Monday, 5 January 2015

প্রসঙ্গ ইসলাম ॥ প্রিয়নবী (সা)-এর ইসলাম প্রচার


আল্লাহ্ জাল্লা শানুহু মানুষকে সৃষ্টি করেছেন তাঁর খলীফা বা প্রতিনিধি করে। মানুষকে তিনি সৃষ্টি করেছেন শুধুমাত্র তাঁর ইবাদত করবার জন্য। মানুষকে তিনি দান করেছেন পথ চলার দিশা। হযরত আদম আলায়হিস্ সালাম থেকে আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম পর্যন্ত প্রায় এক লক্ষ চল্লিশ হাজার মতান্তরে দুই লক্ষ চব্বিশ হাজার নবী রসুল পৃথিবীতে এসেছেন মানুষকে সঠিক পথে চলবার দিশা দিবার জন্য। আল্লাহ্ জাল্লা শানুহু মানুষকে দান করেছেন দীন বা জীবন ব্যবস্থা। ইসলাম আল্লাহ্র দেয়া একমাত্র জীবন ব্যবস্থা, যা হযরত আদম (আ) হতে প্রচারিত হতে হতে প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মাদুর রসুুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের দ্বারা পূর্ণতা লাভ করে। তিনি পৃথিবীতে আবির্ভূত হন সমগ্র মানবজাতির জন্য, তিনি আবির্ভূত হন বিশ্ব জগতের জন্য রহমত রূপে। তিনি আবির্ভূত হন সিরাজাম মুনীরা রূপে অর্থাৎ প্রদীপ্ত চেরাগরূপে। আল্লাহ্ জাল্লা শানুহু ইরশাদ করেন, হে নবী, নিশ্চয়ই আপনাকে প্রেরণ করা হয়েছে সাক্ষ্যদাতারূপে, সুসংবাদদাতারূপে, সতর্ককারীরূপে এবং আল্লাহ্্র দিকে তাঁরই অনুমতিক্রমে আহ্বানকারীরূপে এবং প্রদীপ্ত চেরাগরূপে। (সুরা আহযাব : আয়াত ৪৫)

৬১০ খ্রিস্টাব্দের ২৭ রমাদান রাতে আল্লাহ জাল্লা শানুহু তাঁর নিকট প্রথম ওহী প্রেরণ করেন। তিনি প্রথম ওহী পেয়ে অতি সংগোপনে ইসলাম প্রচার শুরু করেন। তিন বছর সংগোপনে ইসলাম প্রচার করার পর তিনি প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচার করবার জন্য ওহীপ্রাপ্ত হলেন। আল্লাহ জাল্লা শানুহু তাঁকে নির্দেশ দিলেন : (হে রসুল) আপনাকে যে বিষয়ে আদেশ করা হয়েছে আপনি তা প্রকাশ্যে প্রচার করুন আর মুশ্রিকদের পরোয়া করবেন না (সুরা হিজর : আয়াত ৯৪)। আপনার নিকটাত্মীয়বর্গকে সতর্ক করে দিন (সুরা শু’আরা আয়াত ২১৪)। এই নির্দেশ পেয়ে প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম ইসলাম প্রচারের উদ্যোগ গ্রহণ করলেন। তিনি সাফা পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে মক্কার বিভিন্ন গোত্রের নাম ধরে ধরে উচ্চৈঃস্বরে আহ্বান করলেন। সবাই এসে পাহাড়ের পাদদেশে জড়ো হলো। তিনি জিজ্ঞেস করলেন : যদি আমি কোন কথা তোমাদের নিকট উপস্থাপন করি, তোমরা কি তা বিশ্বাস করবে না? সবাই বলল, আপনি আল-আমিন, আমরা আপনার কথা বিশ্বাস করব। আপনি তো নির্দোষ ও নিষ্কলঙ্ক। তিনি বললেন : আমি যদি বলি, এই পর্বত শ্রেণীর আড়াল থেকে একটি অশ্বারোহী বাহিনী তোমাদের আক্রমণ করতে ছুটে আসছে, তাও কি তোমরা বিশ্বাস করবে? সবাই সমস্বরে বলে উঠল : নিশ্চয়ই বিশ্বাস করব। আপনি যে আল-আমীন, আপনি তো আস্্সাদীক। তিনি তখন বললেন : তাহলে তোমরা শোনো, আমি তোমাদের কঠোর আযাবের সতর্কবাণী শুনাচ্ছি।

