Friday, 19 September 2014

একটি অগ্রহণযোগ্য বই -- মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন

একে খন্দকারের লেখা ‘১৯৭১ : ভেতরে বাইরে’ বইটি এইমাত্র হাতে পেলাম। গুলশান ১-এর সিগনালে একজন বই বিক্রেতা সাদা পলিথিনে মোড়া বইটি বাড়িয়ে দিলে দাম চুকিয়ে বাড়ি এসে খুলে দেখি বইটির ফটোকপি বাজারে ছাড়া হয়েছে! সুন্দর করে পলিথিনে মোড়ানো থাকায় না খোলা পর্যন্ত বিষয়টি বোঝার উপায় ছিল না। অর্থাৎ বইটি বিক্রিতে জালিয়াতি শুরু হয়েছে। যা হোক, এক দমে প্রায় অর্ধেক পড়ে মনে হল, বইটির ভেতরেও জালিয়াতি আছে। ওই পর্যন্ত পড়ে আমার মনেই হল না যে, বইটি একে খন্দকারের লেখা। প্রথম থেকেই বঙ্গবন্ধুকে আক্রমণ করে লেখা শুরু করা হয়েছে। বারবার তাকে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হয়েছে। এমনকি বাঙালিদের লুটেরা বলা হয়েছে। আমি বইটির ৩০ পৃষ্ঠার ২৫ লাইন থেকে ২৮ লাইন পর্যন্ত এখানে উদ্ধৃত করলাম : ‘অবাঙালিরা নিরাপত্তার জন্য ঢাকা ছেড়ে যখন অপেক্ষাকৃত নিরাপদ এলাকা বা পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যাচ্ছিল, তখন রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে তাদের সোনার গয়না, টাকা-পয়সা ও মূল্যবান দ্রব্যসামগ্রী লুট করে নিয়ে গিয়েছিল বাঙালিরা।’ পক্ষান্তরে ২০ পৃষ্ঠায় তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘১৮ বছর পাকিস্তান অবস্থানকালে আমি পাকিস্তানি কর্মকর্তা ও সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ভালো ব্যবহার পেয়েছি... তারা সবসময় আমার এবং আমার পরিবারের প্রতি যত্নবান ছিলেন।’ পাকিস্তানি কর্মকর্তারা বাঙালি কর্মকর্তাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করেছেন এ কথাটি যেমন তার কাছে এই প্রথম শুনলাম, তেমনি ’৭১-এর মার্চে পাকিস্তানিদের সোনার গয়না, টাকা-পয়সা বাঙালিরা লুট করেছে সে কথাও প্রথম জানলাম। এসব লুটতরাজের ক্ষেত্রে তিনি ‘বাঙালিরা’ শব্দটি ব্যবহার করায় যার-পর-নাই অবাক হয়েছি। জনাব খন্দকারকে এক্ষেত্রে একটি প্রশ্ন করব : প্যারিসের রাস্তায় চলার পথে দুর্বৃত্তরা আমাদের রাষ্ট্রদূতের গাড়ির কাচ ভেঙে তার ব্রিফকেস, মোবাইলসহ যাবতীয় সামগ্রী নিয়ে গেছে, লন্ডন থেকে আগত এক বাঙালির ব্রিফকেসভর্তি টাকা ছিনিয়ে নিয়েছে, আমার পকেট থেকে নগদ ডলার, ক্রেডিট কার্ড চুরি করেছে- তাই বলে কি আমরা বলব যে, ফরাসিরা আমাদের টাকা-পয়সা-সম্পদ লুটতরাজ করেছে? দুই-চারজন চোর-ডাকাতের জন্য কি ‘ফরাসিরা’ শব্দটি ব্যবহার করা যায় বা যেত? অথচ খন্দকার সাহেব অবলীলায় বলে দিয়েছেন, ‘লুট করে নিয়ে গিয়েছিল বাঙালিরা।’ কিছু দুষ্কৃতকারীর অপকর্মকে ‘বাঙালিরা’ বলে উল্লেখ করতেও তিনি দ্বিধা করেননি।

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, বঙ্গবন্ধুকে পদে পদে দোষারোপ করা হয়েছে। দোষারোপ করা হয়েছে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে! বারবার বলা হয়েছে, বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে গেলে বাঙালিদের এত ক্ষতি হতো না। এত প্রাণহানি ঘটত না ইত্যাদি। ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বা ঘোষণাকে খাটো করে দেখাতেও তিনি কসুর করেননি। তিনি বলেছেন, বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণেই যে মুক্তিযুদ্ধ আরম্ভ হয়েছিল, তা আমি মনে করি না। এই ভাষণের শেষ শব্দগুলো ছিল ‘জয় বাংলা জয় পাকিস্তান’। আবার পরবর্তী লাইন লিখেছেন, তিনি যুদ্ধের ডাক দিয়ে বললেন, ‘জয় পাকিস্তান’। এক্ষেত্রে তার কাছে আবারও প্রশ্ন, বঙ্গবন্ধু যুদ্ধের ডাক দিলেন একথা স্বীকার করার পরও তিনি কেন বারবার বলছেন, বঙ্গবন্ধু কোনো সিদ্ধান্ত দেননি? আসলে বঙ্গবন্ধুর সিদ্ধান্ত জানার, শোনার বা বোঝার কোনো ইচ্ছা, ধৈর্য বা শক্তি একে খন্দকারের সে সময়ও ছিল না, এখনও নেই। কারণ সে সময়ে তিনি ছিলেন পাকিস্তান এয়ারফোর্সের কর্মকর্তা এবং বর্তমানে আলঝেইমার রোগী। মাঝখানে ১৯৭১ সালে তিনি বাইচান্স পূর্ব পাকিস্তানে পোস্টিং পাওয়ায় মুক্তিযুদ্ধ শুরুর অনেক পরে মে মাসে পাক এয়ারফোর্সের চাকরি বহাল রেখে তিন মাসের ছুটি নিয়ে আগরতলায় গিয়েছিলেন। তার তিন মাসের ছুটি মঞ্জুর হওয়ায় তিনি জুলাই-আগস্ট পর্যন্ত পাক এয়ারফোর্সে চাকরিরত ছিলেন।

যাক সে কথা। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ নিয়ে যা বলছিলাম, সে কথায় ফিরে আসি। জনাব খন্দকার তার বইয়ে ‘জয় বাংলা, জয় পাকিস্তান’কে হাইলাইট না করে ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ এ দুটি বাক্যকে প্রাধান্য দিয়ে যদি একটু চিন্তাভাবনা করতেন, বাক্য দুটিকে তার মস্তিষ্কে যদি একটু ভালোভাবে জায়গা করে দিতেন, তাহলে হয়তো তার কলম দিয়ে অন্যকিছু বের হতো। জনাব তাজউদ্দীন আহমদের লেখা খসড়া ঘোষণাপত্র রেকর্ড করা না-করা নিয়ে তিনি যে মন্তব্য করেছেন সেক্ষেত্রেও একই কথা বলব। কারণ যা বলার বা ঘোষণা করার তা তিনি ৭ মার্চের ভাষণেই করে রেখেছিলেন। সেদিনের ভাষণে এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম/ আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি, তোমাদের যার যা আছে, তাই নিয়ে শত্র“র মোকাবেলা করবা ইত্যাদি কথা ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যময়। এসব না বলে সেদিন বা পরে তিনি যদি সরাসরি (নষঁহঃষু) বলতেন, আজ এই মুহূর্তে পূর্ব পাকিস্তানকে বাংলাদেশ নাম দিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা দেয়া হল, তাহলে সেটাই হতো স্থূল বুদ্ধির কাজ। এমনকি ২৫ মার্চ রাতেও যদি তিনি কোনো ঘোষণা দিতেন, তাতে করে কোটি কোটি মানুষ তার ডাকে বেরিয়ে এসে যুদ্ধ শুরু করে দিতেন এবং সেই অসম যুদ্ধে আরও কয়েক গুণ লোকের প্রাণ যেত। তাছাড়া সেক্ষেত্রে পাকবাহিনী বাঙালিদেরই আক্রমণকারী হিসেবে বিশ্বের সামনে প্রমাণ করত। বঙ্গবন্ধু নিজেকে এবং দেশের মানুষকে রাষ্ট্রদ্রোহী বা বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে প্রমাণ করার কোনো সুযোগ পাকিস্তানিদের দেননি। ভুলে গেলে চলবে না যে, ৭ মার্চ বা ২৫ মার্চ ১৯৭১ সালে এ দেশটি ছিল স্বাধীন-সার্বভৌম পাকিস্তান নামক একটি রাষ্ট্র এবং বঙ্গবন্ধু ছিলেন নির্বাচনে বিজয়ী সে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা। এই স্বল্প পরিসরে এ বিষয়ে বেশি ব্যাখ্যায় যাওয়া সম্ভব নয় বলে শুধু এটুকুই বলব যে, ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ এ কথাটিতেই স্বাধীনতা ঘোষিত হয়ে গিয়েছিল। আর তিনি যদি আরও সরাসরি কথাটি বলতেন, তা যেমন বোকামি হতো, সেই সঙ্গে দেশে বিরাট বিশৃংখল পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো এবং তাতে করে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারির দল বিভিন্ন অপকর্ম ঘটিয়ে বাঙালির ঘাড়ে দোষ চাপাত। যেমন খন্দকার সাহেব বাঙালির ঘাড়ে লুটপাটের দোষ চাপিয়েছেন!

পরিশেষে আবারও বলব, বঙ্গবন্ধুর তীক্ষ্ণ ও তীর্যক বুদ্ধির ফলেই মার্চ মাসে ৭ কোটি বাঙালি ধৈর্য সহকারে পরিস্থিতি মোকাবেলা করায় পাকিস্তানিরা আক্রমণকারী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল। সেদিন সারা পৃথিবী জেনেছিল, বাঙালিদের ওপর পাকবাহিনী নারকীয় হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে, পূর্ব পাকিস্তানে পাকবাহিনী অত্যাচার-নির্যাতন চালাচ্ছে। বাঙালি সেদিন বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিতে না পারলে বরং প্রাণহানির সংখ্যা আরও বেড়ে যেত। আগেভাগেই সহিংস সংগ্রামে নেমে পড়লে পাকিস্তানিরা যে বাঙালিদেরই আক্রমণকারী বলত, সে কথা আগেই বলা হয়েছে। আর বিষয়টি বিন্দুমাত্র প্রমাণ করতে পারলে আমেরিকার ৭ম নৌবহর ফিরে যেত না, চীনও বসে থাকত না। চীন, ইংল্যান্ড, আমেরিকা একত্রে কার্যকর বিরোধিতা বা শক্তি প্রয়োগ করলে তখন একে খন্দকারের মতো গ্র“প ক্যাপ্টেন কী করতেন সে কথাও তাকে ভেবে দেখতে বলব।

উপসংহারে বলব, জনাব খন্দকার বইটি নিজে লিখেছেন, না অন্য কাউকে দিয়ে লিখিয়েছেন সে কথাও দেশবাসীকে ভেবে দেখতে হবে। কারণ আমরা যতদূর জানি, বেশ কিছুদিন ধরেই তিনি আলঝেইমার রোগে আক্রান্ত। সেক্ষেত্রে তাকে দিয়ে

কেউ স্বার্থ হাসিল করাতেও পারেন। সেসব যাচাই-বাছাইয়ের আগে এ কথাটি বলে রাখি যে, তার লেখা বইটি ‘একটি অগ্রহণযোগ্য বই’।

#মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন : মুক্তিযোদ্ধা, কলামিস্ট

