Tuesday, 3 February 2015

আলিফ বাতে আব্বা। আলিফ মিমে আম্মা। এই পৃথিবীর সবচেয়ে প্রিয় সবচেয়ে মধুর নাম্মা।জ্ঞান-আলোর উত্স আলিফের আল্লাহ। মা আমিনার মিম থেকে মুহাম্মদের বিচরণ হলে মুসলিম হচ্ছে মুহাম্মদী সুইচের একেকটি বাল্ব। আম্মা, আমিনা, মুহাম্মদ, মুসলিম। শব্দগুলো মিম হরফের ছন্দে গাঁথা। ভরা ছন্দের গন্ধে মাখা এ জগতের সবচেয়ে বড় ছান্দসিক হচ্ছেন মমতাময়ী মা। মায়ের ছন্দে ছন্দায়িত হয় মানবশিশু। তাই তো মা আমিনার মুখের ভাষায় ওহি বয়ে জিব্রিল আসে হেরা গুহায়। মুহাম্মদের মিমের মাতম ঐশী আলো বিলিয়ে বেড়ায়। মায়ের ভাষার ধারক-বাহক ঐশী আলোর ধারক-বাহক দুটোই হচ্ছে মুসলমান। মহান মা’বুদ মায়ের ভাষাকে কতটা প্রাধান্য দিয়েছেন কোরআনে চোখ বুলানো যাক— ওয়ামা আরসাল্নামির রাসুলিনইল্লাবিলীসানি কাওমিহিলিউ বাইয়িনা লাহুমসুরা ইবরাহিম, ৪ নম্বর আয়াতের প্রথম অংশ। ভাবতরজমা : ‘প্রত্যেক নবী-রাসুলের কাছেই আমরা যে উপদেশ বাণী পাঠিয়েছি সে বাণী পাঠিয়েছি তাঁর মমতাময়ী মায়ের ভাষায়। যেন সে ষ্পষ্ট করে আমাদের উপদেশ বাণী স্বজাতিকে বুঝিয়ে বলতে পারে।’এই মানবগ্রহের সৃষ্টিলগ্ন থেকে মা’বুদ যত নবী-রাসুল মনোনীত করেছেন সবাইকেই তিনি বাণী প্রেরণ করেছেন। কারও জন্য প্রেরণ করেছেন ছোট বাণী। কাউকে দান করেছেন বড় বাণী। সবার জন্যই মা’বুদ মনোনীতজনের মায়ের ভাষাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। কারণ পৃথিবীর যে-কোনও শিশু মাতৃকলি থেকে ফুল হয়ে ফোটার পরে মাতৃজমিনে মায়ের ছায়ায় বেড়ে ওঠে। মায়ের স্নেহ আদর আর বুকভরা ভালবাসা শিশুর জীবনের প্রথম সবক। সব শিশুর মা জননী মানব শিশুর প্রথম গুরু। মাতৃগুরুর শিশু শিষ্য মাকেই বোঝে বেশি। খুঁজে ফেরে মাকেই। অনুসরণ করে মায়ের কথা বলা, মায়ের হাঁটাচলা। মা গুরু যে ভাষায় কথা বলেন শিশু শিষ্যকে তাই শেখান। (‘রাব্বি জিদনি ইলমা’। হে রব তুমি জগতের জ্ঞান বাড়িয়ে দাও।) মাতৃগুরুর জ্ঞান এবং মাতৃভাষায় বেড়ে ওঠে শিশু শিষ্য মানুষ। তাই তো মায়ের ভাষা প্রতিটি মানবের হূদয়ে খুশির ঝরনা ঝরায়।মানবজগতের মানবজাত দুনিয়ার জীবন কাটিয়ে দেয় মায়ের ভাষায় বলতে বলতে চলতে চলতে। আমাদের মা’বুদ রাব্বানা সপ্ত আসমান সপ্ত জমিনে যা কিছু রয়েছে সবকিছুর পালনকর্তা। সর্বপ্রাণীর রিজিকদাতা। সব বিষয়ের মঙ্গলকামী। যুগে যুগে তিনি তাই জগতের মঙ্গলের জন্য এ জগত্ থেকেই মানবদূত মনোনয়ন করেন। যে মানবদূত মা’বুদের মঙ্গলবার্তা পৌঁছে দেবে মানবের ঘরে ঘরে। আমাদের মা’বুদের কী দয়া। তিনি মনোনীত দূত বান্দাকে বান্দার মাতৃভাষায় বার্তা পৌঁছান। যেন তাঁর বুঝতে কষ্ট না হয়। সে যেন মা’বুদের বার্তা জনে-জনে পৌঁছাতে পারে খুব সহজে। মানুষ যেন মা’বুদকে কখনও ভুলে না যায়। মা’বুদের বাতলানো পথে মানুষ জীবন ধারণ করে তারা যেন পরকালের আনন্দ আশ্রমে স্থান করে নেয়। কালের পরিবর্তনে মা’বুদের চিরসুন্দর ধর্মের বাঁক বদল করে দিয়েছে আজকের ধর্মবিদরা। তারা সহজ ধর্মকে কঠিন করে তৈরি করে দিয়েছে কাঠিন্যময় দুনিয়া। যাকে ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না। সেটাই যেন আজকের দুনিয়ার ধর্ম। মসজিদ, মন্দির, প্যাগোডার খাঁচায় বন্দি ধর্ম কেঁদে ফেরে। আজকের জগতের ধর্মবিদরা কেউ পাঁচবেলা, কেউ দুবেলা, কেউ সপ্তাহান্তে এসব খাঁচার তালা খুলে দিলে মানুষ উদযাপন করে ধর্মানুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে বন্দি আনুষ্ঠানিক ধর্ম আজ মানুষকে সহজ জীবনের সহজ পথে টানতে পারছে না। বাতলাতে পারছে না চিরসুখের ঠিকানা। গোটা দুনিয়া আজ নকল সুখে সয়লাব।নকল রং করা মানুষ চুল রাঙিয়ে, দাড়ি রাঙিয়ে সংসেজে চিরসুখ বিলি করছে মা’বুদের ভাষায়, মাবুদের নামে। তারা বলছে মাবুদের আরবি ভাষায় জবান না খুললে তোরা কীভাবে সামলাবি কবরের আরবি ভাষার সোয়াল-জোয়াব? হায়রে রঙের দুনিয়ার রঙ করা অভাগা মানুষ! মা’বুদ তোকে খোদার রঙে রঙিন হতে বলেছে। খোদার আরবি ভাষায় বলীয়ান হতে বলেনি। আরবি ভাষা ছিল আমাদের প্রেমের নবী মেহনতি মানুষের নবীর মায়ের ভাষা। সেই ভাষাকে খোদা মর্যাদাবান করেছেন ওহি বাণী প্রেরণ করে। প্রেমের নবী যেন তার মাতৃভাষায় খুব সহজে খোদার পরিচয় মানবসমাজে উপস্থাপন করতে পারেন। যদি দয়াল নবী বাংলাভাষী হতেন, তাহলে তিনি নিশ্চয়ই মা’বুদের কাছ থেকে বাংলা ভাষায় ওহি-বাণী অর্জন করতেন। কেননা মা’বুদ তো মায়ের ভাষাকেই প্রাধান্য দেন। মায়ের ভাষাই বান্দার জন্য উত্তম ভাষা। বাংলাভাষী মুসলমানকে আরবিভাষী মুসলমান বানাতে চেয়ে মুসলমান আজ পথহারা পথিক। মাতৃভাষায় মা’বুদের শেষ ওহি বাণী কোরআন পাঠ করতে না পেরে তারা ‘নুরুন আলানুর’ আলো থেকে আলোর প্রজ্বলন বঞ্চিত জাতিতে পরিণত হয়েছে। দেশে-দেশে মুসলমানরা যদি মায়ের ভাষায় ‘ইকরা বিসিম রাব্বি কাল্লাজি খালাক’ (তোমার প্রেমময় মা’বুদের নামে পড়) পড়ত, শিখত— তাহলে তারাই হতো আল কোরআনের একেকজন গবেষক। মুসলমান সপ্ত আসমান, সপ্ত জমিনের গবেষণা করে কোরআনের গবেষণামূলক আয়াতগুলোর রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারত। মহামূল্যবান খনিজসম্পদরাজি, আসমানের গায়েবি সম্পদরাজি, ওহির বীজতলা কালব সম্পদরাজি। এসবেরই সূক্ষ্ম সূত্র লুকিয়ে রয়েছে মা’বুদের প্রেমময় বাণী কোরআনে।কোরআনহারা মুসলমান আজ রং করা এক পেখমতোলা ময়ূরীর জীবনযাপন করছে, যা মুহাম্মদের মিমের আলোর সুইচ থেকে বিচ্ছিন্ন। মুহাম্মদী সুইচ আত্মায় বসাতে না পারলে লাইলাহার চির আলোর সন্ধান পাবে না কেউ। মুহাম্মদের মিম। মা আমিনার মিম। মুসলমানের মিম। তিন মিমের পদতলে বেহেশত লুটায়। চোখটি খুলেই দেখি কাকে? মাকে আমার মাকে। সেই মাকে মায়ের ভাষাকে ভালবাসলেই বেহেশত কামনা করা যায়। কেননা মায়ের ভাষায় আলিফের আল্লাহ এবং মিমের মুহাম্মদকে জানা যতটা সহজ, আরবি ভাষায় জানা বাঙালি মুসলমানের জন্য ততটাই দুর্বোধ্য। তাই পেখমতোলা ময়ূরীর দল যেদিন থেকে কোরআনের বুলি মায়ের ভাষায় আওড়াতে পারবে, সেদিনই তাদের রং করা নকল পালক খসে পড়ে মা’বুদের রঙের পালক গজাবে। লাইলাহার এই দুনিয়ায় মিমের আলো জ্বলে মায়ের ভাষায় বেহেশতি সুখজোছনা হয়ে গলে।