তিনি একে একে একেকটি গোত্রকে সম্বোধন করে বলতে লাগলেন, হে বনু আব্দি মনাফ, হে বনু জাহারা, আমার আত্মীয়স্বজনকে সতর্ক করে দেয়ার জন্য আমাকে আদেশ করা হয়েছে। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু এই কলেমায় তোমরা ঈমান আন। যদি তোমরা এতে ঈমান না আন তাহলে তোমাদের দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ সাধন অসম্ভব হবে। প্রিয়নবী (সা) প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে যে পদ্ধতি অবলম্বন করলেন, তাতে লক্ষ্য করা যায় যে, আসল কথা তুলে ধরবার পূর্বে তিনি সমবেত সকলের মনমানসিকতা এবং তাঁর প্রতি তাদের আস্থা যাচাই করে নিলেন। ইসলাম প্রচার করতে যেয়ে তাঁকে এবং তাঁর সাহাবীগণকে দারুণ কষ্ট-লাঞ্ছনা-গঞ্জনা সইতে হয়েছে।

কিন্তু কোন কিছুই তাঁকে এই মহান কাজ থেকে বিরত রাখতে পারেনি। বরং তিনি ঘোষণা করেছেন, আল্লাহর কসম, আমার এক হাতে সূর্য এবং অন্য হাতে চন্দ্র এনে দেয়া হলেও আমি আমার কর্তব্য পালন করা থেকে বিরত হব না।

তিনি হযরত যায়দ বিন হারিসা রাদি আল্লাহ তা আলা আনহুকে সঙ্গে নিয়ে তায়েফে গিয়েছেন। সেখানকার মানুষকে হিদায়াত দান করবার জন্য, তাদের মধ্যে ইসলাম প্রচার করবার জন্য। তায়েফে তিনি প্রায় এক মাস অবস্থান করেন। এ সময় তিনি তায়েফের মানুষের নিকট ইসলামের দাওয়াত দিতে থাকেন। তায়েফের মানুষ তাঁর দাওয়াত গ্রহণ তো করলোই না বরং তাঁকে কঠোর ভাষায় বিদ্রƒপ করতে লাগল, অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করল, এমনকি দৈহিক নির্যাতন চালাল, পাথর মেরে তাঁর জিস্্ম মুবারক রক্তাক্ত করে দিল। তাঁর জিস্্ম ও কদম মুবারক থেকে পবিত্র খুন প্রবাহিত হলো। তিনি এমন অবস্থাতেও ধৈর্য ইখতিয়ার করলেন। তিনি তায়েফবাসীর অকথ্য জুলুম নির্যাতনের কথা ভুলে যেয়ে তাদের জন্য দু’আ করবেন এই বলে : আল্লাহ গো, আমার দুর্বলতা, উপায়হীনতা এবং মানবদৃষ্টিতে হেয়তার জন্য আপনার দরবারেই ফরিয়াদ করছি হে রহমানুর রহীম, হে পরম করুণাময় দয়ালুদাতা, সমস্ত দুর্বলের রব্্ আপনি এবং আপনিই আমার রব। যদি আপনি আমার ওপর ক্রুদ্ধ না হয়ে থাকেন তাহলে আমি কোন পরোয়া করি না। আপনার শাস্তি, আপনার আফিয়াত আমার আশ্রয়। আমি আপনার সেই নূরের আশ্রয় প্রার্থনা করছি যে নূর মুবারকে আসমান যমীন রওশন হয়েছে, যে নূরের ছটায় অন্ধকার বিদুরিত হয়। যে নূরের ছটায় দুনিয়া ও আখিরাতের কর্মসম্পাদন হয়। সেই নূর মুবারকের উসিলায় আপনি আপনার গযব নাযিল করবেন না, আপনার অসন্তুষ্টি নাযিল করবেন না। একমাত্র আপনার সন্তুষ্টি সাধন করাই আমার কর্তব্য যতক্ষণ না আপনি সন্তুষ্ট হন। লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিকা।

সেদিন তায়েফে ইসলাম প্রচার করতে যেয়ে অত্যাচার জর্জরিত অবস্থায় তিনি ধৈর্যধারণ করে যারা তাঁকে আঘাত করল তাদের জন্য আল্লাহর নিকট দু’আ করে ইসলাম প্রচারের কি নীতিমালা হওয়া উচিত তার অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন। তিনি সেদিন ক্ষমার পথ বেছে নিলেন, তিনি তাদের জন্য আল্লাহ্র নিকট ক্ষমা চাইলেন। তিনি বললেন : হয়ত আল্লাহ্্ তা’আলা তায়েফবাসীদের কারও বংশে এমন মানুষ পয়দা করবেন যারা আল্লাহর ইবাদত করবে এবং আল্লাহর সঙ্গে কারও শরিক করবে না।

পরবর্তীকালে হযরত আয়িশা রাদিআল্লাহু তা’আলা আনহা প্রিয়নবীকে (সা) জিজ্ঞেস করেছিলেন, হে আল্লাহর রসুল, ওহুদের চেয়ে আপনার জীবনে কি কোন কঠিনতর দুর্দিন এসেছে? প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছিলেন : তায়েফে আমার জীবনে সবচেয়ে কঠিন দুর্যোগের দিন এসেছিল।