Wednesday, 17 September 2014

একটি রূপকথার গল্প এবং এ কে খন্দকারের বক্তব্যের মুল্যায়ণ

স্বাধীনতাযুদ্ধের উপপ্রধান সেনাপতি এ কে খন্দকার সম্প্রতিকালে “১৯৭১-ভিতরে বাইরে” নামে একটি বই লিখেছেন। এতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ৭ই মার্চের ভাষণ ও স্বাধীনতা ঘোষণার উপর বক্তব্য নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে তুমুল বাক্যুদ্ধ চলছে। জাতীয় সংসদে বইটি নিষিদ্ধ এবং তাঁকে রাষ্ট্রদ্রোহী ঘোষণার দাবী উঠেছে। সংসদের বাইরেও পক্ষে-বিপক্ষে বাক্যুদ্ধ চলছে। স্বাধীনতাযুদ্ধের উপপ্রধান সেনাপতিকে কেউ কেউ এখন শত্রুপক্ষের এজেন্ট ও রাজাকার বলছে। নবীন প্রজন্ম দিশাহারা। বাংলাদেশের উদ্ভুদয়ের বিষয়টি ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় দেখলে এ বিতর্কের পক্ষ-বিপক্ষের অনেক অজ্ঞতা দূর হবে।

বাংলাদেশাঞ্চলের অভ্যুদয়:
সাম্প্রদাযিক নীতিতে ১৯০৫ সালে ব্যর্থ হয়ে আঞ্চলিক নীতিতে বৃহত্তর বেঙ্গল-প্রেসিডেন্সী আবার ১৯১২ সালে বিহার-উড়িষ্যা প্রদেশ এবং বঙ্গপ্রদেশে বিভক্ত করা হয়। ১৯২৮ সালে কংগ্রেসের “ইউনিয়নরাষ্ট্র” প্রস্তাবের বিপরীতে ১৯২৯ সালে মুসলিম লীগ প্রদেশ পুনর্গঠনসহ ভারতকে “যুক্তরাষ্ট্র” গঠনের প্রস্তাব দেয়। নুতন প্রদেশসহ ১৯৩৫ সালের “ভারত সরকার আইন”-এ মুসলিম লীগের দাবী প্রাধান্য থাকায় প্রথমে বর্জন করলেও ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে কংগ্রেস অংশ নেয়। গণতন্ত্রমুখী স্থানীয় সরকারব্যবস্থা চালুর পরে ভারতে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ক্রমবর্ধমান হয়। স্থানীয় ও প্রাদেশিক সরকারব্যবস্থার গণতান্ত্রিক সংস্কারের সাথে সাথে তা বেড়ে উঠে এবং সংঘর্ষিক ও দাঙ্গায় রূপ নেয়। ১৯৩৫ সালের ভারত সরকার আইন এবং ১৯৩৭ সালের নির্বাচনের তা দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে।

মুলসমান জনগোষ্ঠী সংখ্যালঘিষ্ঠ এবং সম্প্রদায়িক দাঙ্গা ক্রমবর্ধমান হওয়ায় মুসলিম লীগ ১৯৪০ সালের লাহোর অধিবেসনে পূর্ব-পশ্চিমের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান অধ্যুাষিত অঞ্চলগুলো নিয়ে পৃথক যুক্তরাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব গ্রহণ করে। লাহোর প্রস্তাব আন্দোলন ও ১৯৪৬ সালের নির্বাচনের গণম্যান্ডেটের ভিত্তিতে বৃটিশ-ভারত বিভক্ত হয়। প্রথমে হিন্দু মহাসভা এবং পরে কংগ্রেসের দাবীতে ১৯৪৭-এ বঙ্গপ্রদেশ বিভক্ত এবং পশ্চিমাংশ ভারতে ও পূর্বাংশ পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত হয়। নির্বাচনোত্তর মুসলিম লীগের দিল্লী অধিবেসনে (১৯৪৬) সোহরওয়ার্দীর প্রস্তাবের ভিত্তিতে ১৯৪৭-এ পাকিস্তান ইউনিয়নরাষ্ট্র হিসেবে গড়ে উঠে। দিল্লী প্রস্তাবের ভিত্তিতে সোহরওয়ার্দীর ১৯৪৯ সালে পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন করেন।

তরুণ বয়সে মৌলানা ভাসানী বিপ্লবী (সন্ত্রাসবাদী) স্বরাজ রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন। সন্ত্রাসমুখী রাজনীতি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্যে ১৯০৫ সালে বৃহত্তর বেঙ্গল-প্রেসিডেন্সী প্রদেশকে বিভক্ত করা হয়। সরকারের রোষানল থেকে রক্ষার জন্যে তিনি দেওবন্দ মাদ্রাসায় ভর্তি হন। মৌলানা ভাসানী দেওবন্দ মাদ্রাসায় ও মোহাম্মদ ইসমাইল হোসেন (আমার দাদা) প্রেসিডেন্সী কলেজে বিএ পড়াকালে ১৯০৭ সালে সাঁড়াঘাটে পরিচয় এবং উভয়ই পাবনার হওয়ায় বন্ধুত্ব। দিল্লী যাতায়াতে মৌলানা ভাসানী কোলকাতায় ইসমাইল হোসেনের হোষ্টেলে আথিথেয়তা নিতেন। ইসমাইল হোসেন ১৯০৬ সালেই এফএ পড়াকালে মুসলিম লীগের ছাত্রসদস্য।

মাদ্রাসায় পড়া ও টুপিপরা যুবনেতা মৌলানা ভাসানী অনুশীলন, যুগান্তর, স্বরাজ, কংগ্রেস, ইত্যাদি দল করলেও মুসলিম লীগে যুক্ত হননি। বগুড়ায় বিয়ে করার পরে ইসমাইল হোসেনের (বগুড়ায় কর্মরত) যুক্তি-ব্যাখ্যা-তাগিদে অবশেষে তিনি ১৯৩০ সালে মুসলিম লীগে যোগদেন। পরবর্তীতে ১৯৩৭ ও ১৯৪৬ সালে সংসদ সদস্য এবং আসাম মুসলিম লীগের সভাপতি হন। লাহোর প্রস্তাব উত্তর মোহাম্মদ ইসরাইল হোসেন (আমার আব্বা) মৌলানা ভাসানীকে এবং পাবনার মুসলিম লীগের সহকর্মী ছাত্র-যুব নেতাদের (মোকসেদ মন্ডল, মনসুর আলী, আমজাদ হোসেন, মোতাহার হোসেন তালুকদার, প্রমুখ) বোঝাতে সক্ষম হন যে, লাহোর প্রস্তাব ধরে রাখলেই ভবিষ্যতে পৃথক বাংলাদেশ রাষ্ট্র হবে। ১৯৩৩ সালে চৌধুরী রহমত আলীর এমন ভবিষ্যতব্য ছিল।

পরবর্তীতে ক্যাপ্টেন খেতাবপ্রাপ্ত যুবনেতা মোকসেদ (গেঁদা) মন্ডল (ইসরাইল হোসেনের মামা) ও যুবনেতা মনসুর আলী যথাক্রমে তখন ইশ্বরদী ও কাজিপুর থানার মুসলিম লীগের সেচ্ছাসেবক গার্ড রেজিমেন্টের কমান্ডার। আমজাদ হোসেন, মোতাহার তালুকদার, প্রমুখ (পরবর্তীতে পাকিস্তানের জাতীয় সংসদ সদস্য) তাঁর স্কুল-কলেজের সহপাঠী। মেধাবী ইসরাইল হোসেন প্রথমে প্রেসিডেন্সী ও পরে এডওয়ার্ড কলেজে পড়েছেন। তিনি স্বল্পকালীন পাবনা থানার মুসলিম লীগের ছাত্রনেতা ও গার্ড রেজিমেন্টের উপ-কমান্ডার ছিলেন। ইসলামিয়া কলেছে একইবর্ষে সহপাঠী ও ছাত্রনেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবও তখন তাঁর ব্যাখ্যায় বিশ্বাসী হন। এজন্যে বঙ্গবন্ধু ১৯৪৭ উত্তর সোহরওয়ার্দীকে ছেড়ে মৌলানা ভাসানী সাথে আসেন। ১৯৪৪-এর পরে ইসরাইল হোসেন ব্যক্তিগত কারণে রাজনীতি থেকে দূরে সরে যান।

১৯১২ সালে বেঙ্গল-প্রেসিডেন্সী প্রদেশ বিভক্তি, ১৯২৯ সালে মুসলিম লীগের ভারত যুক্তরাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব, ১৯৩৫ সালের ভারত সরকার আইন এবং লাহোর প্রস্তাব ভিত্তিক জাতীয়তাবাদী ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৪৭-এ বাংলাদেশাঞ্চলের ঊদ্ভুদয় হয়। ১৯৪৭-এ ঐতিহাসিক বিজয়গুলো হলোঃ ১) বৃটিশ ঔপনিবেসিক শাসনের অবসান, ২) সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রনীতি অবসান; ৩) ক্রমবর্দ্ধমান সংঘর্ষিক সাম্প্রদায়িক রাজনীতির অবসান; ৪) সামন্তব্যবস্থার অবসান ও প্রজাজীবনের মুক্তি; ৫) গণতান্ত্রিক ভূমিসংস্কার ও গণতান্ত্রিক জীবনধারা পুনঃপ্রতিষ্ঠা; এবং ৬) স্বকীয় জাতিসত্ত্বাসহ স্বাধীন বাংলাদেশের উদ্ভুদয়ের ভিত্তি।

বাংলাদেশাঞ্চলের জনগণ বৃটিশামলে সাত প্রজন্মকাল ঔপনিবেসিক, সাম্প্রদায়িক ও সামন্তিক রাষ্ট্রনীতিতে শাসিত-শোষিত-নিষ্পেষিত প্রজাজীবন এবং প্রধানতঃ নিন্ম ও নিন্মমধ্যবিত্ত জীবনধারায় আবদ্ধ ছিল। দুই-তৃতীয়াংশ বাঙালী মৃসলমান জনতার জমিদারীত্বে ৭.০% এবং সরকারী কর্মে, ব্যবসায় ও নগরসভ্যতায় ১০.০% অংশীদারীত্বও ছিল না। ১৯৪৭-এর পরে বাংলাদেশাঞ্চলের জনগনের প্রজামুক্তিসহ উত্থান শুরু হয়। তাই বাংলাদেশাঞ্চলের মানুষ ১৯৪৭কে মুক্তি হিসেবেই দেখেছে। ১৯৪৭ উত্তর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে বঙ্গবন্ধুও স্মৃতিচারণ করেছেন, ‘যে পাকিস্তানের স্বপ্ন দেখেছিলাম, সেই পাকিস্তানই করতে হবে, মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম’।

শেখ হাসিনার মতো বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রপতি/প্রধানমন্ত্রীর সন্তান ছিলেন না। বঙ্গবন্ধু তৃতীয়শ্রেণীর কর্মচারীর সন্তান ও প্রজা হিসেবেই বড় হয়েছেন। বঙ্গবন্ধু সকলগুণে গুণান্বিত ব্যক্তিও ছিলেন না। বিএতে তৃতীয়শ্রেণী থাকলে বিশ্ববিদদ্যালয়ের শিক্ষক, বিসিএস কর্মকর্তা, বিচারক বা সেনা কর্মকর্তা হওয়া যায় না। কর্মজীবি হলে বঙ্গবন্ধুর জীবন শুরু হতো তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচানী হিসেবে। নিজের ও জাতির সেবার বহু পথের মধ্যে রাজনীতিই ছিল বঙ্গবন্ধুর জন্যে উত্তম। এ কে খন্দকারের একাডেমিক মেধা বঙ্গবন্ধুর চেয়ে উপরে ছিল এবং পারিবারিক পরিচয়ও নিচে ছিল না। নিজের ও জাতির সেবায় তিনি বিমানবাহিনীর প্রথমশ্রেণীর কর্মকর্তার পদে যোগদেন।

