র বিছানায়। সমুদ্রের ঢেউগুলো যেন তার শীততাড়ানি কম্বলের ঝালর। পায়রার বুকের মতো কোমল গাল পেতেছে সে যে বেলাভূমিতে, তা যেন তার মায়ের পাতা সোহাগী বিছানা। তার লাল জামাটি যেন অতীতের কোনো যুদ্ধহীন দিনের স্মৃতির ঝলক। তার পায়ের জুতা জোড়াও তার মতোই আদুরে। জুতা নিয়ে সব শিশুরই দারুণ আমোদ, উৎসাহ আর গল্প থাকে। পৃথিবীতে যা সবচেয়ে সুন্দর, তার ধ্বংসই সবচেয়ে অসহনীয়। আয়লানের মৃত্যুর মর্মান্তিকতার আরেক পিঠে তাই দেখা যায় যুদ্ধবাজ রাজনীতির নৃশংসতা আর রাষ্ট্রনেতাদের স্বার্থপরতার প্রমাণচিত্র।

আয়লানের জুতাজোড়া মনে করিয়ে দেয় আর্নেস্ট হেমিংওয়ের এক বাক্যের এক গল্পের ধাক্কা, ‘বিক্রি হবে: কখনো না পরানো এক জোড়া পুরোনো জুতা।’ আয়লানের ওই ছবিটা ফিরিয়ে এনেছে ভিয়েতনামে মার্কিন নাপাম বোমায় পোড়া কিশোরীর ভয়ার্ত মুখ, ফিরিয়ে এনেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অসহায় ইহুদি কিশোরী আনা ফ্রাঙ্কের আকুতি। বিপন্ন শৈশব বিপন্ন মানবতার চিহ্ন, সেই চিহ্নই আজ ভাসছে ভূমধ্যসাগরে।
যখন ভূমিতে জল্লাদ, তখন দরিয়ায় কী ভয়! আয়লানের বাবা-মাও তাই মরিয়া ছিলেন দেশ ছাড়তে। ফেরাউনের ভয়ে শিশু মুসা (আ.)-এর প্রাণ বাঁচাতে তাঁর মাও তাঁকে ভাসিয়ে দিয়েছিলেন নীল নদে, ছোট্ট একটি গামলায়। পরিণত বয়সে আবারও তাঁকে দাঁড়াতে হয়েছিল মৃত্যু ও উত্তাল সমুদ্রের কিনারে। সমুদ্র সেদিন তাঁকে ও তাঁর জাতিকে পথ করে দিয়েছিল। কিন্তু এটা কলিকাল। আবদুল্লাহ কুর্দির মতো অসংখ্য সিরীয়-লিবীয়-ইয়েমেনীয় উদ্বাস্তুর ডাক শুনবে কে? ‘এই দুনিয়া এখন তো আর সেই দুনিয়া নাই, মানুষ নামের মানুষ আছে দুনিয়া বোঝাই’।
মহান আরব ভ্রাতৃত্ব অন্ধ ও বধির। ধনী আরব শাসকেরা গরিব আরবদের ধ্বংসে মেতেছে। ইউরোপীয় সভ্যতা আর সেই সভ্যতার ত্রাতা যুক্তরাষ্ট্র দূর থেকে দেখছিল। জীবনের মায়া এমন, সন্তানের জীবনের ভয় এমন অদম্য যে হতভাগ্য আবদুল্লাহ কুর্দি দমে যাননি। তিনি কানাডায় বোনের কাছে যাওয়ার আবেদন করেছিলেন কানাডীয় সরকারের কাছে। একদা অভিবাসীদের স্বর্গ কানাডায় এখন রক্ষণশীল সরকার। সেই সরকারের আমলারা কাগজপত্রের খুঁত দেখিয়ে পরিবারটিকে বারবার ফেরায়। অবশেষে টাকা জোগাড় করে তুর্কি দালালের কাছে ধরনা দেন আবদুল্লাহ। জাহাজের কথা বললেও পরিবারটিকে আরও অনেকের সঙ্গে তুলে দেওয়া হয় ছোট্ট একটি নৌকায়। (সাম্প্রতিক বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা অভিবাসীদের মর্মান্তিক মৃত্যুর আখ্যান যেন) যথারীতি মাঝ দরিয়ায় তা ডুবে যায়। পিতা কেবল উঠতে পারেন তীরে। সমুদ্র নাকি সবই ফিরিয়ে দেয়। আবদুল্লাহর দুই সন্তান ও স্ত্রীকেও ফিরিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু জীবনটা কেড়ে নিয়ে।

আবদুল্লাহ কুর্দি ছিলেন এক সিরীয় কুর্দি নাপিত। বোনের দোহাই দিয়ে কুর্দি কানাডায় আবেদন করেছিলেন, ‘আমাদের খরচ সে জোগাবে’। বোনও কানাডীয় কর্তৃপক্ষকে বলেছিলেন, ‘তারা আমার সঙ্গে চুল কাটার কাজ করতে পারবে। আমি তাদের কাজও খুঁজে দিতে পারব।’ থাকার, চলার অসুবিধা হতো না। তবু অনুমতি মিলল না। হলে আয়লান বেঁচে যেত। এখন কানাডীয় সরকার দেশবাসীর কাছে অনুতাপ করছে। আয়লানের ফুফুও কেঁদে কেঁদে বলছে, ‘কেন আমি ওদের আসতে বললাম!’ এখানেই থামেননি তিনি, ‘আমি আজ সত্যিই যা চাই তা হলো যুদ্ধের অবসান। সারা পৃথিবীর মানুষের উচিত এগিয়ে এসে সিরীয় যুদ্ধ বন্ধ করা। তারাও তো মানুষ!’