মদীনায় হিজরতের পূর্বে হজ মওসুমে মক্কার আকাবাতে মদীনার বনী খাজরায ও বনী আউসের কিছু প্রধান ব্যক্তির সঙ্গে অতি গোপনে প্রিয়নবী (সা) মিলিত হন এবং তাদের বলেন : তোমরা আল্লাহর ইবাদত করবে। তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিফ করবে না। আল্লাহ ও তাঁর রসুলের কথা শুনবে ও মানবে, সুখে-দুঃখে আল্লাহর পথে ধন সম্পদ ব্যয় করবে। আল্লাহর আদেশ প্রচারে কোন নিন্দাকারীর নিন্দাকে পরোয়া করবে না। তোমাদের সঙ্গে সম্মিলিত হলে আমাদের সাহায্য করবে। যেভাবে তোমরা স্ত্রী, সন্তান ও নিজেদের রক্ষা কর ঠিক সেভাবে আমাকে রক্ষা করবে।

একজন জিজ্ঞেস করলেন : আপনার কথামতো ওই কাজগুলো করলে আমাদের কী লাভ হবে? প্রিয়নবী (সা) বললেন : জান্নাত। অর্থাৎ তিনি বুঝালেন যে, তোমরা ওইগুলো যথাযথভাবে পালন করলে জান্নাতপ্রাপ্ত হবে। প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের কথা শুনে তারা সবাই ইসলাম গ্রহণ করলেন। ইশা’আতে ইসলামের জন্য ইসলামের দাওয়াত মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য কী পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে, সে সম্পর্কে আল্লাহ জাল্লা শানুহু নির্দেশ দান করেছেন।

ইরশাদ হয়েছে : তোমার রব-এর পথে আহ্বান কর হিকমতের সঙ্গে এবং সুন্দর সুন্দর উপদেশ দ্বারা আর ওদের সঙ্গে আলোচনা কর সদ্ভাবে আলোচনার মাধ্যমে (সূরা লহল : আয়াত ১২৫)। এখানে লক্ষ্য করা যায়, আল্লাহর পথের দিকে মানুষকে আহ্বান করার তিনটি পন্থা অবলম্বনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আর তা হচ্ছে : হিকমত, সদুপদেশ ও সদ্ভাবে আলোচনা। ইসলামের উপস্থাপন পদ্ধতির এ তিনটি মাধ্যম অনুসরণ করার নীতি আমরা প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মাদুর রসুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের কাল থেকেই দেখে আসছি। প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বিভিন্ন সাম্রাজ্যের সম্রাটদের কাছে, বিধর্মী শাসনকর্তাদের কাছে ইসলামের দাওয়াত সংবলিত যে সমস্ত পত্র দিয়েছিলেন, সেসব পত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তাতে হিকমত, সদুপদেশ ও সদ্ভাব প্রস্ফুটিত হয়ে উঠেছে। সম্রাট হিরাক্লিয়াসের নিকট প্রেরিত চিঠিতে বলা হয় : বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম। প্রেরক : মুহাম্মদ, আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রসুল। প্রাপক : হিরাকল, মহান রোম সম্রাট। সালাম বর্ষিত হোক তাঁদের ওপর, যারা সত্য পথের অনুসারী।

অতঃপর আমি আপনাকে ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছি, ইসলাম গ্রহণ করে নিন, নিরাপত্তাপ্রাপ্ত হবেন। আল্লাহ আপনাকে দ্বিগুণ পারিশ্রমিক প্রদান করবেন। আপনি যদি অগ্রাহ্য করেন, তাহলে আপনার প্রজাকুলের পাপ আপনার ওপরই বর্তাবে।

হে আহলে কিতাব এসো আমাদের ও তোমাদের মধ্যে একটি ঐকমত্য হয়ে যাক যে, আমরা আল্লাহ ছাড়া কারও ইবাদত করব না, তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক করব না এবং আল্লাহকে বাদ দিয়ে কেউ কাউকে রব বলে গ্রহণ করব না। আর যদি তাঁরা একান্তই মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে বলে দাও, তোমরা সাক্ষী থেক, আমরা আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করেছি, আমরা মুসলিম।

এই একটি মাত্র চিঠির কথাগুলোর মধ্যে ইসলামের দিকে আহ্বান করার যে পদ্ধতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, তাতে হিকমত সৎ উপদেশ ও সদ্ভাবে আলোচনা আবেদন সবই লক্ষ্য করা যায়। এতে আরও লক্ষ্য করা যায়, প্রেরকের নাম ও পরিচয় এবং প্রাপকের নাম ও পরিচয় প্রথমে প্রদত্ত হয়েছে। চিঠি লেখার এ রেওয়াজও প্রিয়নবী (সা) প্রবর্তন করেন।