বাংলাদেশের উদ্ভুদয়ঃ
লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে ১৯৪৯ সালে জনবন্ধু ভাসানীর আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন করেন। মাঠে-মঞ্চে খামোশ বলে হুঙ্কার দিলেও হক-সোহরওয়ার্দীর কাছে জনবন্ধু ভাসানী দুর্বল ছিলেন। রাজনীতির অঙ্গনে বঙ্গবন্ধু তখন শতব্যক্তির একজনও নন। তাই যুক্তফ্রন্টের ২১ দফায় আওয়ামী লীগের লাহোর প্রস্তাব ছিল ১৯ নম্বর ক্রমিকে। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের পরে জনবন্ধু ভাসানী প্রাদেশিক সরকারে ক্ষমতাসীন দলীয়জোটের অন্যতম শীর্ষ নেতা। ঘেড়াও-হরতাল-মিছিল ছাড়া সংসদ/সরকার রাজনীতির ধারা উনার প্রকৃতি বিরোধী। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্যে ২১ দফা ও গণম্যান্ডেটের পরিপন্থীতে দিল্লী প্রস্তাব ও পূর্ব-পশ্চিমের সংখ্যাসাম্য প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে ১৯৫৬ সালের সংবিধানে সম্মত হওয়ায় হক-সোহরওয়ার্দীর উপর তিনি ক্ষুব্ধ। অন্যদিকে ১৯৫৬ সালের সংবিধান চালুর পরে লাহোর প্রস্তাব বাদ দিয়ে সোহরওয়ার্দীর সাথে বঙ্গবন্ধুও ক্ষমতার রাজনীতিতে যোগ দেন।

স্বায়ত্বশাসন আন্দোলনের জন্যে সমমনা বিপ্লবীদের (সন্ত্রাসবাদী/মার্ক্সবাদী) নিয়ে জনবন্ধু ভাসানী ১৯৫৭ সালে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গঠন করেন। একাধিকবার সরকার গঠন-পতন ঘটিয়ে ১৯৫৮ সালে সামরিক আইন জারী ও সংবিধান বাতিল করিয়ে জনবন্ধু ভাসানী হক-সোহরওয়ার্দীর বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিলেন। অতঃপর স্বায়ত্বশাসন আন্দোলন শুরু করেন। দিল্লী প্রস্তাব ভিত্তিক রাষ্ট্রগঠন এবং পূর্ব-পশ্চিমের সংখ্যাসাম্য প্রতিনিধিত্বের অব্যহত রাখায় প্রেসিডেন্ট আউয়ুব খানও রাজনৈতিক সমাধানে ব্যর্থ হন। তবে তাঁর সুশাসন ও উন্নয়নের কাছে ১৯৬৪ পর্যন্ত পূর্ব-পশ্চিমের পেশাদার রাজনৈতিক নেতারা সবাই ধরাশায়ী। ইতোমধ্যে হক সাহেব ও সোহরওয়ার্দীর মৃত্যু হয়।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পরে ১৯৬৫ সালে জনবন্ধু ভাসানী ও বঙ্গবন্ধু কিছুটা নিরাশ হয়ে উঠেন। এ অবস্থায় ইসরাইল হোসেন প্রথমে জনবন্ধু ভাসানীকে এবং অতঃপর বঙ্গবন্ধুকে লাহোর প্রস্তাব ভিত্তিক রাষ্ট্রগঠনের আন্দোলনে আবার সম্মত করান। ১৯৪৭ উত্তর ভারতের অভিজ্ঞতায় বোঝাতে সক্ষম হন যে, ইউনিয়ররাষ্ট্র ব্যবস্থায় এক-তৃতীয়াংশ এবং যুক্তরাষ্ট্র ব্যবস্থায় তিন-চতুর্থাংশ প্রাদেশিক স্বায়ত্বশাসন। ইউনিয়ররাষ্ট্র ব্যবস্থায় যেখানে রাজধানী, সে প্রদেশ সার্বভৌম। ৪টি প্রদেশ ও সেনাবাহিনীর জন্যে পশ্চিমাঞ্চল থেকে রাজধানী সড়ানো সম্ভব না। যুক্তরাষ্ট্র ব্যবস্থা ছাড়া হাজার মাইল ব্যবধানে দুই অঞ্চল নিয়ে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সমস্যার সমাধানের সুযোগ নেই। এতে পৃথক রাষ্ট্র গঠনে একধাপ অগ্রগতি হবে। আর তেমন গণজাগরণ হলে পশ্চিমারা সম্মত না হলেই পৃথক রাষ্ট্র।

জনবন্ধু ভাসানী ও বঙ্গবন্ধুর ঐক্যমত্যে ইসরাইল হোসেন কর্তৃক মুসলিম লীগের ১৪ দফা ও লাহোর প্রস্তাবের সমন্বয়ে ৬ দফার ১ম দফার ১ম লাইন ---” লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পাকিস্তান হইবে একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা” প্রণীত। ইসরাইল হোসেনের যুক্তি ছিল যে, এরই ভিত্তিতে পাকিস্তান হওয়ায় এ দফা ভিত্তিক আন্দোলনে কোন রাষ্ট্রদ্রোহী মামলা হওয়ার সুযোগ থাকবে না। অন্যদফাগুলো অন্যদের সাথে আলোচনা করে বঙ্গবন্ধু চুড়ান্ত করেন। জ্যেষ্ঠতর দলীয় নেতারা অখন্ড পাকিস্তানের পক্ষে হওয়ায় এজন্যে বঙ্গবন্ধু দলীয় অনুমোদন ছাড়া ৬ দফা উপস্থাপন করেন। প্রথম থেকেই জনবন্ধু ভাসানী ৬ দফাকে সমর্থন দেন। আমার এ কথা ছাত্র-যুব-আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের বিশ্বাস করা কঠিন হবে। আওয়ামী লীগের পূনর্জাগরণের ১৯৮৮ সালের ৭ দফার নেপথ্যের ব্যক্তিটিও আমি ছিলাম, তা তাদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হবে না। কিন্তু আওয়ামী লীগ নেতা সন্মানীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিস্মৃত হওয়ার কথা নয়।

জাতির দামাল ছেলে বঙ্গবন্ধু একাডেমিক মেধায় তৃতীয়শ্রেণীর হলেও ভাষায় সম্মোহনী ক্ষমতা ছিল। এজন্যে ভাসানীর ঘেড়াও-হরতালের বদলে বঙ্গবন্ধু গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পথ বেছে নেন। রাষ্ট্রদ্রোহী মামলা হওয়ার সুযোগ না থাকায় ভিন্নভাবে বঙ্গবন্ধুকে মামলা ও কারাবন্ধি করে ৬ দফা আন্দোলনকে দমনের চেষ্টা করা হয়। কারাবন্ধি থাকায় বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতাযুদ্ধে প্রত্যক্ষ ভুমিকা রাখতে পারেন নি। প্রত্যক্ষ ভুমিকা রেখেছেন, ভাসানী-জিয়া, নজরুল-তাজউদ্দিন, ওসমানী-খন্দকার, সিরাজ-মনি, রব-সিদ্দিকী, প্রমুখরা। ৬ দফা আন্দোলনে বহু ছাত্র-যুবসহ স্থানীয়-জাতীয় নেতারাও যুক্ত ছিলেন। আন্দোলনের সফল নের্তৃত্ব দিলেও জিন্না যেমন লাহোর প্রস্তাবের রূপকার ও পাকিস্তানের স্বপ্নদষ্টা ছিলেন না। তেমনি আন্দোলনের সফল নের্তৃত্ব দিলেও বঙ্গবন্ধু ৬ দফা মূলরূপকার ও বাংলাদেশের স্বপ্নদষ্টা ছিলেন না।

তবে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ ছিল বিশ্বের সেরা জাতীয়তাবাদী, স্বাধীনতা আন্দোলনের পাথেয় এবং স্বাধীনতাযুদ্ধকালে প্রতিদিনের অনুপ্রেরণা। অস্থায়ী মুজিবনগর নামটিও হয়ে উঠেছিল স্বাধীনতা প্রতীক। ৬ দফা আন্দোলনের সফল নের্তৃত্ব ও ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের জন্যে জনগণ বঙ্গবন্ধুকে বাংলাদেশের স্বাধীনতায় “জাতির প্রধাননেতা” বা “জাতির পিতা” হিসাবে সন্মান করে। ১৯৭১ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির প্রথম পর্ব যা পরম বিজয়ের। তবে ১৯৭১ উত্তর বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির দ্বিতীয় পর্ব যা পরম পরাজয়ের।

৬ দফা রাষ্ট্রদর্শন বঙ্গবন্ধুর চেতনাপ্রসূত নয়। এজন্যে ৬ দফা, গণম্যান্ডেট ও স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের পরিপন্থীতে ১৯৭২-এ সংবিধানের মুখবন্ধে বঙ্গবন্ধু লিখলেন, সমাজতন্ত্রবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের জন্যে জাতি স্বাধীনতাযুদ্ধ করেছে। ১৯৭১-এ বঙ্গবন্ধু শপথ নিয়েছিলেন, ‘৬ দফা নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের সম্পত্তিতে রূপান্তরিত হলো। এই ৬ দফার সঙ্গে কেউ যদি বেঈমানী করে, তাকে জ্যান্ত কবর দেওয়া হবে। আমি যদি করি, আমাকেও (তোফায়েল আহম্মেদ, বাংলাদেশ প্রতিদিন, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৪)এ। স্বাধীনতাযুদ্ধের রাষ্ট্রদর্শন নিয়ে শুরুতেই সাংবিধানিক মিথ্যাচার করা হয়েছে এবং ১৯৭৫-এ ৪র্থ সংশোধনী, সমাজতন্ত্রবাদ, একদল ও স্বৈরতন্ত্র।

১৯৭১ উত্তর রাষ্ট্র-পরিচালনার ব্যর্থতার দায় বঙ্গবন্ধুর কোনভাবেই এড়ানো সম্ভব নয়। ১৯৭২-৭৫ কালে সরকারী-বেসরকারী বাহিনীর হাতে সাড়ে তিন বছরে সরকারী-বেসরকারী দরের প্রায় ত্রিশহাজার অর্থ্যাৎ বছরে সাড়ে আট হাজার জন বিচার-বহিঃভুত হত্যা হয়। প্রেসিডেন্ট আউয়ুব খানের শাসনামলে বছরে গড়ে পঁচাশি জন অর্থ্যাৎ শতভাগের একভাগও বিচার-বহিঃভুত হত্যা হয়নি। তারপরেও প্রেসিডেন্ট আউয়ুব খানকে স্বৈরাচার আখ্যা করেই বঙ্গবন্ধুর নের্তৃত্বে আমরা গনতান্ত্রিক আন্দোলন করেছি। সেই গনতান্ত্রিক আন্দোলনের মহানেতা বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতোত্তর হত্যার রাজনীতিসহ একের পর এক জনগণের অধিকার হরণ করেন।

রাষ্ট্রকাঠামো ও আইনের অধীনে হওয়ায় সামরিক ও বেসামরিক সংস্থাসমূহ কম-বেশী জাতীয়তাবাদী। ১৯৩৭ সালে আগে যাদের জন্ম, তাদের মন-মানসিকতা বৃটিশ-ভারত রাষ্ট্রকাঠামো ও লাহোর প্রস্তাব আন্দোলনে গড়ে উঠে। ১৯৩৭ সালের পরে যাদের জন্ম, তাদের মন-মানসিকতা পাকিস্তান রাষ্ট্রকাঠামো ও ৬ দফা আন্দোলনে গড়ে উঠে। ৭ই মার্চের ভাষণের পরে সামরিক-বেসামরিক সংস্থাসমূহের মধ্যেও স্বাধীনতার চেতনা জেগে উঠে এবং ক্রান্তিকালে স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশ নিয়ে তাঁরা জাতীয় দায়িত্ব পালন করে।