যে ইউরোপীয় পরাশক্তিগুলো সিরিয়ায় আসাদ সরকারকে উচ্ছেদের জন্য অর্থ, অস্ত্র ও প্রশিক্ষক ঢেলেছিল, যে সৌদি আরব ইরান ও সিরিয়াকে এক ঢিলে ঘায়েল করতে জঙ্গি জিহাদি সৃষ্টি করেছিল, তারা জানত না যুদ্ধ মানেই গণহত্যা, দেশান্তর আর নিরীহ-নিষ্পাপের নিধন? কিউবার রাষ্ট্রনায়ক ফিদেল কাস্ত্রো অভিযোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলই বর্বর আইএসকে সৃষ্টি করেছে, যেমন করেছিল তালেবানদের। ব্রিটেনের জনপ্রিয় দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকায় সেই পত্রিকার নামজাদা প্রতিবেদক সিম্যাস মিলনে তথ্য–প্রমাণসহ প্রতিবেদন প্রকাশ করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে ইরাক ও সিরিয়ায় আইএস অথবা আইসিসের উত্থানে জ্বালানি জুগিয়ে গেছে। আইএসের ধ্বংসযজ্ঞের সুবাদেই আজ তেলের দাম কম, জোগান বেশি আর তেল ব্যবসায়ীদের রমরমা। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যে বিরাট আকারের গণহত্যা চলে আসছে, তার দায়ও যেমন তারা স্বীকার করেনি, তেমনি বলকান অঞ্চলে যে ‘মানবিক হস্তক্ষেপ’ দেখা গিয়েছিল, এখানে তার দরকার মনে করেনি। কিন্তু চোখের আড়ে পাহাড় লুকানো যায় না। প্রতিবাদ, খবর, হুঁশিয়ারি যা পারেনি, এক আয়লানের লাশের ভাসান সেই মিথ্যার জারিজুরি ছিঁড়ে ফেলেছে। কোনো বুলেট যা পারেনি, আয়লান তা পেরেছে। সে বেহুঁশ বেবুঝ শাসকদের মুখোশ খুলে দিয়েছে।
আর তখনই দেখা গেল, মানুষের ভরসা আজও সাধারণ মানুষই। অভিবাসীদের যাত্রাপথের দেশের সাধারণ মানুষ সিরীয় উদ্বাস্তুদের বরণ করে নিতে রাস্তার পাশে খাবার, পানি ও ফুল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা শুরু করেছে। উদার জার্মানি দুয়ার খুলে দিয়েছে। ইউরোপীয় জাতগর্বী দুর্গের দেয়াল টিকিয়ে রাখা যাচ্ছে না।
কিন্তু কী করবেন আয়লানের বাবা? যে কানাডা তাঁর পরিবারকে ফিরিয়ে দিয়েছিল, তারাই এখন তাঁকে সাধছে। কিন্তু কী আসে যায় এখন? নিউইয়র্ক টাইমস-এ এসেছে তাঁর হাহাকার: ‘সারা দুনিয়ার সব দেশ দিয়ে দিলেও আমি তা চাই না। যা ছিল অমূল্য, তার সবই তো গেছে আমার!’
জীবনে আশ্রয় পায়নি আয়লান, মৃত্যুতে পেয়েছে। বছরের পর বছর ধরে ইরাক, আফগানিস্তান, ফিলিস্তিন ও সিরিয়ায় যুদ্ধ চলছে। নিহত হয়েছে লাখো শিশু। অমানবিকতার পাষাণ পাথর তাতে নড়েনি। নতুন নতুন দেশে তেল দখলের, ভূমি দখলের, শাসক বদলের আর গণতন্ত্র রপ্তানির যুদ্ধ রপ্তানি চলছেই। শিশু আয়লানের ছোট্ট দেহটি এই যুদ্ধবাজ রাজনৈতিক অর্থনীতিকেই প্রশ্ন করছে। বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ একাত্ম হয়ে কেঁদেছে আয়লানের বাবা আবদুল্লাহর সঙ্গে।

যে চলে গেছে তার যন্ত্রণার অবসান হয়েছে। যিনি বেঁচে আছেন, আয়লানের সেই হতভাগ্য পিতা এখন রোজ উদ্বাস্তু শিবিরে যান, মানব পাচারকারীদের কাছে যেতে নিষেধ করেন শরণার্থীদের। এদিকে নিউইয়র্ক টাইমস-এর আরেক প্রতিবেদক শরণার্থী দলের সঙ্গে ঘুরতে ঘুরতে সিরীয়-লিবীয়দের মধ্যে আবিষ্কার করেন এক বাংলাদেশিকে। যুদ্ধের বিশ্বায়ন মৃত্যুরও বিশ্বায়ন ঘটাচ্ছে।
একা এক আয়লান সত্যিই সব বলে গেছে

ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।
bagharu@gmail.com

Friday, 16 October 2015

হিজরতের স্মৃতি সমুজ্জ্বল হিজরী সন

হিজরত প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের মুবারক জীবননেতিহাসে এক অতি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তিনি আল্লাহ্ জাল্লা শানুহুর নির্দেশে মক্কা মুকাররমা থেকে মদীনা মনওয়ারায় হিজরত করেন। এই হিজরতের ফলে ইসলামের সুদূরপ্রসারী বিজয়ের বিশাল দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের এই হিজরতের মাহাত্ম্য বলতে গিয়ে ঐতিহাসিক যোসেফ হেল বলেছেন : ওঃ রং ধ ঃঁৎরহহু চড়রহঃ রহ ঃযব ষরভব ধহফ ড়িৎশ ড়ভ ঃযব ঢ়ৎড়ঢ়যবঃ ঃযব মৎবধঃ ঃঁৎহরহম ঢ়ড়রহঃ রহ ঃযব যরংঃড়ৎু ড়ভ ওংষধস- এটা হচ্ছে মহানবী (সা) এর জীবন ও কর্মে এক মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা আর ইসলামের ইতিহাসে মহাদিগন্ত উন্মোচনকারী অধ্যায়।
আমরা জানি, প্রিয়নবী (সা) ৬১০ খ্রিস্টাব্দের ২৭ রমাদান রাতে প্রথম ওহী লাভ করেন। প্রথম ওহী লাভের তিন বছর পর আল্লাহ্ তাঁকে তাঁর আপনজনদেরকে দীনের পথে আহ্বানের নির্দেশ দেন। গুটিকয়েক ভাগ্যবান ব্যক্তি ছাড়া মক্কায় কাফির মুশরিকরা তাঁর হিদায়াত গ্রহণ তো করলই না বরং তারা তাঁর বিরুদ্ধাচরণ করল। তাঁর এবং তাঁর সঙ্গী সাথীদের ওপর নেমে এলো অকথ্য অত্যাচার ও নির্যাতন। তিনি ধৈর্য ধারণ করে হিদায়াতের বাণী পৌঁছানোর কাজ চালিয়ে যেতে লাগলেন। ইতিমধ্যে বেশকিছু সৌভাগ্যবান ব্যক্তি একে একে তার ডাকে সাড়া দিয়ে ইসলাম গ্রহণ করলেন। কাফির মুশরিকদের অত্যাচারের মাত্রা দিনকে দিন বৃদ্ধিই পেতে লাগল। কাফির মুশরিকরা তাঁকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র আঁটল এবং একদিন রাতে তাঁর বাড়ি ঘেরাও করে ওঁৎ পেতে থাকল। আল্লাহর নির্দেশে তিনি হযরত আলী (রা.) কে তার বিছানায় শুইয়ে রেখে অতি সন্তর্পণে তাঁর কদম মুবারকের বৃদ্ধাঙ্গুলির ওপর ভর করে বেরিয়ে গেলেন। বের হওয়ার সময় এক মুষ্টি ধুলোতে সূরা ইয়াসীনের প্রথম কয়েক খানি আয়াতে কারীমা পাঠ করে ফুঁক দিয়ে তা ওঁৎ পেতে থাকা কাফির-মুশরিককের দিকে ছিটিয়ে দিলেন। কাফির মুশরিকদের শরীরে সে ধুলো পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা তন্দ্রাহত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম সন্তর্পণে বের হয়ে এসে হযরত আবু বকর রাদিআল্লাহু তাআলা আনহুকে নিয়ে ছত্তর পর্বত গুহায় এসে কয়েক দিন থাকলেন। তারপর তিনি মক্কা মুকাররমা থেকে প্রায় ২৯৬ মাইল দূরে অবস্থিত ইয়াসরীব নগরীর উদ্দেশে রওয়ানা হলেন। মক্কা থেকে চলে যাওয়ার সময় তিনি আঁসুসিক্ত চোখে বার বার কা‘বা শরীফের দিকে তাকিয়ে বলছিলেন, হে কা‘বা আমি তোমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছি। আমাকে বের করে দেয়া হচ্ছে। আল্লাহর যমীনে তুমিই আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় স্থান। হে মক্কা, তোমার সন্তানরা আমাকে এখানে থাকতে দিল না। যদি আমার কওম আমাকে তোমার কাছ থেকে চলে যেতে বাধ্য না করত তাহলে আমি আদৌ তোমাকে ছেড়ে যেতাম না। তিনি আবেগ-আপ্লুত কণ্ঠে এ কথাগুলো বলছিলেন আর বার বার চোখের পানি মুছছিলেন। আল্লাহ্ জাল্লা শানুহু তাঁর প্রিয় হাবীব (সা) কে উদ্দেশ করে ইরশাদ করলেন : আপনি বলুন, হে আমার রব, আমাকে প্রবেশ করাও কল্যাণের সঙ্গে এবং আমাকে বের করাও কল্যাণের সঙ্গে এবং তোমার কাছ থেকে আমাকে দান করো সাহায্যকারী শক্তি (সূরা বনী ইসরাইল : আয়াত ৮০)।
প্রিয় নবী (সা) ইয়াসরীব নগরীর তিন মাইল দূরে অবস্থিত নগরীর প্রবেশ মুখ কুবা নামক স্থানে প্রায় ১৫ দিন পরে এসে পৌঁছলে ইয়াসরীবের মানুষ তাঁকে বিপুল সংবর্ধনা প্রদান করে। তখন ইয়াসরীবের অধিবাসীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৫ হাজার। সমগ্র জনতা তাঁকে গ্রহণ করার জন্য সমবেত হয়েছিল। ছোট ছোট বালক-বালিকারাও তাদের মা এবং অন্যরা সমবেত কণ্ঠে সুললিত উচ্চারণে যে কাসিদা পাঠ করেছিলেন তা আজও মিলাদ মাহফিলে পাঠ করা হয়। প্রিয়নবী (সা) কুবাতে কয়েকদিন অবস্থান করেন এবং এখানে স্থাপন করেন একটি মসজিদ যা বর্তমানে কুবা মসজিদ নামে খ্যাত। ৬২২ খ্রিস্টাব্দের ১২ রবিউল আউয়াল তিনি কুবা থেকে ইয়াসরীব নগরীর উদ্দেশে রওয়ানা হন। বিশাল জশ্নে জুলুস বা আনন্দ মিছিল তাঁর সঙ্গে সঙ্গে ইয়াসরীবের জনগণ তাঁদের নগরীর নাম করেন মদীনাতুন নবীÑ নবীর শহর, যা আজকের মদীনা মনওয়ারা মদীনা শরীফ সোনার মদীনা।
মদীনা তশরীফ আনায় প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের জীবনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো। ৬১০ খ্রিস্টাব্দে প্রথম ওহী লাভ করার পর তাঁর মক্কী জীবনের ব্যাপ্তি ছিল প্রায় ১২ বছর। মক্কী জীবনের এই সময়কালে তাঁকে মুকাবিলা করতে হয়েছে বহু নির্যাতন, লাঞ্ছনা, গঞ্জনা। তাঁর সাহাবায়ে কেরামের ওপরও নেমে এসেছে কাফির-মুশরিকদের অত্যাচারের জগদ্দল পাথর। এমনকি প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের জীবননাশেরও চেষ্টা করা হয়েছে। মদীনায় তাঁর হিজরত করে আসার ফলে ইসলামের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় সূচিত হয়েছে।