হিদায়েত শব্দটি অত্যন্ত ব্যাপক অর্থ বহন করে। হিদায়েত হচ্ছে সত্য পথ। হিদায়েত প্রাপ্তির মাধ্যমে আল্লাহ্্ তা’আলার রিয়ামন্দি ও নৈকট্য হাসিল করা সম্ভব হয়, দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ সাধিত হয়। আমরা সূরা ফাতিহা তিলাওয়াতের মাধ্যমে আল্লাহর মহান দরবারে এই আরজি পেশ করিÑ আমাদের সরল পথ প্রদর্শন কর, তাদের পথ, যাদের তুমি নিয়ামত দান করেছ। তাদের পথ নয়, যাদের প্রতি গযব নিপতিত হয়েছে এবং যারা পথভ্রষ্ট হয়েছে। এখানে উল্লেখ্য যে, আল্লাহর নিয়ামত প্রাপ্তগণের সর্বোচ্চ মকাম হচ্ছে আম্বিয়ায়ে কেরামের। তাঁর পর নবীগণের। উম্মতগণের মধ্যে রয়েছেন সিদ্দীকগণ, শহীদগণ ও সালেহগণ। কুরআন মজীদে ইরশাদ হয়েছে তারাই ওই সকল পুণ্যাত্মা, যাদের মহান আল্লাহ নিয়ামত ম-িত করেছেন, তাঁরা হচ্ছেন নবীগণ, সিদ্দীকগণ, শহীদগণ ও সালেহীন (সূরা নিসা : আয়াত ৬৯)। সিদ্দীকগণের ও সালেহীনের অন্তর্গত হচ্ছেন সাহাবায়ে কেরাম, আওলিয়ায়ে কেরাম ও মুত্তাকী দীনদারগণ। আর যাঁরা আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করতে করতে জান কুরবান করে দেন, তারাই শহীদ। ইশা’আতে ইসলামের কুরআনের নির্দেশ অনুযায়ী তিনটি পদ্ধতির নানা মাধ্যমে প্রয়োগ হয়ে আসছে যেমন : কলমের মাধ্যমে ওয়াজের মাধ্যমে, বাহাসের মাধ্যমে, খিদমতের মাধ্যমে, তা’লীমের মাধ্যমে। ইশা’আতে ইসলামের পাশাপাশি খিদ্মতে খাল্্ক সমান গুরুত্ব দিয়ে চালু হয়েছে।

কুরআন মজিদ ইরশাদ হয়েছে : ও হে তোমরা যারা ঈমান এনেছ! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে দোযখের আগুন থেকে রক্ষা কর (সূরা তাহ্্রীম : আয়াত ৬)।

ইশা’আতে ইসলাম নিজের গৃহ থেকেই সূচিত করতে হবে, এটি এই আয়াত দ্বারা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এখানে লক্ষণীয় যে, প্রিয়নবী (সা)-এর নবুয়াত লাভের পরপরই প্রথম ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন হযরত খাদীজাতুল কুব্্রা রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আন্্হা, হযরত আলী (রা) এবং হযরত যায়দ বিন হারীসা (রা)। এরা ছিলেন তাঁর পরিবার-পরিজনের অন্তর্গত। প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচারের যে নির্দেশ আল্লাহ তা’আলা প্রদান করেছিলেন তাতে ছিল নিকটতম আত্মীয়স্বজনের কথা। সূরা তাহ্্রীমের ৬ নম্বর আয়াতখানি সম্পর্কে হযরত উমর রাদিআল্লাহ তা’আলা আন্্হু প্রিয়নবী (সা) এর নিকট আরজ করেছিলেন : ইয়া রসুলুল্লাহ্্ নিজেদের দোযখের আগুন থেকে রক্ষা করার বিষয়টি বোধগম্য হয়, কিন্তু পরিবার-পরিজনকে কিভাবে দোযখের আগুন থেকে বাঁচাব? এ কথা শুনে প্রিয়নবী (সা) বলেছিলেন : আল্লাহ্্ তা’আলা যেসব কাজ করতে নিষেধ করছেন, সেসব কাজ করতে নিষেধ করবে এবং যেসব কাজ করতে আদেশ করেছেন, যেসব কাজ করতে আদেশ করবে।