স্বাধীনতাযুদ্ধের রাষ্ট্রদর্শন নিয়ে সাংবিধানিক মিথ্যাচার, হত্যার রাজনীতি, স্বেচ্চাচারিতা, হটকারিতা ও রাষ্ট্র-পরিচালনায় চরম ব্যর্থতার জন্যে বঙ্গবন্ধুর প্রতি জাতির শ্রদ্ধা-ভালবাসা হ্রাস পেতে থাকে। রব-ইনু, মতিয়া-সেলিম, প্রমুখদের সমকালের মন্তব্যগুলো তারই প্রতিধ্বনি। ৪র্থ সংশোধনী, অনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি, সমাজতন্ত্রবাদ, একদল, স্বৈরতন্ত্র, মৌলিক অধিকার হরণ, হত্যার রাজনীতি, ইত্যাদির জন্যে বঙ্গবন্ধুর প্রতি নির্দলীয় ও অন্যদলীয় জনগণের শ্রদ্ধা-ভালবাসা শুণ্যে নেমে যায়। জীবন বাজি রেখে যারা যুদ্ধে যোগদেন, তাদের মধ্যে ঋণত্বক হয়ে পড়ে। এর ফলসূতিতে অনাকাংখিত ও বর্বর ১৫ই আগষ্ঠ। বঙ্গবন্ধুর লাসের দাফন নিয়ে কর্ণেল তাহেরের এবং মুজিব সরকারের অপসারণে স্পীকার মালেক উকিলের মন্তব্যেও তার প্রতিফলন আছে।

সম্মৃদ্ধিশীল গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের উদ্ভুদয়ঃ
৪র্থ সংশোধনী ও অনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হওয়ার পরে ১৫ই আগষ্ঠ অপ্রত্যাসিত ছিল না। তবে সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার বর্বরতায় ১৫ই আগষ্ঠ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মধ্যে আর সীমিত ছিল না। স্বাধীনতোত্তর অবনতিশীল পরিস্থিতিসহ ১৫ই আগষ্ঠ, ৩রা নভেম্বর ও ৭ই নভেম্বর আমার কাছে কেবল ক্ষমতার পালাবদল বলে মনে হয়নি। ইসরাইল হোসেনকে ১৯৭৩ সালে ক্যাপ্টেন মনসুর আলী এককপি সংবিধান দিয়েছিলেন। উভয়ের মধ্যে সংবিধান ও কিছু প্রসঙ্গে কথপোকথনে কিছুসুত্র আমার স্মরণে ছিল। রাষ্ট্রব্যবস্থার বিশ্বসমীক্ষা থেকে বুঝলাম, স্বৈরমুখী রাষ্ট্র-অবকাঠামো. স্বৈরমুখী প্রতিরক্ষা কাঠামো. ১৯৭২ সালের স্বৈরমুখী সংবিধানিক সরকারব্যবস্থা এবং সংসদে ৯৭% অংশীদারীত্বের জন্যে স্বাধীনতোত্তর বাংলাদেশ উত্তরাত্তর স্বৈরমুখী হতে থাকে। রাষ্ট্র-অবকাঠমো, প্রতিরক্ষা কাঠামো ও সরকারব্যবস্থা গণতন্ত্রমুখী পুনর্গঠন ছাড়া স্বৈরমুখী রাষ্ট্রব্যবস্থা থেকে মুক্তির পথ ছিল না।

আমি সরকার নই। কম-বেশী স্বার্থরক্ষা না হলে সরকার আমার প্রস্তাব বাস্তবায়ন করবে না। তাই ১৯৮২ থেকে সরকারের প্রয়োজনে বা সংকটকালে গণতান্ত্রিক পূনর্গঠনের উদ্যোগগুলো নিই। বাংলাদেশ ৯টি বিভাগে বিভক্ত হলে রাষ্ট্র-অবকাঠমো এবং ৯টি আঞ্চলিক ক্যান্টমেন্ট ভিত্তিক হলে প্রতিরক্ষা কাঠামো সুষম-গণতন্ত্রমুখী হবে। অন্যদিকে দুইকক্ষ সংসদব্যবস্থা চালু হলে স্বৈরমুখী সংবিধানিক সরকারব্যবস্থা গণতান্ত্রিক হবে (আহসান-উল-করিম, প্রগাতশীল গণতন্ত্র, ১৯৯১)এ। ১৯৮২ থেকে উপজেলা-জেলা-বিভাগ পুনর্গঠনের ধারাবাহিকতায় ময়মনসিংহ ও কুমিল্লা বিভাগ গঠিত তথা বাংলাদেশ ৯টি বিভাগে বিভক্ত হলে বাজারকাঠামো সুষম প্রতিযোগীমুখী হওয়ায় সুষম আয়বন্টনসহ ৫ বছরেই জিডিপি গড় প্রবৃদ্ধির হার ৯% এর উর্দ্ধে উন্নীত হবে। অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধম্যে তা ১২%-এর উর্দ্ধে উন্নীত করা সম্ভব হবে।

সেনাবাহিনীর বিক্ষুব্ধ ও বিদ্রোহী অংশ ১৯৭৫-এ সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে। ১৯৮০ পর্যন্ত শেখ হাসিনা দেশে ফিরতে পারেননি। ১৯৮৮-এ শেখ হাসিনাকে প্রকাশ্যে গুলি করে। ১৯৯৬-এ শেখ হাসিনা নির্বিঘেœ ভোটে ক্ষমতাসীন হন। সেনাবাহিনী এখন শেখ হাসিনাকে সেলুট দেয়। সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারও হয়েছে। আওয়ামী লীগের ভোটে ক্ষমতাসীন হতে এখন আর বাধা নেই। এটা যেমন তোফায়েল আহম্মেদ, মোহাম্মদ নাসিম বা শেখ সেলিমের অবদান নয়। তেমনি ২০০১ উত্তর দুঃশাসন পরিস্থিতিতে রপ্তানী, রিমিটেন্স ও সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধিসহ জিডিপি গড় প্রবৃদ্ধির হার ৬.৫% এর উর্দ্ধে উন্নীত ও দারিদ্রতা ক্রমঃমোচন শেখ হাসিনার দৈব্য অবদান নয়।

১৯৮৮ পর্যন্ত ৪/৫টি আঞ্চলিক ক্যন্টিমেন্ট ভিত্তিক থাকায় প্রতিরক্ষা কাঠামো স্বৈরমুখী ছিল। ৮টি আঞ্চলিক ক্যন্টিমেন্ট ভিত্তিক গণতন্ত্রমুখী প্রতিরক্ষা কাঠামো হওয়ায় গণক্ষোভ ছাড়া সহজে ক্ষমতা দখল সম্ভব নয়। যথাসময়ে আপীল বিভাগ দু’পদক্ষেপে পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়ায় সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারও সম্ভব হয়। জিডিপি গড় প্রবৃদ্ধির হার ৬.৫% এর উর্দ্ধে উন্নীত ও দারিদ্রতা ক্রমঃমোচন হওয়ায় অর্থনেতিক পরিন্থিতি বাংলাদেশ ১৯৮২-এর পূর্বাস্থায় নেই। তাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখন আর কাউকে পরওয়া করেন না। কিন্তু বাংলাদেশ ৯টি বিভাগে বিভক্ত ও দুইকক্ষ সংসদব্যবস্থা চালু ছাড়া গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা অসম্পূর্ণ এবং দূনীতি ও সন্ত্রাস ক্রমঃবর্দ্ধমান। রাজনৈতিক বিপর্যয়ও আশংকামুক্ত নয়। জ্ঞাত থেকেও সরকার হয়ে পদক্ষেপগুলো না নিয়ে নিজেকে বার বার গণতন্ত্র ও জননিরপত্তায় বিশ্বাসী বলা এবং গুম-হত্যার রাজনীতি অব্যহত রাখা জনপ্রতারণার সামিল। এর পরিণাম গণদ্রোহ ও গণ-অভুত্থান।

এ কে খন্দকারের মন্তব্যগুলোর মূল্যায়ণঃ
স্বাধীনতা ও সম্মৃদ্ধিশীল গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের উদ্ভুদয়ে ইতিকথা ও রূপকথার গল্পগুলো বলার উদ্দেশ্য হলো, কবিতার বদলে ঐতিহাসিক বাস্তবতার ভিত্তিতে এ কে খন্দকারের মন্তব্যগুলো মূল্যায়ণ করা। তিনি ৬ দফা আন্দেলনের চেতনাধারী। ১৯৭০-এর গণম্যান্ডেট ও ৭ই মার্চের ভাষণের পরে জীবন বাজী রেখে পাকিস্তান পক্ষ ত্যাগ করেন এবং স্বাধীনতাযুদ্ধের উপপ্রধান সেনাপতির দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতাযুদ্ধের রাষ্ট্রদর্শন নিয়ে সাংবিধানিক মিথ্যাচার, হত্যার রাজনীতি, স্বেচ্চাচারিতা, ৪র্থ সংশোধনী, ইত্যাদির জন্যে বঙ্গবন্ধুর প্রতি তাঁরও শ্রদ্ধা-ভালবাসা হ্রাস পায়। এজন্যে ৪৩ বছর পরেও ১৯৭১-এ বঙ্গবন্ধুর কতিপয় বিষয় নিয়ে প্রশ্নগুলো তোলা এবং নিজের অভিজ্ঞতায় উত্তরগুলো দেওয়া।

এ কে খন্দকারের যে মন্তব্যগুলো নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে, তাঁর প্রধানগুলো হলো-এক, ২৬শে মার্চে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার সত্যতা; দুই, ৭ই মার্চের ভাষণ “জয়বাংলা, জয় পাকিস্তান” বলে শেষ করা; তিন, স্বাধীনতা ঘোষণার স্বপক্ষে প্রযোজনীয় প্রস্তুতি না থাকা; এবং চার, ৭ই মার্চে ঘোষণা করা হলে সহজ ও কম রক্তে স্বাধীনতা অর্জন হতো। অন্যে কথা ও কর্ম আমরা নিজের মন ও প্রজ্ঞা দিয়ে মূল্যায়ন করি। সেজন্যে এ কে খন্দকারের মন্তব্যগুলো ইতিহাসের বাস্তবতায় মুল্যায়ণ করা সবচেয়ে সমীচীন ও গ্রহণযোগ্য হবে।

২৮শে ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত জাতির মানসিক প্রস্তুতি ছিল তিন-চতুর্থাংশ স্বাধীনতা ভিত্তিক ফেডারেল পাকিস্তান। ১লা মার্চে জাতীয় সংসদ অধিবেসন স্থগিতের পরে ছাত্র-যুব নেতারা বঙ্গবন্ধুর কাছে স্বাধীনতা ঘোষণার জন্যে আবেদন করেন। উনি তাদের বলেছেন, ‘পাকিস্তানও হয়েছে জাতির আকাংখা, আন্দোলন, বহুত্যাগ ও সমর্থনে। হঠাৎ স্বাধীনতা ঘোষণা দেওয়া হলে মধ্যবয়সী ও প্রবীনেরা সমর্থন নাও করতে পারে। তখন আমও যাবে, ছালাও যাবে। আগে সর্বস্তরে স্বাধীনতার মন জাগাতে হবে। আন্তর্জাতিক সমর্থনের প্রেক্ষাপট তৈরী করতে হবে।’ ৭ই মার্চের ভাষণের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু সেটাই করেছেন। ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় ৬ দফা আন্দোলনে ফেডারেল পাকিস্তান অথবা স্বাধীন বাংলাদেশ হবে, তা জনবন্ধু ভাসানী, বঙ্গবন্ধু ও ইসরাইল হোসেন জানতেন। যেটা ‘৬ দফা না মানলে ১ দফা’ কথামালা হিসেবে প্রচারিত ছিল।