মদীনায় স্থাপিত হয়েছে মসজিদে নববী। পাঁচ ওয়াক্ত সালাত কায়েম হয়েছে। রমাদানের এক মাস সিয়াম পালনের বিধান নাযিল হয়েছে, যাকাত ও হজের বিধানও নাযিল হয়েছে। মদীনায় হিজরতের ফলে ইসলামের বিধি-বিধানসমূহ সামগ্রিকভাবে পালনের ভিত্তি সুদৃঢ় হয়েছে, প্রণীত হয়েছে পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম লিখিত শাসনতন্ত্র মদীনার সনদ।
মক্কার কাফির মুশরিকরা প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের সাফল্য সহ্য করতে পারেনি। তারা বার বার মদীনা আক্রমণ করেছে। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম প্রতিটি আক্রমণই প্রতিহত করতে সমর্থ হয়েছেন। এক কথায় ইসলামের পূর্ণাঙ্গতা সম্ভব হয়েছে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের মদীনা মনওয়ারায় হিজরত করে আসার ফলে। যে কারণে হিজরতের গুরুত্ব অপরিসীম।
আরব দেশে মাস গণনার রীতি প্রচলিত থাকলেও সুনির্দিষ্ট সন বা বর্ষ গণনার রীতি ছিল না বললেই চলে। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের জন্মের ৫০ দিন পূর্বে ইয়েমেনের জালিম রাজা আবরাহা মক্কায় কা‘বা শরীফ ধ্বংস করবার উদ্দেশ্যে একটি হস্তিবাহিনী নিয়ে মক্কা আক্রমণের উদ্দেশ্যে মক্কা থেকে প্রায় তিন মাইল দূরে এসে ছাউনি স্থাপন করে। আল্লাহ্ জাল্লাশানুহু ছোট ছোট পাখি বা আবাবীল পাঠিয়ে আবরাহার বাহিনীকে ধ্বংস করে দেন। কুরআন মজীদে সূরা ফীলে সেই ঘটনার কথা রয়েছে। ইরশাদ হয়েছে : তুমি কি দেখোনি তোমার রব্ হস্তি অধিপতিদের প্রতি কি করেছিলেন? ওদের বিরুদ্ধে তিনি ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি প্রেরণ করেছিলেন। যারা ওদের ওপর প্রস্তর কংকর নিক্ষেপ করে। অতঃপর তিনি ওদেরকে ভক্ষিত তৃণসদৃশ করেন।
হস্তিবাহিনীর সেই ঘটনার বছর থেকে আরবরা আমুল ফীল বা হস্তিবর্ষ নামে একটি বর্ষ গণনার সূচনা করলেও তা স্থায়িত্ব পায়নি। ৬১০ খ্রিস্টাব্দে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম প্রথম ওহী লাভ করেন। তিনি নবুয়ত ও রিসালতপ্রাপ্ত হন। এর স্মরণে মুসলিম মননে নবুওতের প্রথম বছর, দ্বিতীয় বছর, তৃতীয় বছর এমনিভাবে বর্ষ গণনার রীতি কিছুদিন চালু ছিল। ৬২২ খ্রিস্টাব্দে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম মদীনায় হিজরত করে এলে হিজরতের হিসেবে বর্ষ গণনা চালু হলেও তা বিধিবদ্ধ সন হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয় ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিআল্লাহু তা আলা আনহুর খিলাফতকালে। জানা যায়, খিলাফতের কাজকর্ম, দলিল দস্তাবেজ, নথি, চিঠি খতিয়ান, ফরমান, রাজস্ব আদায় ইত্যাদি জরুরী ক্ষেত্রে সন-তারিখের গুরুত্ব অনুধাবন করেন।
খলীফা হযরত উমর রাদিআল্লাহু তা আলা আনহু একটি খাঁটি ইসলামী ক্যালেন্ডার প্রণয়নের নির্দেশ দেন। খলীফাতুল মুসলিমীন আমীরুল মু’মিনীন হযরত উমর রাদিআল্লাহু তা‘আলা আনহু হযরত আবু মুসা আল আশআরী রাদিআল্লাহু তা‘আলা আনহুর একটি চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে একটি নিজস্ব সন তারিখের প্রয়োজনীয়তা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেন। একটি নতুন সনের উদ্ভাবনের বিষয়ে তিনি বিশিষ্ট সাহাবায়ে কেরামের পরামর্শ সভা আহ্বান করেন। এই নিয়ে সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে বিশদ আলাপ আলোচনা হয়। হযরত আলী রাদিআল্লাহু তা‘আলা আনহুর পরামর্শে তিনি প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের হিজরতের ঘটনাকে অবিস্মরণীয় করে রাখার জন্য যে সনটি প্রবর্তন করলেন সেই সনটিই হিজরী সন। এতে প্রাচীনকাল থেকে আরব দেশে প্রচলিত বারোটি মাসই অন্তর্ভুক্ত করা হয়। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম ৬২২ খ্রিস্টাব্দের রবিউল আউয়াল মাসে মক্কা মুকাররমা থেকে মদীনা মুনওয়ারায় হিজরত করেন। কিন্তু আরবে প্রচলিত মাসগুলোর প্রথম মাস হচ্ছে মুহররম যে কারণে ৬২২ খ্রিস্টাব্দের পহেলা মুহররমকেই নববর্ষের প্রথম তারিখ ধরে ৬৩৯ খ্রিস্টাব্দে হিজরী সনের প্রবর্তন করা হয়। ঠিক এ সময়টাতেই বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে হিজরী সনেরও আগমন ঘটে। হিজরী সন বিশ্ব মুসলিম মননে অতি পবিত্র সন হিসেবে গণ্য হয়। তার কারণ এই সনের মুহররম মাসের দশ তারিখে পালিত হয় আশুরা, সফর মাসের শেষ বুধবারে পালিত হয় আখেরী চাহার শম্বা, ১২ রবিউল আউয়াল পালিত হয় ঈদে মিলাদুন্নবী, ১১ রবিউসসানী পালিত হয় ফাতেহায়ে ইয়াযদহম, ২৭ রজব রাতে পালিত হয় শবে মিরাজ, ১৫ শাবান রাতে পালিত হয় শবে বরাত, মাহে রমাদানের এক মাস পালিত হয় সিয়াম, ২৭ রমাদান রাতে পালিত হয় শবে কদর, শাওয়াল মাসের ১ তারিখে পালিত হয় ঈদুল ফিতর, জিলহজ মাসের ৮ তারিখ থেকে ১৩ জিলহজ পর্যন্ত পালিত হয় হজ, ১০ জিলহজ পালিত হয় ঈদুল আযহা বা কুরবানীর ঈদ।
হিজরী সনের প্রতি মাসের সূচনা হয় চন্দ্র উদয়ের মাধ্যমে। এই চাঁদ দেখার মধ্যেও এক আনন্দ বৈভব রয়েছে। বিশেষ করে ঈদের চাঁদ দেখা রীতিমতো এক সাংস্কৃতিক উপাদানে পরিণত হয়েছে। হিজরী সনের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এই সন মুসলিম জাহানের সর্বত্র সমানভাবে সমাদৃত।