প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ (সা) ঈশা’আতে ইসলামের যে পদ্ধতি স্থাপন করেন তা আল্লাহ্্ কর্তৃক প্রত্যাদিষ্ট। তিনি শিক্ষিত সাহাবায়ে কেরামকে বিভিন্ন জনপদে প্রেরণ করেন। ইসলাম প্রচার করতে যেয়ে তাঁকে ভীষণ বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হতে হয়েছে। দেশ ত্যাগ করতে হয়েছে, দান্দান শহীদ হয়েছে, কত সাহাবী শহীদ হয়েছেন, অনেকগুলো যুদ্ধে মোকাবিলা করতে হয়েছে, অতঃপর মক্কা বিজয় হয়েছে, ঘোষিত হয়েছে : সত্য এসেছে, মিথ্যা দূর হয়েছে, মিথ্যা দূর হবারই। ৬২৮ খ্রিস্টাব্দের হুদায়বিয়ার সন্ধি সম্পাদনের মধ্য দিয়ে শান্তির হাওয়া প্রবাহিত হয় আরব ভূখ-ে। সেই সময় দলে দলে লোক তাঁর কাছে এসে ইসলাম গ্রহণ করেন। হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা) ও হযরত আমর ইবনুল আস (রা) এই সময়েই ইসলাম গ্রহণ করেন। এই সময় তাঁর নির্দেশে সাহাবায়ে কেরামগণের মধ্য থেকে বহু সাহাবী বিভিন্ন দেশে ইসলামের দাওয়াত নিয়ে যান। জানা যায়, কোন কোন সাহাবী চীন সুমাত্রা অঞ্চলে আরব বণিকদের নৌজাহাজে করে যাবার পথে বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দরে সফর বিরতি করে এখানে কিছুকাল ইসলাম প্রচার করেন।

প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বিদায় হজের ভাষণের শেষ পর্যায়ে সকলের উদ্দেশে বলেন : যারা এখানে উপস্থিত আছ তারা শোন এবং যারা উপস্থিত নেই তাদের কাছে আমার বাণী পৌঁছে দিও। সেই নির্দেশের পথ ধরে ইসলাম প্রচারের গতিধারা অব্যাহত রয়েছে। আজ সমগ্র বিশ্বের জনগোষ্ঠীর প্রায় এক-চতুর্থাংশ মুসলিম। তারা সবাই উচ্চারণ করে : লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ।

[লেখক : অধ্যাপক হাসান আবদুল কাইয়ূম, পীর সাহেব দ্বারিয়াপুর শরীফ, উপদেষ্টা ইনস্টিটিউট অব হযরত মুহম্মদ (সা) সাবেক পরিচালক ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ]

Sunday, 4 January 2015

ফাতেহায়ে দোয়াজদাহম 
মিলাদুন্নবী-সিরাতুন্নবী (সা.)  

মসজিদে নববি ও মহানবী (সা.) এর রওজা শরিফ, ট্রাওসেট এনসাক্লোপেডিয়া (১৮৮৬-১৮৯১)

বিশ্বের বিস্ময়, নবী ও রাসূলদের সর্বশেষ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)। যাঁর গুণকীর্তনে হিন্দু, বৌদ্ধ, ইহুদি, খ্রিস্টান এমনকি কমিউনিস্ট-নাস্তিকরা পর্যন্ত পঞ্চমুখ; কাফের মোশরেক-জানের দুশমনরাও যাঁকে আল আমিন বা মহা সত্যবাদী আখ্যায় আখ্যায়িত করতে কুণ্ঠাবোধ করেনি; তাঁর সে শুভাগমনকে বিশ্ব বিবেক ক্ষণিকের তরেও ভুলতে পারে না। বছরের ৩৬৫ দিবসই যদি তাঁর পবিত্র মহামিলাদ বা জন্ম স্মরণ করা হয় তথাপিও রোজ কেয়ামত পর্যন্ত তাঁর প্রয়োজন ও গুরুত্ব বিন্দুমাত্র হ্রাস পাবে না। তাই তো সারা দুনিয়া প্রতি মুহূর্তে গেয়ে যাচ্ছে_ 'সাল্লু আলাইহি ওয়া সালি্লমু তাসলিমা।'

এ দিবসটি মুসলিম সমাজে ফাতেহায়ে দোয়াজদাহম নামে পরিচিত। 'ফাতেহায়ে দোয়াজদাহম' কথাটি ফারসি ভাষা থেকে আগত। দোয়াজদাহম মানে ১২, ফাতেহায়ে দোয়াজদাহম অর্থ হলো ১২ তারিখের ফাতেহা অনুষ্ঠান। কালক্রমে এ দিনটি মিলাদুন্নবী (সা.) নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে। এর অর্থ হলো নবী (সা.) এর জন্ম অনুষ্ঠান। ধীরে ধীরে এর সঙ্গে 'ঈদ' শব্দ যোগ হয়ে 'ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)' রূপলাভ করে। যার অর্থ হলো মহানবী (সা.) এর জন্মোৎসব। এ পর্যায়ে আরেকটি পরিভাষাও প্রচলিত হতে থাকে 'সিরাতুন্নবী (সা.)' অর্থাৎ নবী (সা.) এর জীবনচরিত বা জীবনী আলোচনা অনুষ্ঠান। এ দিবসে অনেকে জশনে জুলুস বা শোভাযাত্রা ও আনন্দ র‌্যালি করে থাকেন।