সিরাজুল আলম খানের নের্তৃত্বাধীন নিউক্লিয়ার্সের ২রা মার্চে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় ছাত্র-যুব নেতাদের পতাকা উত্তোলন (পাবনায় বিকাল ৪-০০ টায়) এবং ৭ই মার্চের ভাষণের পরে বাকী এক-চতুর্থাংশ স্বাধীনতার মানষিক প্রস্তুতি ক্রমশঃ সম্পন্ন হয়। পূর্বে বিছিন্নভাবে হলেও এজন্যে ২৫শে মার্চের মধ্যরাতে বর্বর আঘাত এলে সেনা-বিডিআর-পুলিশ-আনসার-জনতা সবাই যার যার অবস্থান থেকে স্ব-উদ্যোগে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ৬ দফা হলো প্রথমে ফেডারেল পাকিস্তান, অতঃপর বা নাহলে স্বাধীন বাংলাদেশ হওয়ার আন্দোলন। আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রবাদী দল, কোন সন্ত্রাসবাদী দল ছিল না। গণজাগরণ ছাড়া গণতান্ত্রিক ও প্রচলিত প্রথায় এর চেয়ে বেশী প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ ছিল না। ৭ই মার্চের ভাষণের স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়া হলে, সেনাসহ জনগণ ভাগাভাগি হয়ে পড়তো। আন্তর্জাতিক সমর্থন পাওয়া কঠিন হতো। স্বাধীনতাযুদ্ধ নয় মাস কেন, নয় বছরেও শেষ হতো না। আর দশগুন বেশী মানুষ মারা যেতো।

“জয় পাকিস্তান” বলে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শেষ করা এ কে খন্দকারের মন্তব্যে নিয়ে বিতর্ক বেশী। এমন কথা অনেকে আগেও লিখেছেন। আমি পরের দিন রেডিওতে শুনেছি। বিষয়টি এখন খেয়াল করতে পারি না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ও বুয়েটে অধ্যায়নরত ও ছাত্রলীগভুক্ত আমার দু’ভাই (ডঃ মোহাম্মদ রেজওয়ানুল করিম ও ডঃ মোহাম্মদ আনোয়ারুল করিম) সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তাঁরাও কখনো এ নিয়ে আলোচনা করেননি। ৩রা জানুয়ারীতে ৬ দফার শপথ অনুষ্ঠানেও বঙ্গবন্ধু “জয় বাংলা, জয় পাকিস্তান” বলেছেন। ৭ই মার্চের ভাষণ স্বাধীনতার ঘোষণা নয়, পরবর্তী আন্দোলনের পাথেয়। আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণার তারিখ ২৬শে মার্চ। গণতান্ত্রিক আন্দোলনের কৌশলগত কারণে বঙ্গবন্ধু যদি “জয় বাংলা, জয় পাকিস্তান” বলে শেষ করা হলে তা প্রজ্ঞাসম্মত। এতে নের্তৃত্ব ও নেতার বিজয়ের ইতিহাস কলঙ্কিত হয় না। এ নিয়ে ইপপ্রধান সেনাপতির মন্তব্যে বিপরীতে বিরূপ মন্তব্য করা ববং স্বাধীনতাযুদ্ধেকে কলঙ্কিত করা হয়।

গণতান্ত্রিক পথে স্বাধীনতা অর্জনের পদ্ধতি ও ২৫শে মার্চে বঙ্গবন্ধুর নিজগৃহে অবস্থানের বিষয়টি অনেকেই অনুধাবন করতে পারেন না। এজন্যে স্বাধীনতা ঘোষণা বা পথ নিয়ে তাজউদ্দিন আহমেদসহ অনেকেরই সংশয় ছিল বা আছে। জ্ঞাত থাকায় জনবন্ধু ভাসানীর সংশয় ও প্রশ্ন ছিল না। স্বাধীনবাংলার প্রধানমন্ত্রীর সংশয়ের জন্যে এ কে খন্দকারের সংশয় জাগে। স্বাধীনত্তোর ৬ দফা, গণম্যান্ডেট ও স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের পরিপন্থীতে সংবিধানের মুখবন্ধে মিথ্যাচারের জন্যে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে তাঁর সংশয় বাড়ে। বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত সহকারী ব্যারিষ্টার আমিরুল ইসলাম স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটির খসড়া করেন এবং শীর্ষ নেতাদের অনুমোদনে ১০ই এপ্রিল ঘোষিত। ব্যারিষ্টার আমিরুল ইসলামের অভিমত এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

গণতান্ত্রিক পথে সাতকোটি জনতার জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মূলধারার সাথে বহু মত ও ধারা যুক্ত থাকে। নিজ নিজ মত ও পথ সবার কাছেই গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং বঙ্গবন্ধুর মত ও পথ নিয়ে বহু প্রশ্ন ও বিতর্ক থাকা স্বাভাবিক। অনেক বিতর্কের অবসানের জন্যে ১৫শ সংশোধনীতে ৬ দফা, ৭ মার্চের ভাষণ ও স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র নিয়ে একটি পরিচ্ছেদ সংবিধানে যুক্তকরার জন্যে (আহসান-উল-করিম, সংবিধান সংশোধনের দিকগুলো, ২০১০)এ। ৬ দফা বাদ দেওয়া হয়। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ছাড়াও বঙ্গবন্ধুর নামে ২৬শে মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণার ওয়ারলেস বার্তাটি সংযুক্ত করা হয়। জাতীয়বন্ধু জিয়ার প্রভাবশীল স্বাধীনতার ঘোষণাটি বাদ দিয়ে কেবল বঙ্গবন্ধুর নামে স্বাধীনতার ঘোষণা বার্তাটি সংযুক্ত করাও এ কে খন্দকারের ক্ষোভের একটি কারণ হতে পারে। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র থাকলে সেখানে বঙ্গবন্ধুর নামে কোন বার্তা আর সংযুক্ত করার প্রয়োজন নেই এবং ৬ দফা ছাড়া বঙ্গবন্ধু খন্ডিত। ভগবান ব্যক্তিক ও অবরোহমুখী, কিন্তু নেতা সমষ্টিক ও আরোহীমুখী। যত বড় নেতা, তত বেশী সমষ্টিক। ভগবান হয়ে বঙ্গবন্ধু একাই বাংলাদেশ বানিয়েছেন, এটা অবার্চীন-পাগল-ছাগলদের চেতনা।

বঙ্গবন্ধুর নামে স্বাধীনতার ঘোষণার ওয়ারলেস বার্তার কথায় ২৬শে মার্চের ভোরবেলা থেকেই আমরা পাবনা শহরবাসীরা ভোরবেলা মুক্তিযুদ্ধ শুরু করি। জাতির ক্রান্তিলগ্নে সেনাকর্মকর্তা হিসেবে জিয়ার স্বাধীনতার ঘোষণা ঐতিহাসিক ও প্রভাবশীল। এর মূলেও ৬ দফা, গণম্যান্ডেট ও ৭ই মার্চের ভাষণ। ৭ই মার্চের ভাষণের পরে নিজমুখে স্বাধীনতার ঘোষণা না দিলেও বাংলাদেশের উদ্ভুদয়ে জাতির প্রধাননেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধুর ভুমিকা কলঙ্কিত বা হ্রাস হয় না। তিনিই বাংলাদেশের উদ্ভুদয়ে রাজনৈতিক প্রধাননেতা। তাঁর নামেই স্বাধীনতার ঘোষণা হয়েছে। তাঁকে নেতা রেখেই স্বাধীনতাযুদ্ধ হয়েছে। তাঁর অনুপস্থিতি ও কারাবন্ধিত্ব দেয় জাতীয় ঐক্য। তবে স্বাধীনতাযুদ্ধে অন্যান্য নেতাদের অবদানও নক্ষত্রের মতো। বাংলাদেশের উদ্ভুদয়ে জাতির বঙ্গবন্ধুর প্রধাননেতা---তা যেমন অস্বীকার করার সুয়োগ নেই, তেমনি বাংলাদেশের উদ্ভুদয়ে তাঁকে ভগবান ভাবা বা বানোনোর সুযোগও নেই। বাংলাদেশের উদ্ভুদয় হয়েছে জাতির সম্মিলিত আকাংকায় ও প্রচেষ্টায়।
=================================
*মোহাম্মদ আহ্সানুল করিমঃ রাষ্ট্র-বিশেষজ্ঞ, মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক বিসিএস কর্মকর্তা। 

Thursday, 11 September 2014

মুক্তিযুদ্ধের আরও একটি ফরমায়েশি ইতিহাস

প্রথমা প্রকাশনী থেকে বেরিয়েছে মুক্তিবাহিনীর ডেপুটি চিফ অব আর্মি স্টাফ একে খন্দকারের বই ‘১৯৭১: ভেতরে বাইরে’। প্রকাশিত হবার পরে পরেই বইটি নিয়ে দারুণ বিতর্ক শুরু হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখালেখির প্রতি মানুষের বিশেষ করে তরুণদের আগ্রহ বেশ বেড়েছে। কাজেই একজন মুক্তিযোদ্ধা যখন মুক্তিযুদ্ধ নিয়েই স্মৃতিচারণ করেন তখন স্বাভাবিকভাবেই সেটা কৌতূহলী করে তুলবে পাঠককে। পাঠকের এই আগ্রহের কারণেই একে খন্দকারের বই নিয়ে সৃষ্ট বিতর্ক এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই।

বই হিসেবে একে খন্দকার কিংবা প্রথমা প্রকাশনী পাঠকের সামনে কী উপস্থাপন করছেন খতিয়ে দেখার প্রয়োজন আছে। বিশেষ করে, উপজীব্য যখন মুক্তিযুদ্ধ, তখন ইতিহাসের পাঠক হিসেবেই এই বইয়ে উপস্থাপিত তথ্য ও বক্তব্য বিশ্লেষণ করে দেখাটা জরুরি বলে মনে হয়। কারণ মুক্তিযোদ্ধারা যা বলে গেছেন, বলে যাচ্ছেন এবং বলে যাবেন সেইসব সাক্ষ্য থেকেই মুক্তিযুদ্ধের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনা করা হবে এবং যারা একাত্তর দেখেননি, তারা মুক্তিযুদ্ধের বিশাল ও বিস্তৃত প্রেক্ষাপট সম্পর্কে জানতে পারবেন।

সেই প্রেক্ষাপটেই ‘১৯৭১: ভেতরে বাইরে’ বইয়ে যেসব তথ্য ও মন্তব্য উপস্থাপনা করা হয়েছে তা একটু খতিয়ে দেখার চেষ্টা করছি। বইয়ে যেসব বিষয়ের উল্লেখ করা হয়েছে, তার অনেক কিছু নিয়েই কথা বলা যায়। অত দীর্ঘ না করে, এখানে প্রধান কয়েকটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হবে।

বইয়ে যেসব বিষয়ের উল্লেখ করা হয়েছে, তার অনেক কিছু নিয়েই কথা বলা যায় 

২.
মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতির ব্যাপারটা নিয়েই প্রথমে কথা বলা যাক। একে খন্দকার লিখেছেন–
“শোনা যায়, মার্চ মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হলের (বর্তমানে সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) ছাত্ররা নিজ উদ্যোগে ৩০৩ রাইফেল দিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করার প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিল। কিন্তু বর্তমান সময়ের মতো তখন তথ্যপ্রযুক্তি এত উন্নত ছিল না। তাই এ ধরনের কোনো তৎপরতার খবর তাৎক্ষণিকভাবে আমি বা অন্য সামরিক কর্মকর্তারা জানতে পারিনি। এর ফলে কর্মরত বাঙালি সামরিক কর্মকর্তাদের ধারণা হয় যে, রাজনৈতিক নেতাদের কোনো ধরনের যুদ্ধপ্রস্তুতি নেই। ফলে ২৫ মার্চ ঢাকাসহ সারাদেশে যখন পাকিস্তানি বাহিনী আক্রমণ করল, তখন একে প্রতিহত করার জন্য বাঙালি সেনাসদস্যদের কোনো প্রস্তুতি ছিল না।’’