লেখক : খইয়াম মাজহারী, ধর্মচিন্তাবিদ

Monday, 2 February 2015

দৈনন্দিন জীবনে মাতৃভাষাচর্চা 


আল্লাহ তাআলা মানুষকে কথা বলা, পড়া ও শেখার জন্য বোধগম্য ও জ্ঞানপূর্ণ আলোকিত ভাষা দিয়েছেন। মহান সৃষ্টিকর্তা মাতৃভাষাকেই শিশুর আত্মার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে গেঁথে দেন। শৈশবে মাতৃক্রোড়ে প্রথম মানবসন্তানের মুখে ফুটে ওঠে ‘মা’ শব্দটি, তা-ই মাতৃভাষা, প্রাণের ভাষা। হূদয়ের ব্যক্ত-অব্যক্ত সব লৈখিক বা মৌখিক ভাষার বহিঃপ্রকাশ দৈনন্দিন জীবনে মায়ের ভাষায় ঘটে থাকে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘পরম করুণাময় (আল্লাহ), তিনিই কোরআন শিক্ষা দিয়েছেন। তিনিই মানুষ সৃষ্টি করেছেন। তিনিই তাকে ভাব প্রকাশ করতে বা কথা বলতে (ভাষা) শিখিয়েছেন।’ (সূরা আর-রাহমান, আয়াত: ১-৪)জ্ঞান-বিজ্ঞান, ভাষা-সাহিত্য, শিল্প-সংস্কৃতি, মেধা-মনন, সুপ্ত প্রতিভা, সৃজনশীলতা ও চিন্তাচেতনায় মানবজাতি যে গৌরবময় অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে, তার মুখে রয়েছে স্রষ্টাপ্রদত্ত বাক্শক্তি বা মাতৃভাষা। পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের মানুষের যেকোনো ভাষায় কথা বলা তার স্বভাবজাত, জন্মগত, সর্বজনীন ও আল্লাহপ্রদত্ত মানবাধিকার। পরিবেশ, পরিস্থিতি ও অবস্থাভেদে প্রয়োজনীয় কথা বলার ধরন, প্রকার ও বিন্যাস বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে। মানুষ সবাক প্রাণী। তার বাগ্যন্ত্র ও মাতৃভাষার ব্যবহার যত সুন্দর ও যথার্থ হবে; ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে শান্তিশৃঙ্খলা এবং নিয়মানুবর্তিতা ততই পরিলক্ষিত হবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় কথা বলা বা ভাষা ব্যবহারের সময় সবার সজাগ-সচেতন থাকা উচিত। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা দিয়েছেন, ‘কথায় কে উত্তম ওই ব্যক্তি অপেক্ষা, যে আল্লাহর প্রতি মানুষকে আহ্বান করে, সৎ কর্ম করে এবং বলে, “আমি তো আত্মসমর্পণকারীদের অন্তর্ভুক্ত।”’ (সূরা হা-মীম আস-সাজদা, আয়াত: ৩৩) মানুষের সঙ্গে পারস্পরিক আলোচনায় যেসব কথা বলা হবে, তা উত্তম ভাষা ও জ্ঞানসমৃদ্ধ হওয়া বাঞ্ছনীয়। কথা যেন জনকল্যাণকামী ও চমকপ্রদ হয়, মাতৃভাষার মাধুর্য দ্বারা নিজের ও অন্যের উপকার হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বক্তৃতা ও বাচনভঙ্গি ছিল অতুলনীয়। তিনি বিশুদ্ধ মাতৃভাষার অধিকারী ছিলেন। তাই বিনম্র কণ্ঠে শুদ্ধ কথা সবারই প্রিয়। ইসলামে নরম স্বরে সহজ-সরল ও বিশুদ্ধ ভাষায় কথা বলার দিকনির্দেশনা রয়েছে। পবিত্র কোরআনে বুদ্ধিমত্তা, উত্তম বাক্য ও ভাষা দ্বারা ইসলাম প্রচারের আহ্বান জানিয়ে বলা হয়েছে, ‘তুমি মানুষকে তোমার প্রতিপালকের পথে প্রজ্ঞা ও সদুপদেশ দ্বারা আহ্বান করো এবং তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে আলোচনা করো।’ (সূরা আন-নাহল, আয়াত: ১২৫) জনসমাবেশে বা মজলিসে উপবিষ্ট হয়ে এমন ভাষায় কথা বলা যাবে না, যাতে অন্যের তিরস্কার প্রচ্ছন্ন আছে এবং যা অন্যের মর্যাদার জন্য হানিকর। বরং মানুষের কথাবার্তা ও ভাষার প্রয়োগ এমন হূদয়গ্রাহী ও মনোমুগ্ধকর হওয়া উচিত, যা সঠিক, মার্জিত, রুচিসম্মত ও ভারসাম্যপূর্ণ। পরিবার, সমাজ ও জাতির অধিকাংশ সদস্য যদি সাবলীল ভাষা প্রয়োগের দিকে বিশেষ খেয়াল রাখে, তাহলে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব-কলহ, ঝগড়া-বিবাদ, সংঘাত-সংঘর্ষ, হিংসা-বিদ্বেষ, পরচর্চা-পরনিন্দা ও প্রতিশোধপ্রবণতা বহুলাংশে লোপ পাবে এবং মানুষের মধ্যে অযথা শত্রুতা সৃষ্টি হবে না। পবিত্র কোরআনে এমন শুভদ শিক্ষা দিয়ে বলা হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সঠিক কথা বলো। তাহলে তিনি তোমাদের কর্মকে ত্রুটিমুক্ত করবেন এবং তোমাদের পাপ ক্ষমা করবেন।’ (সূরা আল-আহজাব, আয়াত: ৭০-৭১)দৈনন্দিন জীবন পরিচালনায় নরম, বুদ্ধিদীপ্ত ও প্রাণস্পর্শী কথা বলা উচিত। মাতৃভাষায় বাক্যালাপের মাধ্যমে স্বজাতির সঙ্গে নর-নারীর ভাবের আদান-প্রদান হয়। সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নার প্রতিটি মুহূর্ত ভাগাভাগি করা যায়। তাই মানুষ যখন কথা বলবে, তখন সুস্পষ্ট উচ্চারণে আস্তে আস্তে বলবে। অযথা চিৎকার করে মাত্রাতিরিক্ত কথা বলা নির্বুদ্ধিতার পরিচায়ক। পবিত্র কোরআনে সাবধান করা হয়েছে, ‘তুমি সংযতভাবে পদক্ষেপ করবে এবং তোমার কণ্ঠস্বর নিচু করবে! কেননা, স্বরের মধ্যে গর্দভের স্বরই সর্বাপেক্ষা অপ্রীতিকর।’ (সূরা লুকমান, আয়াত: ১৯)মানুষ যে মাতৃভাষা বা কথা মুখ থেকে বের করে, এর ওপর আল্লাহর ফেরেশতারা সাক্ষী থাকেন। মানুষ যখন একটি মিথ্যা কথা মুখে উচ্চারণ করে, তখন তার কাঁধের ফেরেশতাদ্বয় তার কাছ থেকে দূরে সরে যায়। তাই মানুষকে সতর্ক করে বলে দেওয়া হয়েছে, ‘মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তা লিপিবদ্ধ করার জন্য তৎপর প্রহরী তার সন্নিকটেই রয়েছেন।’ (সূরা কাফ, আয়াত: ১৮)এ জন্য প্রত্যেক মানুষের উচিত মুখ থেকে বেফাঁস কোনো কথা বের করার আগে এর পূর্বাপর সব দিক চিন্তাভাবনা করা। গুরুজনেরা যথার্থই ধর্মের উপদেশবাণী প্রচার করে বলেন, ‘সদা সত্য কথা বলিবে, কখনো মিথ্যা বলিও না।’ মানুষকে মাতৃভাষা দান করা হয়েছে সঠিক মনোভাব প্রকাশের জন্য। এর জন্য প্রথমে কথাবার্তার উদ্দেশ্য ও অর্থ নির্ণয় করা এবং যথার্থতা প্রতিপন্ন করা প্রয়োজন। এরপর উত্তম ও উপযোগী পন্থায় মনের ভাব প্রকাশ করা উচিত। এটাই হচ্ছে নিরর্থক ও মিথ্যা বাক্যালাপ থেকে বেঁচে থাকার সহজ উপায়।দৈনন্দিন জীবনে মিথ্যাচারিতা, অপবাদ, দোষারোপ, কলঙ্ক রটানো, অসাক্ষাতে নিন্দা ও প্রতারণামূলক অন্যায় কার্যকলাপ কমবেশি প্রায়ই ঘটছে। বাক্যালাপে সদাচার ও মিথ্যাচার উভয়ই মানুষের ভেতর তথা মনোভাব ও অভিব্যক্তির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে সম্পর্কযুক্ত। মানুষের কথাবার্তা, কাজকর্ম, ভাষার ব্যবহার ও আচার-আচরণে এগুলো প্রকাশ পায়। তাই ইসলামের দৃষ্টিতে বাক্যালাপে প্রকাশ্যে বা গোপনে কথায় কাজে ভারসাম্যপূর্ণ মাতৃভাষা ব্যবহার ও প্রয়োগে সামঞ্জস্য থাকা দরকার।

© ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক, গবেষক ও কলামলেখক।
dr.munimkhan@yahoo.com

Sunday, 1 February 2015

ধর্ম নিয়ে তামাশা করা ঠিক নয়

ফ্রান্সের পত্রিকা শার্লি হেবদো ইসলামসহ বিভিন্ন ধর্ম নিয়ে ব্যঙ্গ করার জন্য পরিচিত। শুধু একবার নয় বহুবার এ পত্রিকার কার্টুনিস্টরা ধর্ম ও নবী-রাসূলদের নিয়ে ব্যঙ্গ করেছে। এটা নাকি তাদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা। একটি বা একাধিক ধর্মকে নিয়ে কৌতুক ও বিদ্রুপ করা এবং কোটি কোটি মানুষের ধর্ম বিশ্বাস ও ধর্মীয় শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি ও মহাপুরুষদের নিয়ে ক্যারিকেচার ও কার্টুন আঁকা কী ধরনের মত প্রকাশের স্বাধীনতা যা বিবেকবান মানুষের জন্য অসহ্য ও বেদনাদায়ক, এমন প্রশ্ন আসতেই পারে। কোনো ধর্মেই অন্য ধর্মের প্রতি অবজ্ঞা বা তাচ্ছিল্য করার অনুমোদন নেই। বরং তা অপরাধ হিসেবে গণ্য।

শার্লি হেবদো মহানবী (সা.)-এর কার্টুন একে বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর হৃদয়ে আঘাত দিয়েছে। তারা বিশেষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে এ ন্যক্কারজনক কাজ করে যাচ্ছে। অথচ প্রগতিশীল বিশ্ব তাদের এ কাজকে নিন্দা না জানিয়ে প্যারিসের কার্যালয়ে ৭ জানুয়ারি হামলার ঘটনাকে জঙ্গি তৎপরতা বলে পত্রিকার কার্টুনিস্টদের উৎসাহিত করেছে। ফলে দেখা গেল পত্রিকাটির নতুন সংখ্যাটি ছাপা হয়েছে ৩০ লাখ। যেখানে তাদের নিয়মিত প্রচার সংখ্যা ৬০ হাজার এবং নতুন সংখ্যার প্রচ্ছদে আবারও মহানবী (সা.)-এর কার্টুন ছেপেছে। এর শিরোনাম হিসেবে লেখা রয়েছে, ‘সবকিছু ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে।’

ইহুদি কার্টুনিস্টদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ এ আচরণ মুসলমানদের জন্য চরম অবমাননাকর ও উসকানিমূলক। আমরা এর তীব্র নিন্দা জানাই। তাদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই যত দিন মুসলিম জাতি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা.)-এর নির্দেশিত পথে থাকবে ততদিন এ জাতি পরাজিত হবে না। মহানবী (সা.)-এর মর্যাদা এতই ওপরে যে সামান্য কার্টুনে তা ক্ষতিগ্রস্ত করা যাবে না।