এ মহামানবের জন্মতারিখ নিয়ে সিরাত গ্রন্থ, জীবনীকার, ইতিহাসবেত্তা ও জ্যোতির্বিদদের মধ্যে বিস্তর মতপার্থক্য রয়েছে। তবে প্রায় সবাই এ বিষয়ে একমত যে, তাঁর জন্ম হয়েছিল রবিউল আউয়াল মাসের শুক্লপক্ষে সোমবার প্রত্যুষে বা ভোরে তথা ঊষালগ্নে। অধিকাংশ ইতিহাসবিদের মতে, সেদিন ছিল ৫৭১ খ্রিস্টাব্দের ২০ এপ্রিল। জ্যোতির্বিদদের হিসাব মতে, এ দিন ১, ২ বা ৮, ৯ অথবা ১০, ১১ রবিউল আউয়াল হওয়ার সম্ভাবনাই অধিক। আর তিনি ইহধাম থেকে চিরবিদায় নেন রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখ দ্বিতীয় সোমবার অপরাহ্নে বা গোধূলি লগ্নে। অনেকের মতে, নবীজি (সা.) শুক্রবার ১৭ রবিউল আউয়াল বসন্তের সুরভি ও অমিয় বারতা নিয়ে ধরাধামে শুভাগমন করেন এবং কৃষ্ণপক্ষের শেষ সোমবার ২৮ সফর পৃথিবীকে শূন্য করে চিরবিদায় নেন। তবুও তাঁর বেলাদাত ও ওফাত ১২ রবিউল আউয়াল প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। তদুপরি প্রিয় নবী (সা.) এর আগমন ও প্রস্থান একই দিনে একই সময়ে এ কথাও সর্বজন বিদিত। তাহলে এ দিনে জন্মোৎসব পালন করা হবে নাকি প্রস্থানের শোক পালন করা হবে? কথায় আছে_ সৃষ্টির জন্য যাঁদের সৃষ্টি, তাঁরা চির অমর। প্রিয় নবী (সা.) আজ দুনিয়ার বুকে নেই, সেটিই ভাববার বিষয়। যাই হোক, উৎসব বা শোক পালন বড় কথা নয়; আসল কথা হলো তাঁর জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা; কোরআন ও সুন্নাহ অাঁকড়ে ধরা; একমাত্র ইসলামকেই ইহকালীন শান্তি ও পরকালীন মুক্তির অনন্য পথ হিসেবে গ্রহণ করা। তবেই আমাদের এ আনন্দ ও বেদনা উভয়ই সার্থক হবে।

অতি পরিতাপের বিষয় যে, রবিউল আউয়াল মাস এলে আমরা আনুষ্ঠানিকতার আয়োজন করি। বাণী আর বিবৃতি প্রচার করি; কিন্তু ফরজ নামাজও নিয়মিত আদায় করি না, সুদ পরিত্যাগ করতে পারি না, ঘুষ ছাড়তে পারি না, মিথ্যা বর্জন করতে পারি না, লোভ-হিংসা-মোহমুক্ত হতে পারি না। এমন হয় কেন? তবে কি নবীপ্রেমের তাৎপর্য আমাদের অন্তরে স্থান পেয়েছে?

মানুষ সৃষ্টির উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর পরিচয় লাভ করা। নবী-রাসূল প্রেরণের লক্ষ্য হলো মানুষকে আল্লাহর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়া। তাই আল্লাহকে পেতে রাসূল (সা.) এর পথ অনুসরণ করতে হবে। অর্থাৎ রাসূল (সা.) যা যা করেছেন বা করতে বলেছেন, তা করতে হবে। আর যা করেননি বা করতে বারণ করেছেন তা বর্জন করতে হবে। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনের ঘোষণা_ 'যা দিয়েছেন তোমাদের রাসূল (সা.) তা ধারণ কর; আর যা থেকে বারণ করেছেন, তা থেকে বিরত থাক।' আরও বলা হয়েছে_ 'বলুন হে রাসূল (সা.), যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসবে, তবে আমার অনুকরণ করো; আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন।' হাদিস শরিফে আছে_ 'তোমরা কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ মোমিন হবে না, যতক্ষণ না আমি হবো তার কাছে তার পিতাপুত্র ও যাবতীয় সবকিছু থেকে প্রিয়।' এ আলোকে নিশ্চিত করে বলা যায়, রাসূল (সা.) এর প্রতি ভালোবাসা ঈমানের পূর্বশর্ত। আর এ ভালোবাসা তাঁর নির্দেশ পালন ও অনুকরণের মাঝেই প্রকাশ পাবে। আমরা যখন উৎসব বা দুঃখ প্রকাশ করি তখন কি আমরা সে প্রকৃত ভালোবাসা ও আনুগত্যের কথা চিন্তা করি?