এখানে প্রথমেই যে জিনিসটি দৃষ্টিকটুভাবে চোখে পড়ে সেটা হল, অনুচ্ছেদের শুরুতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের যুদ্ধপ্রস্তুতি সম্পর্কে বলা কথাটির আগে জুড়ে দেওয়া দুটি শব্দ-– ‘শোনা যায়’। মুক্তিবাহিনীর ডেপুটি চিফ অব আর্মি স্টাফ একে খন্দকার স্বাধীনতার তেতাল্লিশ বছর পরে এসেও নিশ্চিতভাবে জানেন না যে, দেশের ছাত্ররা সেইদিন সশস্ত্র যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল! এর কাছে ওর কাছে যা শুনেছেন, তাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের প্রস্তুতি ছাড়া আর কোনো খবর তিনি জানতে পারেননি! একে সম্ভবত অবজ্ঞা বলে। এই অবজ্ঞার দৃষ্টান্ত এর পরেও তিনি রেখেছেন। সে কথায় আমরা পরে ফিরে আসব।

অন্য এক জায়গায় একে খন্দকার বলেছেন, যদি আওয়ামী লীগ নেতাদের কোনো যুদ্ধ পরিকল্পনা থাকত, তাহলে মার্চের শুরু থেকে জনগণ, বেসরকারি ও সামরিক কর্মকর্তাদের স্বল্প সময়ে সঠিকভাবে সংগঠিত করা যেত।

যাহোক, উপরের দুটি অনুচ্ছেদ থেকে তিনটি সারকথা বের করে আনা যায়।
প্রথমত, বেসামরিক জনগণের তেমন কোনো যুদ্ধপ্রস্তুতি ছিল না; যা ছিল সেটা সামরিক কর্মকর্তারা জানতে পারেননি।
দ্বিতীয়ত, এই না জানার কারণে সেনাসদস্যরাও কোনো ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে রাখেননি।
তৃতীয়ত, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, বেসামরিক জনগণ এবং সেনাসদস্যদের মধ্যে কোনো ধরনের সমন্বয় ছিল না।
তিনটির কোনোটিই সত্য নয়।

‘১৯৭১ উত্তর রণাঙ্গনে বিজয়’ বইটি লিখেছেন মুক্তিযোদ্ধা আখতারুজ্জামান মণ্ডল। সেখানে আমরা দেখতে পাচ্ছি, উত্তরবঙ্গে আখতারুজ্জামানরা একাত্তরের মার্চের শুরু নয়, ফেব্রুয়ারি থেকেই সশস্ত্র যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করেছেন এবং মোটামুটি সাফল্যের সঙ্গে ইপিআর বাহিনীর সঙ্গেও সমন্বয় সাধনের কাজটি সেরে ফেলেছেন।

আখতারুজ্জামান মণ্ডলের বই থেকে আমরা দেখতে পাচ্ছি, জানুয়ারি মাসে বঙ্গবন্ধু গোপনে স্বাধীনতার জন্য কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন। সেই নির্দেশ ছাত্রনেতাদের মাধ্যমে আখতারুজ্জামান মণ্ডল ও তার সঙ্গীদের কাছে পৌঁছেছে এবং সেই নির্দেশ অনুসারেই তারা একাত্তরের ফেব্রুয়ারিতেই কুড়িগ্রাম ও পার্শ্ববর্তী এলাকাসহ উত্তরবঙ্গের একটি বড় অংশে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন। গোপনে কন্ট্রোল রুম স্থাপন এবং ইপিআর বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করে সমন্বয় সাধনের কাজও করেছেন। [১]

যার ন্যূনতম বিবেচনাবোধ আছে, তিনি আখতারুজ্জামান মণ্ডলের বিবরণ থেকেই বুঝবেন, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ মোটেই অপ্রস্তুত ছিলেন না, বেসামরিক জনগণকে সংগঠিত করার জন্য তাঁদের পরিকল্পনাও ছিল।

রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ মোটেই অপ্রস্তুত ছিলেন না, বেসামরিক জনগণকে সংগঠিত করার জন্য তাঁদের পরিকল্পনাও ছিল সেনাসদস্যদের সঙ্গেও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সিভিলিয়ান জনগণের একাংশের যোগাযোগ ছিল, বেশ ভালোভাবেই ছিল। এর বিবরণ পাওয়া যাচ্ছে রফিকুল ইসলাম বীর উত্তমের লেখা A Tale of Millions বইতে। রফিকুল ইসলামের জবানি থেকে জানা আচ্ছে, মার্চের মাঝামাঝি সময়েই তিনি প্রায় ৬০০ ইপিআর সদস্যকে চট্টগ্রামে সংগঠিত ও প্রস্তুত করে রেখেছেন এবং সীমান্ত এলাকা থেকে আরও ৯০০ সদস্য তার পরিকল্পনায় যোগ দেবেন, সেটিও স্থির করেছেন। ঢাকায় কর্মরত জ্যেষ্ঠতম বাঙালি সেনা কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের জন্য তিনি জনৈক দেলওয়ারকে দায়িত্ব দিয়েছেন। চট্টগ্রামে থাকা বাঙালি সেনা অফিসার, যাদের সঙ্গে তিনি কথা বলেছেন তারা পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী সশস্ত্র যুদ্ধে অংশ নিতে প্রস্তুত। [২]

একই বইতে রফিকুল ইসলাম আরও লিখেছেন, তিনি নিজে বঙ্গবন্ধু এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন প্রস্তুতির ব্যাপারে। রফিকুল ইসলাম এ-ও জানাচ্ছেন, বাঙালি সেনাসদস্যদের একটি অংশ মার্চের দ্বিতীয়াংশে এসেও বিশ্বাস করেননি যে আসলেই একটি যুদ্ধ হতে যাচ্ছে, বাঙালি অফিসারদের যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়া উচিত বলেই এই অংশটি মনে করেননি তখনও-–
Although the officers agreed with me on the issue of the military build-up, they could not make up their mind whether the situation demanded any military action on our part or not.

একে খন্দকার যেভাবে রাজনৈতিক নেতৃত্বের উপরে দায়ভার চাপিয়ে দিয়েছেন এবং সামরিক কর্মকর্তাদের সংগঠিত করায় ব্যর্থতার কথা বারবার বলছেন, তার প্রেক্ষিতে এই শেষের অংশটুকু গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতেই হয় বৈকি!
যাহোক, আখতারুজ্জামান মণ্ডল এবং রফিকুল ইসলামের বিবরণ থেকে এই তিনটি বিষয় পরিস্কার হয়ে যাচ্ছে–
১. বাঙালি সেনাসদস্যরা পরিস্থিতির গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন ছিলেন, তারা একেবারে পরিকল্পনা ও প্রস্তুতিহীন অবস্থান ছিলেন না;
২. বেসামরিক জনসাধারণ তাদের সাধ্যমতো সশস্ত্র যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছিলেন;
৩. রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ হাত গুটিয়ে বসে ছিলেন না, সেনাসদস্য ও বেসামরিক জনগণের সঙ্গে তাদের মোটামুটি ভালো রকম সমন্বয় ছিল, যুদ্ধের প্রস্তুতির ব্যাপারটিও মোটামুটিভাবে মনিটরিং করা হচ্ছিল।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই প্রস্তুতির মাত্রা কী রকম ছিল? সারা দেশের প্রত্যেকটি মানুষ এর সঙ্গে জড়িত ছিল, এমন নির্বোধের মতো দাবি অবশ্যই কেউ করবেন না। সেই সময়ে চারপাশেই বিশ্বাসঘাতকদের আনাগোনা। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গোয়েন্দারাও বসে ছিল না। সতর্কভাবে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের দিকে চোখ রাখছে তারা। সেনানিবাস থেকে বাইরের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন এবং খবর সংগ্রহ কতটা কঠিন ছিল তার খানিকটা নমুনা পাওয়া যাচ্ছে জহিরুল ইসলামের লেখা ‘মুক্তিযুদ্ধে মেজর হায়দার ও তার বিয়োগান্ত বিদায়’ বইয়ে।

এই বইয়ের বিবরণ অনুযায়ী, সেনানিবাসের অবস্থা তখন খুবই উত্তেজনাপূর্ণ, কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বাঙালি সেনা ও অফিসারদের সেনানিবাস থেকে বের হওয়া নিষেধ। ঢাকায় কী ঘটছে, দেশে কী ঘটছে, সেটা ক্যান্টনমেন্টের ভেতর থেকে জানা বেশ কঠিন। এক সন্ধ্যায় লুকিয়ে ক্যান্টনমেন্ট থেকে বের হয়ে, মতিঝিলে বোনের বাসায় যান মেজর হায়দার এবং ফেরার সময় প্রহরির হাতে ধরা পড়েন। শেষ পর্যন্ত তার পিঠে বন্দুক ঠেকিয়ে তাঁবুতে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। [৩]

এই ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখে কমবেশি সকল বাঙালি সৈনিক পড়েছেন বলেই ধরে নেওয়া যায়। এইসবের প্রতিবন্ধকতা পার হওয়ার পরে, যেটুকু প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল সেটাকে অন্তত ‘শোনা যায়’ বলে উড়িয়ে দেওয়ার কোনো অবকাশ নেই।

এখানে উদ্ধৃত অংশে একে খন্দকার যা বলেছেন, সেটা অজ্ঞতা থেকে বলে থাকতে পারেন, অবজ্ঞা থেকেও পারেন, অন্য কোনো কারণেও পারেন। কারণটি কী সেই সিদ্ধান্তে না গিয়ে বরং আমরা এটুকু নিশ্চিত হয়ে থাকি, একে খন্দকার যা লিখেছেন তা সত্য নয়।

রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের বিশেষ করে শেখ মুজিব যুদ্ধের ব্যাপারে কী প্রস্তুতি নিয়েছিলেন সেই বিষয়ে আরও কিছু প্রাসঙ্গিক আলোচনা পরে করা হবে।

৩.
একে খন্দকার লিখেছেন, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণেই যে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছিল সেটা তার মনে হয় না। এই ভাষণের শেষে বঙ্গবন্ধু ‘জয় পাকিস্তান’ বলেছিলেন।

প্রথমে ‘জয় পাকিস্তান’ বলার বিষয়টির মীমাংসা করা যাক। এটি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের একটি জনপ্রিয় কিন্তু অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক। একে খন্দকারই প্রথম ব্যক্তি নন, যিনি এই দাবি করেছেন। এর আগে শামসুর রাহমান এবং আহমদ ছফাও এমন কথা বলেছেন। আহমেদ ছফা যে প্রবন্ধে বলেছেন (১৯৭১: মহাসিন্ধুর কল্লোল), সেখানে আবার জুড়ে দিয়েছেন, তার শ্রুতিবিভ্রম হতে পারে। পারে বটে! প্রশ্ন হচ্ছে, তাঁরা কি সত্য বলেছেন?