লেখক : অধ্যাপক হাসান আবদুল কাইয়ূম, সাবেক পরিচালক, ইসলামিক ফাউ-েশন বাংলাদেশ

Thursday, 24 September 2015

আত্মোৎসর্গ ও নৈকট্য অর্জনে কোরবানি

কোরবানি শব্দের অর্থ হলো আত্মত্যাগ, আত্মোৎসর্গ, নৈকট্য অর্জন ইত্যাদি। শরিয়তের পরিভাষায় কোরবানি বলা হয় জিলহজ মাসের ১০ তারিখ সকাল থেকে ১২ তারিখ সূর্যাস্তের পূর্ব পর্যন্ত আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট পশু জবাই করা। কোরবানি প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন, ‘সব সম্প্রদায়ের জন্য আমি কোরবানির বিধান (নিয়ম) দিয়েছি, তিনি (আল্লাহ) তাদের জীবনোপকরণস্বরূপ যেসব চতুষ্পদ জন্তু দিয়েছেন, সেগুলোর ওপর যেন তারা আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে।’ (সূরা: হজ, আয়াত: ৩৪) কোরবানি মানব ইতিহাসের সূচনাকাল থেকে চলে আসা একটি ইবাদত, যা মূলত স্রষ্টার উদ্দেশে সৃষ্টির নজরানা।
মানব ইতিহাসের প্রথম কোরবানিদাতা হলেন আদি পিতা হজরত আদম (আ.)-এর পুত্র হাবিল (রা.) ও কাবিল। বাবা আদম (আ.) বললেন, তোমরা আল্লাহর নামে কোরবানি করো, যার কোরবানি কবুল হবে, তার দাবি গ্রহণযোগ্য হবে। অতঃপর তারা উভয়ে কোরবানি দিলেন। হাবিলের কোরবানি কবুল হলো। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা রাসুল (সা.)–কে বলেন, আদম (আ.)-এর পুত্রদ্বয়ের বৃত্তান্ত আপনি তাদের শোনান। যখন তারা উভয়ে কোরবানি করেছিল, তখন একজনের কোরবানি কবুল হলো আর অন্যজনেরটা কবুল হলো না।...অবশ্যই আল্লাহ মুত্তাকিদের কোরবানি কবুল করেন। (সূরা: মায়িদা, আয়াত: ২৭) এতে প্রতীয়মান হয়, কোরবানি কবুল হওয়ার জন্য তাকওয়া, অর্থাৎ খোদাভীতির প্রয়োজন। লোকদেখানো কোনো ইবাদত আল্লাহ তাআলা কবুল করেন না।
আজকের মুসলিম সমাজে কোরবানির যে প্রথা চলমান আছে, এ সম্পর্কে সাহাবায়ে কেরাম প্রিয় নবীজি (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! কোরবানি কী? এটা কোথা থেকে এসেছে?’ প্রিয় নবী (সা.) উত্তরে বললেন, ‘এটা হলো তোমাদের পিতা হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর সুন্নত বা আদর্শ। এই আদর্শ অনুসরণের জন্যই আল্লাহ পাক তোমাদের ওপর কোরবানি ওয়াজিব করেছেন।’ সাহাবায়ে কেরাম (রা.) আবার জিজ্ঞেস করলেন, ‘এতে আমাদের জন্য কী রয়েছে?’ উত্তরে মহানবী (সা.) বললেন, ‘কোরবানির পশুর প্রতিটি পশমে তোমরা একটি করে নেকি পাবে।’ সাহাবায়ে কেরাম বিস্মিত হয়ে জানতে চাইলেন, ‘ইয়া রাসুলুল্লাহ! আমরা যদি ভেড়া কোরবানি করি? ভেড়ার তো অনেক বেশি পশম, এর বিনিময়েও কি আল্লাহ আমাদের সওয়াব দেবেন?’ নবী করিম (সা.) বললেন, ‘আল্লাহর ভান্ডার অফুরন্ত। কেউ যদি তাকওয়ার সঙ্গে আল্লাহর নামে ভেড়া কোরবানি করে, তাহলে তার বিনিময়ে তাকে সে পরিমাণ সওয়াব আল্লাহ অবশ্যই দান করবেন।’
কোরবানির ইতিহাস পবিত্র কোরআনে এভাবে বিবৃত হয়েছে, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমাকে এক নেক সন্তান দান করুন। অতঃপর আমি তাকে এক সহিষ্ণু পুত্রের সুসংবাদ দিলাম। অতঃপর সে যখন তার পিতার সঙ্গে কাজ করার বয়সে উপনীত হলো, তখন ইব্রাহিম (আ.) বললেন, “হে বৎস! আমি স্বপ্নে দেখেছি যে তোমাকে আমি জবাই করছি, তোমার অভিমত কী?” সে বলল, “হে আমার পিতা! আপনি যা আদিষ্ট হয়েছেন, তা-ই করুন। আল্লাহর ইচ্ছায় আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন।” যখন তাঁরা উভয়ে আনুগত্য প্রকাশ করলেন এবং ইব্রাহিম (আ.) তাঁর পুত্রকে কাত করে শুইয়ে দিলেন, তখন আমি তাকে ডাক দিয়ে বললাম, হে ইব্রাহিম! আপনি তো স্বপ্নাদেশ সত্যই পালন করলেন! এভাবেই আমি সৎকর্মশীলদের পুরস্কৃত করে থাকি। নিশ্চয় এটা ছিল এক সুস্পষ্ট পরীক্ষা। আমি তাকে মুক্ত করলাম এক মহান কোরবানির বিনিময়ে। আমি এটা পরবর্তীদের স্মরণে রেখে দিলাম। ইব্রাহিম (আ.)-এর জন্য অভিবাদন! আল্লাহর পক্ষ থেকে শান্তি ও শুভেচ্ছা।’ (সূরা: সাফফাত, আয়াত: ১০০-১১০)