হ্যাঁ, মিষ্টি খাওয়াও সুন্নত বটে! তবে কথা হলো আমরা বর্তমানে শুধু মিষ্টিজাতীয় সুন্নতগুলো পালনে অতিমাত্রায় যত্নশীল হয়ে পড়েছি। যেমন_ দুপুরে খাওয়ার পরে শোয়া, হাদিয়া গ্রহণ করা, দাওয়াত কবুল করা ইত্যাদি। কিন্তু কতগুলো সুন্নতের কথা আমরা একেবারেই ভুলতে বসেছি। যেমন_ হাদিয়া দেয়া, দুস্থ ও আর্তের সেবা করা, গরিব-দুঃখীর দেখাশোনা করা ও মানব কল্যাণের জন্য নিঃস্বার্থভাবে কাজ করা। উল্লেখিত বিষয়গুলো ছাড়াও আরও বহু বিষয় রয়েছে, যা রাসূল (সা.) করেছেন ও করতে বলেছেন; সেগুলো আমাদের জন্য সুন্নত এমনকি অনেকগুলো ফরজও বটে। কিন্তু আমরা সে সম্পর্কে উদাসীন। যা কিছু করি তাও কি পরিপূর্ণ করতে পারি? না; বরং শুধু যে কোনো একটা দিক নিয়েই আত্মপ্রসাদ লাভ করি। এমনকি ক্ষেত্রবিশেষ নিজের কর্মপরিধি বাড়ানোর পরিবর্তে অন্যসবার সমালোচনা করে তৃপ্তি লাভ করি। যার দরুন নিজের অসম্পূর্ণতা ও অন্যের অসহযোগিতার ফলে আমরা বাতিলের কাছে পরাভূত হই বারবার।

মিলাদ শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো জন্মলগ্ন বা জন্ম সম্পর্কে আলোচনা। আমাদের পরিভাষায় মিলাদ বলতে বুঝি, প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর জন্ম ও জীবনী আলোচনা এবং তাঁর প্রতি সালাত ও সালাম পেশ করা। এ প্রসঙ্গে কোরআনে কারিমে বর্ণিত হয়েছে_ 'নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা তাঁর রাসূল (সা.) এর প্রতি রহমত বর্ষণ করেন, ফেরেশতারা তাঁর প্রতি রহমতের দোয়া করেন; হে বিশ্বাসীরা তোমরা তাঁর প্রতি দরূদ পাঠ ও যথাযথরূপে সালাম পেশ করো।'

এ বিষয়ে অসংখ্য প্রবন্ধ-নিবন্ধ, কাব্যগ্রন্থ, পুঁথি-পুস্তক, গল্প-উপন্যাস, কল্পকাহিনী, ছড়া, ছন্দ, পদ্য, গান, লিখিত হয়েছে; লেখা হচ্ছে আরও বহু লিখিত হবে। এর তাৎপর্য, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অনেকভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, আরও হবে। তবুও এটা নিশ্চিত যে, সব ব্যাখ্যার সার ব্যাখ্যা, সব কথার সার কথা যাতে সবাই একমত যে, মিলাদুন্নবী (সা.) এর মূল শিক্ষা হলো একমাত্র কালিমা তাইয়েবা 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মোহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ'। আল্লাহ ভিন্ন উপাস্য নেই, মুহাম্মাদ (সা.) তাঁর প্রেরিত।' এ কালেমার গূঢ়ার্থ হাজারোভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে, তন্মধ্যে সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ অথচ অতি সংক্ষিপ্ত ও অতি নিখুঁত বিশ্লেষণ হলো ঈমানে মুজমাল_ 'বিশ্ব প্রভু আল্লাহর প্রতি আমি ঈমান আনলাম, তাঁর সব আদেশাবলি মেনে নিলাম।'

মোদ্দা কথা, মিলাদুন্নবী (সা.) এর আসল শিক্ষা হলো_ মহানবী (সা.) এর ২৩ বছরের ভালোবাসার, কঠোর সাধনার, দাঁতভাঙ্গা, রক্তঝরা, পরিপূর্ণ ও একমাত্র গ্রহণযোগ্য ধর্ম বা জীবনবিধান ইসলামকে পূর্ণাঙ্গরূপে সর্বস্তরে বাস্তবায়নের মাধ্যমে সব আল্লাহদ্রোহী শক্তিকে সম্পূর্ণভাবে পরাজিত করে শান্তির ধর্ম ইসলামকে সগৌরবে প্রতিষ্ঠা করা। আর এটাই নবী বা রাসূল প্রেরণের মূল উদ্দেশ্য; যা পবিত্র কোরআনে বাববার বিবৃত হয়েছে_ 'তিনি সে মহান প্রভু যিনি রাসূল প্রেরণ করেছেন, সঠিক পন্থা ও সত্য ধর্ম সহযোগে, যাতে সে ধর্মকে প্রকাশ করতে পারেন সবধর্মের শিখরে, যদিও কাফের-মোশরেকরা তা অপছন্দ করে।'

[লেখক : মুফতি শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী, সহকারী অধ্যাপক, আহ্ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম, ঢাকা]