এই দাবি সত্য কি মিথ্যা সেই বিশ্লেষণে যাবার আগে বরং এর বিপরীত মতগুলোর দিকে একটু তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করি। আবুল মনসুর আহমেদের বিখ্যাত রচনা ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’ বইতে এই প্রসঙ্গটি খোলাসাভাবেই আলোচনা করা হয়েছে। সেখানে থেকেই উদ্ধৃত করা যাক–

‘‘যারা নিজেরা উক্ত সভায় উপস্থিত ছিলেন বলিয়া দাবি করেন তাদের কেউ কেউ আমার এই কথার বিরোধিতা করেন। তারা বলেন, শেখ মুজিব ৭ মার্চের সভাতেও ‘জয় বাংলা’, ‘জয় পাকিস্তান’ বলিয়া বক্তব্য শেষ করিয়াছিলেন। আমি যখন বলি যে, পরদিন আমি রেডিও-টেলিভিশনে নিজ কানে তাঁর বক্তব্য শুনিয়াছি এবং তাতে ‘জয় পাকিস্তান’ ছিল না, তার জবাবে তারা বলেন, পরদিন রেকর্ড ব্রডকাস্ট করিবার সময় ঐ কথাটা বাদ দেওয়া হইয়াছিল। যাক আমি নিজ কানে যা শুনিয়াছিলাম, তাই লিখিতেছি। বক্তৃতা শেষ করিয়াই মুজিব সভামঞ্চ ত্যাগ করিলেন। তাজুদ্দিন সাহেব মুহূর্তমাত্র সময় নষ্ট না করিয়া মাইকের স্ট্যান্ড চাপিয়া ধরিলেন এবং বলিলেন: ‘এইবার মাওলানা তর্কবাগীশ মোনাজাত করিবেন। সভার কাজ শেষ’। মাওলানা তর্কবাগীশ মাইকের সামনে দুই হাত তুলিয়া মোনাজাত শুরু করিলেন। সমবেত বিশ-পঁচিশ লক্ষ লোকের চল্লিশ পঞ্চাশ লক্ষ হাত উঠিয়া পড়িল। মোনাজাতের সময় এবং তকবিরের সময় কথা বলিতে নাই। তাই কেউ কথা বলিলেন না। নড়িলেন না। যখন মোনাজাত শেষ হইল, তখন শেখ মুজিব চলিয়া গিয়াছেন।’’

পরদিন আমি রেডিও-টেলিভিশনে নিজ কানে তাঁর বক্তব্য শুনিয়াছি এবং তাতে ‘জয় পাকিস্তান’ ছিল না আবুল মনসুর আহমেদের ভাষ্য থেকে জানা যাচ্ছে তিনি রেডিওতে ভাষণ শুনেছেন। একে খন্দকারও তাই শুনেছেন। আবুল মনসুর আহমেদের পরিচিত ব্যক্তি, যাদের দাবি শেখ মুজিব ‘জয় পাকিস্তান’ বলেছেন, তারাও সাক্ষ্য দিচ্ছেন, রেডিওতে প্রচারিত ভাষণে ওই অংশটি কেটে দেওয়া হয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে একে খন্দকার কীভাবে শুনেছেন? এই প্রশ্নটির উত্তর একে খন্দকার দিলে অনেক জট খুলতে পারে হয়তো।

শামসুর রাহমানের আত্মজৈবনিক স্মৃতিচারণ ‘কালের ধুলোয় লেখা’। এইখানে কবি শামসুর রাহমান ‘জয় পাকিস্তান’ শ্লোগানের ব্যাপারটি বলেছেন। এই সূত্রটি অনেকেই ব্যবহার করে থাকেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে, শামসুর রহমান নিজেই পরে স্বীকার করে নিয়েছেন, তার দেওয়া এই তথ্যটি ভুল। ৩০ জুলাই, ২০০৪ তারিখে সাপ্তাহিক ২০০০ পত্রিকায় শামসুর রাহমান স্বীকার করেছেন, বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চে ‘জয় পাকিস্তান’ জাতীয় কোনো শ্লোগান দেননি, ‘জয় বাংলা’ বলেই সেইদিন ভাষণ শেষ করেছেন তিনি। অনিচ্ছাকৃত এই ত্রুটির জন্য পাঠক ও বঙ্গবন্ধুপ্রেমীদের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন শামসুর রাহমান।

বাংলাদেশের প্রথিতযশা ইতিহাসবিদ মুনতাসির মামুন মাত্র ক’দিন আগেই চট্টগ্রামে একটি অনুষ্ঠানে বলেছেন, ওইদিনের সভায় তিনি উপস্থিত ছিলেন এবং শেখ মুজিব সেদিন ‘জয় পাকিস্তান’ জাতীয় কিছু বলেননি।
এই প্রবন্ধ লিখবার আগে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলে নিয়েছি, আরা সেইদিনের সভায় উপস্থিত ছিলেন। প্রত্যেকেই বলেছেন, এমন কিছু তারা শোনেননি।

৭ মার্চের ভাষণের যতগুলো ফুটেজ পাওয়া গেছে, কোনোটিতেই এ রকম কোনো নমুনা পাওয়া যায় না। সত্যি সত্যি এমন কোনো ফুটেজ থাকলে সেটা বিএনপির সর্বশেষ দু’টি শাসনকালে খুঁজে পাওয়া যাবে না, তা কি বিশ্বাসযোগ্য?
এখন এই পরস্পরবিরোধী দু’টি বক্তব্যের মাঝে সত্য হিসেবে কোনটাকে ধরে নেওয়া উচিত? এর উত্তর খুব সহজ। যারা বলছেন এমন কিছু তারা শোনেননি, এখন পর্যন্ত পাওয়া সব ডকুমেন্ট ও ভিডিও ফুটেজ কিন্তু তাদের বক্তব্যই সমর্থন করে। যারা বলছেন, শেখ মুজিবকে ‘জয় পাকিস্তান’ বলতে তারা শুনেছেন, এর সত্যতা প্রমাণের দায়ভারটাও তাদের ঘাড়েই বর্তায় এবং তারা এখনও তাদের দাবির পক্ষে শক্ত কোনো প্রমাণ হাজির করতে পারেননি– না কোনো ভিডিও ফুটেজ, না ওই সময়ের পত্রিকায় এর উল্লেখ।

আমাদের হাতে থাকা প্রত্যক্ষ্যদর্শীর বিবরণ, ভিডিও ফুটেজ, পত্রিকার খবর কোনোটি থেকেই এমন কোনো মজবুত প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে না, যা থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়, শেখ মুজিব ৭ মার্চ ‘জয় পাকিস্তান’ বলেছেন। উলটো যাদের লেখা থেকে এই দাবি পাওয়া যাচ্ছে, তাদেরই কেউ কেউ ভুল স্বীকার করে নিয়েছেন। একে খন্দকারের এই বিভ্রান্তিকর বক্তব্যও তাই বাতিল হয়ে যাচ্ছে।

এর পরে আসছে, তিনি একে স্বাধীনতার ডাক মনে করেন কি না। তিনি কী মনে করেন বা না করেন সেটা তো পুরোপুরি তার ব্যক্তিগত ব্যাপার। একই জিনিসের প্রভাব একেক মানুষের কাছে একেক রকম। সামরিক ব্যক্তিত্ব একে খন্দকারের কাছে শতভাগ বেসামরিক মুজিবের বেসামরিক ভাষণ অগুরুত্বপূর্ণ মনে হতেই পারে। তবে এই প্রবন্ধ লিখবার সময় একেবারে হাতের কাছেই অন্তত দুজন সেনাসদস্যের জবানি রয়েছে, যারা ৭ মার্চের ভাষণেই স্বাধীনতার ডাক শুনতে পেয়েছেন।

জিয়াউর রহমান তার ‘একটি জাতির জন্ম’ নিবন্ধে এই ভাষণকে চূড়ান্ত যুদ্ধের গ্রিন সিগন্যাল মনে করেছেন। লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবু ওসমান চৌধুরী তার এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম বইয়ের ভূমিকায় লিখেছেন-–
“বুঝতে আমার একটুও অসুবিধা হয়নি যে বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা, ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ শুধু আমাকেই উদ্বেলিত করেনি, বরং প্রতিটি বাঙালির বুকেই তুলেছে বিদ্রোহের ঝড়, স্বাধীনতার অনাস্বাদিত স্পৃহা।”
এখন একে খন্দকার যদি এই ভাষণ থেকে প্রেরণা না পেয়ে থাকেন, তাহলে কার কী করার আছে?

৪.
বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন কি না তা নিয়েও একে খন্দকার প্রশ্ন তুলেছেন। বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের একটি রায়ের মাধ্যমে নিস্পত্তি করা হয়েছে। আদালতের রায়ে মীমাংসিত একটি বিষয় নিয়ে অহেতুক বিতর্কের প্রয়োজন নেই বলেই মনে করি। যে দলিল দেশের সর্বোচ্চ আইন সংবিধানে সন্নিবেশিত হয়েছে সেটার সত্য মিথ্যা নিয়ে অপ্রয়োজনীয় তর্ক করে সময় নষ্ট না করাই উচিত। এখানে বরং বিতর্ক হতে পারে অন্য ব্যাপারে; আদালতের রায়ের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত ও সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত একটি বিষয় নিয়ে এভাবে প্রশ্ন তোলাটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে কি না সেটাই বরং আলোচনার বিষয় হওয়া উচিত।

আমরা আপাতত অন্য একটি বিষয়ের দিকে দৃষ্টি দিই। একে খন্দকার লিখেছেন, ২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে নিরাপদে পালিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল এবং না গিয়ে তিনি ক্ষতি করেছেন। কী হলে কী হতে পারত তা নিয়ে আসলে অনন্তকাল তর্ক করা সম্ভব, তাতে কাজের কাজ কিছু হবে না। বঙ্গবন্ধুর কাছে যা ভালো মনে হয়েছে তিনি তা করেছেন, একে খন্দকার সেটা স্বীকারও করেছেন এবং স্বীকার করেই ঠিক তার পরের অনুচ্ছেদের আবার একই মায়াকান্না জুড়েছেন।

যাহোক, বঙ্গবন্ধুর মতো পোড় খাওয়া রাজনীতিক হাতে কোনো বিকল্প না রেখেই কাজ করেছেন এটা মোটামুটি অসম্ভব ব্যাপার। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে গ্রেফতার জন্য অপেক্ষা করা ছড়াও আরও পরিকল্পনা তার ছিল। তার অন্তত একটির সাক্ষ্য দিচ্ছেন বঙ্গবন্ধুর প্রতিবেশি নয়ীম গহর। ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা: ফ্যাক্টস অ্যান্ড উইটনেস’ বইয়ে নয়ীম গহরের জবানিতে সেই কথা জানাচ্ছেন আ ফ ম সাঈদ–

“বঙ্গবন্ধু কেন চট্টগ্রামে এম আর সিদ্দিকীর কাছে যুদ্ধ শুরুর নির্দেশ পাঠিয়েছিলেন। হ্যাঁ, কথা ছিল চট্টগ্রাম থেকেই যুদ্ধটা শুরু হবে এবং তার নেতৃত্বে থাকবেন স্বয়ং বঙ্গবন্ধু। কিন্তু পাকিস্তানি আর্মি ইন্টেলিজেন্সের গোপন একটি তথ্য ঠিক সময়মতোই জানতে পারে যে, শেখ মুজিবুর রহমান চট্টগ্রামে যাওয়ার চেষ্টা করলেই যেভাবেই হোক তাকে পাকিস্তানি আর্মি মেরে ফেলবে এবং সম্ভাব্য হত্যা করার জায়গাটি ছিল কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের কাছাকাছি। [৪]”