প্রতিটি মানুষ ইবাদত করবে শুধু তার মহান মালিক আল্লাহ তাআলার। মুমিন বান্দা তার কোনো ইবাদতে অন্য কাউকে শরিক করবে না। অর্থাৎ ইবাদত হতে হবে সব ধরনের শিরকমুক্ত, শুধু এক আল্লাহর উদ্দেশে। মহান রাব্বুল আলামিন হজরত ইব্রাহিম (আ.)-কে সে শিক্ষাই দিয়েছেন। ইরশাদ হচ্ছে: ‘বলুন, নিশ্চয় আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু সমগ্র জগতের প্রতিপালক আল্লাহর জন্যই নিবেদিত।’ এ আয়াত দ্বারা স্পষ্ট হয়ে গেল কোরবানি শুধু আল্লাহর উদ্দেশেই হতে হবে। লৌকিকতা বা সামাজিকতার উদ্দেশে নয়। সুতরাং কেউ যদি লাখ টাকার গরু দিয়ে লোকদেখানোর জন্য অথবা নিজের দম্ভ-অহংকার প্রকাশের জন্য কোরবানি দেয়, তা আল্লাহর দরবারে কবুল হবে না। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহর কাছে ওদের গোশত-রক্ত পৌঁছায় না; বরং পৌঁছায় তাঁর কাছে তোমাদের তাকওয়া।’ (সূরা: হজ, আয়াত: ৩৭)
প্রিয় নবী (সা.) বলেছেন, আল্লাহ তাআলা তোমাদের স্বাস্থ্য-চেহারা ও ধন-সম্পদের প্রতি দৃষ্টিপাত করেন না; বরং তিনি দৃষ্টি দেন তোমাদের অন্তর ও আমলের প্রতি। সুতরাং কোরবানির আগেই কোরবানিদাতার নিয়ত বা সংকল্প শুদ্ধ করে নিতে হবে।
কোরবানি ইসলামি ঐতিহ্য। হাদিস শরিফে বলা হয়েছে, কোরবানি হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর সুন্নত। এখানে সুন্নত অর্থ তরিকা বা পদ্ধতি, আদর্শ বা অনুসৃত বিষয়। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন, ‘ফা ছল্লি লিরব্বিকা ওয়ানহার’ অর্থাৎ হে নবী (সা.)! আপনি আপনার রবের উদ্দেশে নামাজ পড়ুন এবং কোরবানি করুন। (সূরা: কাওসার, আয়াত: ২)। এই আয়াত দ্বারা বোঝা যায়, কোরবানি একটি ওয়াজিব (আবশ্যিক) বিধান। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানি করে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের ধারে-কাছে না আসে। (ইবনে মাজা)
কোরবানির তিন দিনে (১০ জিলহজ সকাল থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্তের পূর্ব পর্যন্ত) যার কাছে নিসাব পরিমাণ সম্পদ (সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ বা সাড়ে বায়ান্ন ভরি রুপা অথবা এ উভয়ের যেকোনো একটির মূল্য সমপরিমাণ ব্যবসাপণ্য বা নগদ অর্থ) থাকে, কোরবানি করা তার ওপর ওয়াজিব। যাদের ওপর কোরবানি ওয়াজিব নয়, একান্ত অপারগ না হলে কোরবানি করা তাদের জন্যও উত্তম। কারণ, হাদিস শরিফে আছে, কোরবানির দিনগুলোতে কোরবানির চেয়ে শ্রেষ্ঠ আমল আর নেই। কোরবানির রক্তের ফোঁটা মাটিতে পড়ার আগেই আল্লাহর কাছে তা কবুল হয়ে যায়।
হজরত ইব্রাহিম (আ.) জীবনের পড়ন্তবেলায় প্রিয় সন্তান, কলিজার টুকরা শিশু ইসমাইল (আ.)-কে আল্লাহর নির্দেশে তাঁর রাস্তায় কোরবানির মাধ্যমে কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে কালজয়ী অনন্য যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন, আল্লাহ তাআলার কাছে তা পছন্দ হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা ইব্রাহিম (আ.)-এর স্মৃতিবিজড়িত কোরবানিকে পরবর্তীদের জন্য অনুসরণীয় করে দেন, যাতে মানুষ বুঝতে পারে এবং শিখতে পারে যে অর্থ-সম্পদ, টাকাপয়সা আল্লাহর রাস্তায় কীভাবে ব্যয় করতে হয়। এমনকি প্রয়োজনে আল্লাহর জন্য জীবন দিতেও যেন মানুষের কোনো দ্বিধা-সংশয় না থাকে। তা ছাড়া কোরবানি আত্মত্যাগের প্রশিক্ষণ ও অনুশীলন। মানুষের ষড়্রিপু তথা হিংসা, লোভ, কাম, ক্রোধ, ত্যাগের মাধ্যমে মনের পশুবৃত্তি তথা কুপ্রবৃত্তিকে জবাই করতে হবে। পশু কোরবানির সঙ্গে সঙ্গে ধনলিপ্সা, যশলিপ্সা, লোভ-লালসা, জাগতিক কামনা-বাসনা ও দুনিয়াপ্রীতিকে কোরবানি করে আল্লাহপাকের সন্তুষ্টি ও সান্নিধ্য অর্জন করা কোরবানির শিক্ষা।
ঈদের দিন খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠা, ফজরের নামাজ মসজিদে জামাতের সঙ্গে আদায় করা, সকালে গোসল করা, মিসওয়াক করা, সম্ভব হলে নতুন জামা অথবা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন জামা-কাপড় পরিধান করা, আতর-সুগন্ধি ব্যবহার করা, ঈদগাহে এক রাস্তায় যাওয়া এবং অন্য রাস্তায় ফিরে আসা, আসা-যাওয়ার সময় তাকবির তাশরিক (আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হাম্দ) বলা, খোলা মাঠে ঈদের নামাজ আদায় করা ইত্যাদি।
কোরবানির গোশত আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী ও গরিবদের মধ্যে বিতরণ করা সুন্নত এবং অতি উত্তম আমল। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, সে প্রকৃত মুমিন নয়, যে নিজে পেটপুরে খায় কিন্তু তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে। (তিরমিজি)

@ মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী: যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি, সহকারী অধ্যাপক, আহ্ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম।
smusmangonee@gmail.com

Friday, 18 September 2015

মুসলিম শরণার্থী বিষয়ে বয়ান হোক মিনায়

হজ ও কোরবানির ত্যাগের এ সময় একসময়ের সভ্যতার লীলাভূমি ইরাক ও সিরিয়ার মুসলমানদের শরণার্থী হয়ে আপনভূমি ত্যাগ করে ইউরোপীয় দেশে চলে যাওয়ার দৃশ্য মুসলিম-অমুসলিম সারা দুনিয়াকে হতবাক করেছে। একসময় যে দেশের মানুষ লাব্বাইকা বলে কাবার পথে পাড়ি জমাত, তারা কেন আজ ইউরোপের দুয়ারে উদ্বাস্তু হল- মুসলিম দুনিয়ার কাছে এটাই আজ জিজ্ঞাসার বিষয়। আরব বিশ্ব, আরব লীগ, ওআইসি’র নীরবতা মুমিনের অন্তরকে ব্যথাতুর করে দিচ্ছে। আমরা জানি না, যে উদ্দেশ্যে রাসূল (সা.) উকুফে আরাফার প্রবর্তন করেছিলেন তার আলোকে এবারের আরাফার ময়দানে বিশ্ব মুসলিম সম্মেলনে বিষয়টি নিয়ে কোনো আলোচনা হবে কিনা! মিনার ময়দানে কোরবানির দীক্ষা নিয়ে বিপদগ্রস্ত মুসলিম শরণার্থীদের আশ্রয়দানে কোনো ধনবান মুসলিম রাষ্ট্র এগিয়ে আসবে কিনা? এ দেশের অনেক বুজুর্গই মনে করেন, মুসলমানদের ওই মহাসম্মেলনে বিষয়টি নিয়ে বক্তব্য আসা উচিত। যদি না হয় তবে সন্দেহাতীতভাবে বলা যায়, চলমান হজ, মানবতা এবং আমাদের কোরবানি ভিন্ন ধর্মাবলম্বী এমনকি অনেক মুসলমানের মনেও নানা প্রশ্নের জন্ম দেবে।