মানবকল্যাণের সর্বশ্রেষ্ঠ অভিভাবক আল-কোরআন


এই ধরা পৃষ্ঠে মহান আল্লাহতায়ালা মানব জাতির ওপর যত দয়া করেছেন তার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ দয়া হলো- মহান প্রতিপালক মানব জাতির প্রতি বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মতো একজন নবী প্রেরণ করেছেন এবং আল-কোরআনের মতো একটি আসমানি কিতাব দান করেছেন। আর এই কোরআন বিশ্ববাসীকে দিয়েছে শান্তির ঠিকানা। আল-কোরআনের ভাষা-বিন্যাস বিশ্ব সাহিত্যের বিস্ময়কর সংযোজন ও এর প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো গ্রন্থ পৃথিবীর বুকে নেই। কোরআনের প্রতিটি শব্দ এমন এক অদৃশ্য চিত্র যা অন্তরকে সতেজ ও সজীবতা প্রদান করে এবং অন্তরের অসংলগ্নতা নিরাময় করে। জ্যোতিময় কিতাব আল-কোরআন চরম অন্ধকার যুগে নাজিল হলেও বিশ্বব্যাপী বাহ্যিক ও আত্দিক জ্যোতির বিচ্ছুরণ ঘটিয়েছে। পবিত্র কোরআন বিস্ময়কর, বিশ্বজনীন, চিরন্তন, সৎপথের নির্দেশক মহাগ্রন্থের নাম। যেটি পূর্ণাঙ্গরূপে মুখস্থ করেছেন এমন প্রায় চার কোটিরও বেশি কোরআনের হাফেজ বর্তমানে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে আছেন। এবং উচ্চারণ, বিন্যাস, বাগধারা, পরিভাষা প্রভৃতি সুদীর্ঘ চৌদ্দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে সারা পৃথিবীতে সম্পূর্ণ অবিকৃত অবস্থায় বিদ্যমান রয়েছে। শিল্পী, সাহিত্যিক, কবি, দার্শনিক, বিজ্ঞানীদের বিস্ময় সৃষ্টি করে দেয় এ কিতাব।

এর মধ্যে রয়েছে বিশ্বের অনন্ত রহস্যসমূহ যে রহস্যের জাল চিহ্নিত করা কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। এটি বিজ্ঞানের অফুরন্ত ভাণ্ডারে সঠিক পথের দিশারী। অসীম প্রভুর মুক্তবুদ্ধিতে বিভাসিত লাউহে মাহফুজ থেকে প্রত্যাগত ভাষা নৈপুণ্য বাক্য বিন্যাসে বিশ্বের চিরবিস্ময়। যে একে সম্মানিত করবে সে নিজে সম্মানিত হবে। এর প্রতিটি আয়াত এক একটি তলোয়ার, যা দিয়ে প্রতিটি বিপদ মুসিবত মোকাবিলা করা সম্ভবপর। শব্দ চয়ন ও বাক্য বিন্যাস মহান আল্লাহ নিজেই করেছেন। তাই তো এর শ্রোতাকে দ্রুত বিমোহিত করে ও প্রভাব বিস্তার করে। ভাষার পাণ্ডিত্য অকল্পনীয়। তাই বড় বড় ভাষা বিজ্ঞানীর মাথা হেঁট হয়ে যায়। বিজ্ঞানীদের জন্য একটি বিশাল বিজ্ঞান সংস্থা, আইনবিদদের জন্য আইন বিশ্বকোষ এবং বিচার-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক নীতিমালা প্রতিষ্ঠা এর অপূর্ব বৈশিষ্ট্য। আল-কোরআন এমনই এক তুলনাহীন মহাগ্রন্থের নাম, যা সারা বিশ্বে মুদ্রিত ও প্রকাশিত হয়েছে অথচ একটি শব্দেরও পরিবর্তন হয়নি। এতে দেওয়ানি, ফৌজদারি, রাজস্ব, কৃষি, শিল্প, ব্যবসা, উপাসনা, ধর্মীয় বিশ্বাস, পারস্পরিক শিষ্টাচার প্রভৃতি বিষয়ে অসংখ্য বিধান উপস্থাপন করে বিশ্বজনীন সংবিধানের একমাত্র দাবিদার।

পবিত্র আল-কোরআন জীবন গ্রন্থ। কেননা এর অভ্যন্তরীণ প্রাণশক্তি কখনো নিঃশেষ হয় না। বিধায়, আল্লাহ ও বান্দার মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি হয়।

[মাওলানা সেলিম হোসাইন আজাদী,সিলেট ১০ নং ওয়ার্ড, কলাপাড়া হাজী মো. কছির মিয়া জামে মসজিদ মাঠে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি 14 বার্ষিক তাফসিরুল কোরআন মাহফিলে প্রধান অতিথির বক্তব্যের অংশবিশেষ।]