২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে নিরাপদে পালিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল এবং না গিয়ে তিনি ক্ষতি করেছেন একে খন্দকার আরও বলেছেন, গ্রেফতার হওয়ার পূর্বে তিনি কোনো নির্দেশ দিয়ে যাননি। বঙ্গবন্ধুর জায়গা থেকে সেই সময় জনে জনে নির্দেশ দিয়ে যাওয়া নিশ্চয়ই সম্ভব ছিল না। ২৫ মার্চ রাতে তাঁর রাজনৈতিক সহকর্মীসহ অনেকেই ধানমণ্ডিতে তাঁর বাসায় ছিলেন এবং তাদেরকে বিভিন্ন রকম পরামর্শই বঙ্গবন্ধু দিয়ে গেছেন। এত বিশাল একটা যুদ্ধ শুরু হতে যাচ্ছে, কত দিন সেটা চলবে কেউ জানে না, আর সেই ব্যাপারে সব রকম নির্দেশনা ঘরে বসেই মুজিব দিয়ে যাবেন এটা যদি কেউ আশা করে থাকে তাহলে সেটা মারাত্মক ভুল।

একে খন্দকারও সেই আশা করেননি। এখন পাঠককে বিভ্রান্ত করার জন্যই এইসব বলছেন তিনি। যাহোক, নয়ীম গহরের ভাষ্য থেকেই আমরা জানতে পারছি, যুদ্ধ কীভাবে শুরু করতে হবে সেই ব্যাপার গ্রেফতার হওয়ার আগেই চট্টগ্রামে এম আর সিদ্দিকী ও ইঞ্জিনিয়ার মোশারফ হোসেনকে অভিন্ন একটি বার্তা আলাদাভাবে পৌঁছে দেন। নির্দেশনাগুলো ছিল-–
Talk has failed
Don’t surrender Arms (EPR, EBR, Police, Ansar and general people)
Let the people and other start…
Liberate Chittagong
Proceed toward Comilla
Carry out my earlier orders even if I am not available (dead or a captive)
Confirm me back that Chittagong understood me clearly[৪]

এই মেসেজের অর্থ, যুদ্ধ নিয়ে বঙ্গবন্ধুর নিজস্ব পরিকল্পনা ছিল এবং এ ব্যাপারে আগে থেকেও নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। একে খন্দকারের দাবির যৌক্তিকতা তাহলে ধোপে টিকছে না।

একে খন্দকার বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে একটি বেশ গর্হিত মন্তব্যই করেছেন বলা যায়, শেখ মুজিব নাকি মার্চে ইয়াহিয়ার সঙ্গে বসে বসে ভিন্ন রাজনৈতিক খেলা খেলছিলেন। যাহোক, এই ব্যাপারেও বেশি কিছু বলার নেই, কোনটা কার কাছে খেলা মনে হবে সেটা নিয়ে অন্য কারও কিছু বলার থাকতে পারে না। শুধু দুটি কথোপকথনের উদ্ধৃতি দিয়ে এই অংশটুকু শেষ করতে চাই। আলোচনা যখন চলছে, তার মাঝেই ১৭ মার্চ ইয়াহিয়া খান টিক্কা খানকে মুজিব সম্পর্কে বলেছে, ‘দ্যা বাস্টার্ড ইজ নট বিহ্যাভিং, ইউ গেট রেডি’। [৫]

মুজিব ঠিক কী চাচ্ছিলেন যার জন্য ইয়াহিয়া এই উক্তি করেছেন, তার নমুনা পাওয়া যাচ্ছে মার্চের ২৫ তারিখে করা জুলফিকার আলী ভুট্টোর উক্তিতে–
২৫ মার্চ জেনারেল ইয়াহিয়া খান ও জুলফিকার আলী ভুট্টোর মধ্যে বৈঠক হয়। বৈঠক শেষে ভুট্টো বললেন, ‘পরিস্থিতি অত্যন্ত আশংকাজনক’। তিনি সাংবাদিকদের আরও বললেন– ‘আওয়ামী লীগ যে ধরনের স্বায়ত্তশাসন চাচ্ছে তাকে আর স্বায়ত্তশাসন বলা যায় না। ওদের দাবি তো স্বায়ত্তশাসনের চেয়েও বেশি’। [৫]

এই প্রসঙ্গে এর বেশি আর কিছু আলোচনার দরকার আছে বলে মনে হয় না।

৫.
সামরিক বাহিনীর বাইরে থেকে আসা গেরিলা যোদ্ধাদের নিয়ে কয়েকটি অবমাননাকর মন্তব্য করেছেন একে খন্দকার। যুদ্ধের সময় সময়ে ভারতের কাছ থেকে পাওয়া সামরিক সহযোগিতা নিয়েও কটূক্তি আছে বইয়ে। গেরিলা যোদ্ধাদের কৌশল ও অনভিজ্ঞতা নিয়ে একে খন্দকার যা বলেছেন তা যে কোনো বিচারেই অশালীন। তার মনে রাখা উচিত, বহু সেনাসদস্য যখন ইতস্তত করছিলেন তখন এইসব বেসামরিক তরুণরাই ঘর-পরিবারের মায়া কেটে যুদ্ধে যোগ দিতে ছুটে এসেছে। কী দিয়ে লড়াই করবে সে সম্পর্কে সামান্য জ্ঞান না থাকলেও লড়তে হবে এই বোধটুকু তাদের ছিল; কারণ তারা চোখের সামনেই নিজের ভাই-বোন-বাবা-মাকে মরতে দেখে এসেছে।

একটি জাতির স্বাধীনতা সংগ্রাম কখনও-ই শতভাগ সামরিক বাহিনীর উপর নির্ভর করে পরিচালনা করা সম্ভব নয়, তাকে একটি কার্যকর গণযুদ্ধে রূপান্তরিত না করতে পারলে সেই যুদ্ধে সাফল্য পাওয়া অসম্ভব। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে এই সব সাধারণ মানুষদের সামান্য ট্রেনিং দিয়ে গেরিলায় রূপান্তরিত করা হয়েছে। অদক্ষতা এবং অনভিজ্ঞতা তাদের অন্যতম প্রধান শত্রু ছিল, এতে দ্বিমত নেই কারও; তবে সেই সঙ্গে এ-ও সত্য এই অনভিজ্ঞ গেরিলারাই কিন্তু বহু সফল অভিযানের নায়ক। একে খন্দকার গেরিলাদের ব্যর্থতার কথা এনেছেন। সামরিক বাহিনী থেকে আসা মুক্তিযোদ্ধারাও কি এসব ব্যর্থতা থেকে মুক্ত ছিলেন? তিনি নিজে তো সম্মুখ সমরে যাননি, যারা গিয়েছেন তাদের অবদান খাটো করার এই মানসিকতা একজন মুক্তিযোদ্ধা হয়ে তিনি কীভাবে ধারণ করেন?

একে খন্দকার লিখেছেন, প্রয়োজনীয় অস্ত্র দিতে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের অনীহার কথা, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ভারতের তখনকার মানসিকতা নিয়েও কয়েকটি মন্তব্য করেছেন। শুনতে রূঢ় মনে হলেও, ভারত নিশ্চয়ই তখন আমাদের জন্য নিজেদের সর্বস্ব উজাড় করে দেবে না। যুদ্ধটা বাংলাদেশের, ভারতের নয়। কাজেই সেই যুদ্ধে সহযোগিতা করতে গিয়ে তাদের কতটুকু ক্ষতি হচ্ছে সেটা অবশ্যই ভারতকে হিসাব করতে হবে।

যুদ্ধের সেই দশটি মাস এবং তার পরেও এক কোটির বেশি শরণার্থীর প্রত্যেকে লাশ হয়ে যেত যদি ভারত সহযোগিতা না করত। ভারতের নিজস্ব সেনাবাহিনী আছে, নিজেদের প্রতিরক্ষা নিয়েও তাদের দুশ্চিন্তা আছে। সেইসব বাদ দিয়ে, কেন ২০ শতাংশ থেকে ৩০ শতাংশ গোলাবারুদ দেওয়া হচ্ছে এটা নিয়ে অনুযোগ করাটা খুবই অশ্লীল শোনায়।

বাঙালিরা বিহারি হত্যা করেছে, লিখেছেন একে খন্দকার। বিহারিদের সম্পত্তি লুটপাট করা হয়েছে। অথচ যুদ্ধ শুরুর আগেই পরিকল্পিতভাবে বিহারিদের বাঙালি নিধনে লেলিয়ে দেওয়াটা তার চোখে পড়ল না? কিছু মানুষ পরিস্থিতির সুযোগ নেবেই, তাতে নিরপরাধ বিহারিদের প্রাণও গিয়েছে। কিন্তু এই বিহারিরাই যে দু’দিন আগেই এই বাঙালিদের স্বজনদের নির্মমভাবে হত্যা করেছে সেটা এড়িয়ে একে খন্দকার যেভাবে সরলীকৃত বক্তব্য দিলেন সেটা কোনোভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।

৬.
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি নতুন কোনো বিষয় নয়। তবে আমাদের জন্য হতাশাজনক ব্যাপার হল, ইতিহাসের ভুল ও বিভ্রান্তিকর সংস্করণ প্রকাশের সেই মিছিলে শামিল হয়েছেন স্বয়ং মুক্তিযোদ্ধারাই। প্রথমা প্রকাশনী এই ধরনের মিথ্যাচার প্রকাশ করার দায়িত্বটা পালন করে চলছে অনেক দিন আগে থেকেই। এই প্রথমা থেকেই প্রকাশিত গোলাম মুরশিদের ‘মুক্তিযুদ্ধ ও তারপর: একটি নির্দলীয় ইতিহাস’ বইয়ে মুক্তিযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা নিয়ে এত বছর পরে সংশয় তোলা হয়েছে।। তার ধারাবাহিকতা হিসেবে এবার এল ‘১৯৭১: ভেতরে বাইরে’। প্রশ্ন হচ্ছে, কার স্বার্থে এই বিকৃতি?

এর উত্তর সহজ, আবার কঠিন। সহজ উত্তরটি হচ্ছে, অবশ্যই বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধী চক্রের স্বার্থেই এসব হয়ে চলেছে। আবার আরও একটু কঠিন করে জিজ্ঞেস করা যায়, এসবের উদ্দেশ্য কী? এসব কি কোনো দীর্ঘমেয়াদী ভয়াবহ ষড়যন্ত্রের আলামত? অন্য কোনো ষড়যন্ত্র থেকে চোখ ঘুরিয়ে রাখতে ডাইভারসন? এই ব্যাপারগুলোর তদন্ত হওয়া উচিত।

এই মুহূর্তে যা প্রয়োজন, তা হল ইতিহাস বিকৃতি রোধে কঠোর আইন এবং তার আরও কঠোর প্রয়োগ। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে জেনোসাইড ডিনায়াল শাস্তিযোগ্য অপরাধ, একইভাবে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে যে কোনো বিকৃতি ও মিথ্যাচার কঠোর শাস্তির উপযুক্ত অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে আইন তৈরি করতে হবে। সেই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লেখা, উপাত্ত, দলিল আর প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণের দিকে নজর দিতে হবে বিশেষভাবে। না হলে দুই দিন পর পর এমন আকাশ থেকে পড়া ইতিহাসের সংখ্যা বাড়তেই থাকবে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের এই পৌনঃপুনিক বিকৃতি চিরতরে বন্ধ হোক।


প্রীতম দাস: তড়িৎ প্রকৌশলী। ব্লগার, বাংলাদেশ ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস চর্চায় উৎসাহী।

তথ্যসূত্র:

১. ১৯৭১ উত্তর রণাঙ্গনে বিজয়, আখতারুজ্জামান মন্ডল

২. A Tale of Millions, Rafikul Islam BU

৩. ‘মুক্তিযুদ্ধে মেজর হায়দার ও তার বিয়োগান্ত বিদায়, জহিরুল ইসলাম

৪. বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা ফ্যাক্টস অ্যান্ড উইটনেস, আ. ফ. ম. সাঈদ

৫. একাত্তরে বন্দী মুজিব পাকিস্তানের মৃত্যুযন্ত্রণা, অধ্যাপক আবু সাঈদ।