আপনজনকে কোরবানি দেয়ার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী হিসেবে হজরত ইবরাহিম (আ.) জগতের সবচেয়ে পরিচিত নবী। কোরবানি ছাড়াও তিনি মহান রবের পক্ষ থেকে আরও অন্তত ৪০টি কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হন এবং সবক’টিতেই সফলতার সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে ‘খলিলুল্লাহ’ উপাধি লাভ করেন। মুসলমান ছাড়াও অপরাপর ধর্মাবলম্বীদের কাছে তিনি জাদ্দুল আম্বিয়া বা বহু নবীর পূর্ব পুরুষ হিসেবে খ্যাত। ১০ জিলহজ পশু জবাইয়ের মাধ্যমে মুসলিম সম্প্রদায় যে কোরবানি উদযাপন করে তার সঙ্গে হজরত ইবরাহিম খলিলুল্লাহ (আ.)-এর কোরবানির একটি বিশেষ যোগসূত্র আছে। হজরত ইবরাহিম ও ইসমাইল (আ.)-এর কোরবানি জগতের কাছে স্মরণীয় করার জন্য পরবর্তী উম্মতদের কাছে কোরবানির বিধান চালু রাখা হয়েছে; যেন মানুষ নিজের পশুত্বকে কোরবানি করে মানবতাবোধে উজ্জীবিত হওয়ার প্রেরণা পেতে পারে। বিদায় হজে রাসূল (সা.) ১০০টি উট কোরবানি করেন এবং এর মাধ্যমেই ৪০০০ বছর আগের ইবরাহিম ও ইসমাইল (আ.)-এর কোরবানির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন।
পশু জবাই করার বিধানকে আজকাল অনেক মুসলমানও ‘পশুহত্যা’ এবং পশুর প্রতি চরম নিষ্ঠুরতা মনে করে। কোরআনিক নির্দেশনা সত্ত্বেও ইসলামের বিধান সম্পর্কে এ ধরনের অভিযোগ নতুন নয়। ১৩২৭ সনে শ্রাবণ মাসে প্রমথ চৌধুরী সম্পাদিত ‘সবুজপত্র’ পত্রিকায় প্রকাশিত ব্রিটিশ ম্যাজিস্ট্রেটের লেখা নিবন্ধে কোরবানির পশু জবাইকে পশুহত্যার সঙ্গে তুলনা করলে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম ‘কোরবানী’ কবিতা রচনার মাধ্যমে এর তীব্র প্রতিবাদ করেন। জনগণের খাদ্য চাহিদা মেটানোর জন্য বছরের বাকি দিনগুলোতে যে পশু জবাই করা হয় তার সংখ্যা ঈদুল আজহার চেয়ে অনেক বেশি। এসব যুক্তি উত্থাপন করে কবি নজরুল ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রশ্ন করেন, বছরের অন্যান্য দিনে পশু জবাই হয় সে ব্যাপারে কোনো নিবন্ধ লিখেছেন কিনা।
কোরবানির ঈদ আসে বছরে একবার। তাশরিকের দিনগুলোতে (১০, ১১ ও ১২ জিলহজ) হাজীরা মিনার ময়দানে কোরবানি দিয়ে থাকেন। এটি হজেরই অংশবিশেষ। হাজীদের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে একযোগে সারা মুসলিম দুনিয়ায় কোরবানির অনুষ্ঠান পালন করার অর্থ হল মুসলমানদের মধ্যে একতা ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন জাগ্রত করা। কিন্তু মুসলমানরা সে ত্যাগের স্পৃহা ও ভ্রাতৃত্বের প্লাটফর্ম আজও গড়ে তুলতে পারেনি। হজে না গিয়েও হজ কবুল হওয়ার কথা বিভিন্ন কিতাবাদিতে লেখা আছে। মানবতাবোধে উজ্জীবিত সেসব কাবার পথিকরা অপরের কল্যাণে নিজের প্রয়োজনকে কোরবান করতে পেরেছিলেন। আমরা সে ত্যাগ ও কোরবানি থেকে দূরে সরে গেছি। আমাদের হজ ও কোরবানি আজ কেবল আনুষ্ঠানিকতার গণ্ডিতে আবদ্ধ হয়ে গেছে।
একশ্রেণীর মুসলমান কোরবানির ঈদে পশু কেনা ও পশু জবাইয়ের ঝামেলা এড়িয়ে চলে, তারা বরং পরিবারসহ ভ্রমণে লিপ্ত হয়। এদের মধ্যে অনেকেই আবার সমপরিমাণ অর্থ কোরবানির পরিবর্তে গরিবদের মাঝে বিলিয়ে দিতে চায়। ব্যক্তিপর্যায়ের এসব উদ্যোগ কস্মিনকালেও ইসলামে অনুমোদনযোগ্য নয়। অবৈধ উপার্জনের নেশায় মত্ত আরেক শ্রেণীর মুসলমান নিজের স্বার্থপরতা, হিংসা-বিদ্বেষ ও পশুসুলভ বৈশিষ্ট্য ত্যাগ করতে পারে না, তারা বরং দামি ও হৃষ্টপুষ্ট পশু কেনার দৃশ্যমান প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। জবাইকৃত পশুর বড় বড় টুকরা বিজ্ঞানের বদৌলতে আর প্রতিযোগিতামূলক বাজারে ডিসকাউন্টের সুবাদে কেনা ডিপ ফ্রিজে জমানোর প্রতিযোগিতাও চলে। কোরবানিকৃত মাংস তিন ভাগ করে দুই-তৃতীয়াংশ আত্মীয়-স্বজন ও গরিব-মিসকিনদের মাঝে বিলিয়ে দেয়ার রেওয়াজ নিকট অতীতেও ছিল। আল্লাহর জিয়াফত হিসেবে খ্যাত কোরবানির ঈদে সে রেওয়াজ এখন আর চোখে পড়ে না। মঙ্গাপীড়িত, অনগ্রসর ও দরিদ্রকবলিত এলাকার মানুষ যারা ৫০০ টাকা কেজি দরে মাংস কিনে পুষ্টির জোগান দিতে পারে না, তাদের জন্য কোরবানির ঈদ এক আশার প্রতীক। কিন্তু যাদের প্রতি মহান আল্লাহ ত্যাগের (কোরবানি) নির্দেশ দিয়েছেন তাদের স্বার্থবাদিতা ও কুস্বভাবের কারণে গরিবরা চরম আশাহত হয়ে ফিরে যায়। কবি নজরুল এজন্য বলেছিলেন-
‘জীবনে যাদের হররোজ রোজা ক্ষুধায় আসে না নিদ/মুমূর্ষু সেই কৃষকের ঘরে এসেছে কি আজ ঈদ?’ হালাল অর্থে কেনা পশু কোরবানির মাধ্যমে নিজের পশুসুলভ চরিত্র ত্যাগ করে অপরের কল্যাণে উৎসর্গ করার সওগাত নিয়ে কোরবানির ঈদ বছর ঘুরে আমাদের মাঝে হাজির হয়। কিন্তু আমরা সে শিক্ষা নিতে পারি না। বরং অনেক সময় পশুর চেয়েও হীনতর কাজ করে বসি। তখন তার বাহ্যিক পশু জবাই এক ভোগ-বিলাসের উৎসব, মাংস ভক্ষণ আর লৌকিকতার অনুষ্ঠানে পরিণত হয়। কাজেই, স্বার্থত্যাগের দৃঢ়তা ও স্পৃহা যে কোরবানির মাধ্যমে অর্জিত হয় বাস্তবজীবনে তার প্রয়োগের ওপরই নির্ভর করে একজন হাজী কিংবা একজন মুমিনের পরহেজগারী ও তাকওয়া।

লেখক : মুহাম্মদ ফরহাদ হোসেন, ব্যাংকার ও প্রাবন্ধিক ।