ধর্ম নিয়ে তামাশা করার অধিকার কারও নেই। ইসলাম শান্তির ধর্ম। পারস্পরিক সহাবস্থান, সহমর্মিতা ও সহনশীলতার ধর্ম। এ ধর্মের নির্দেশ হল, ‘লাকুম দ্বীনুকুম ওয়ালিয়া দ্বীন।’ অর্থাৎ তোমার ধর্ম তোমার কাছে আর আমারটা আমার। (সূরা কাফিরুন, আয়াত-৬) তাছাড়া আল কোরআনে সূরা আল বাকারার ২৫৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেছেন, ‘ধর্মের ব্যাপারে কোনো জোর-জবরদস্তি নেই।’ মুসলমানদের উচিত আল কোরআনের এসব নির্দেশ পরিপূর্ণভাবে অনুসরণের মাধ্যমে বিশ্বময় শান্তির পরিবেশ গড়ে তোলা। মুসলমানের নামে যে অপবাদ, দুর্নাম ও ভীতি বিশ্বময় ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে তা দূর করার মাধ্যমে ইসলামের অপূর্ব সৌরভ ও গৌরব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা জরুরি।

ইসলাম শুধু মুসলমানদের জন্য সুখ, শান্তির ব্যবস্থা করেনি, বরং জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষকে সুস্থভাবে, নিরাপত্তার সঙ্গে বাঁচার নিশ্চয়তা বিধান করেছে। যদি কোনো অমুসলিমের প্রতি জুলুম করা হয়, তাহলে স্বয়ং রাসূল (সা.) জালেমদের বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে অভিযোগ করবেন বলে হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে।

তাছাড়া অমুসলিম কিতাবধারীদের (ইহুদি ও খ্রিস্টান) প্রতি উত্তম ব্যবহারের নির্দেশ আল কোরআনে দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে অমুসলিম কিতাবধারীদের সঙ্গে তর্ক-বিতর্ক করবে না, করলে করবে উত্তম পন্থায়, তবে তাদের সঙ্গে নয় যারা তাদের মধ্যে বে-ইনসাফ, এবং বল আমাদের প্রতি ও তাদের প্রতি যা নাজিল করা হয়েছে তাতে আমরা বিশ্বাস স্থাপন করেছি। আমাদের উপাস্য ও তোমাদের উপাস্য একই এবং আমরা তারই আজ্ঞাবহ। (সূরা : আন কাবুত, আয়াত-৪৬)

এই আয়াতে ইসলামের অহিংস ও শান্তির বার্তা পরিপূর্ণরূপে প্রকাশ করা হয়েছে। যা প্রমাণ করে ইসলামের মতো উদার ও শান্তিপ্রিয় ধর্ম আর নেই। আয়াতের মর্মার্থে এটাই বুঝানো হয়েছে মুসলিম-খ্রিস্টান-ইহুদি ভাই ভাই, কারও সঙ্গে কারও কোনো ঝগড়া বিবাদ নেই।

সাম্যের ভিত্তিতে শ্রেণিবৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জাতি, ধর্ম, সাম্প্রদায়িকতা ও বর্ণবৈষম্যের ঊর্ধ্বে থেকে মানবিক মূল্যবোধকে প্রাধান্য দিতে হবে। এর অভাবে শুরু হয় মানুষের মধ্যে হানাহানি, কাটাকাটি, মারামারি। আজকের বিশ্বে যা নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। এসবের অবসান করে মহানবী (সা.) বিদায় হজের ভাষণে বলেছেন, ‘হে মানবমণ্ডলী! তোমাদের রব একজন। তোমাদের আদি পিতা একজন। প্রত্যেকেই আদমের সন্তান। আর আদম মাটির তৈরি। আল্লাহতায়ালা পারস্পরিক পরিচিতির সুবিধার্থে বিভিন্ন সমাজ ও গোত্রে তোমাদের বিভক্ত করেছেন। আরবের ওপর যেমন অনারবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই, তেমনি অনারবের ওপর কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই আরবের। একইভাবে শ্বেতাঙ্গের ওপর কৃষ্ণাঙ্গের আর কৃষ্ণাঙ্গের ওপর শ্বেতাঙ্গের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব বা বৈশিষ্ট্য নেই। শ্রেষ্ঠত্ব, বৈশিষ্ট্য ও মর্যাদার একমাত্র ভিত্তি হল তাকওয়া তথা আল্লাহর আনুগত্যের মধ্যে।’

মুসলিম উম্মাহ আল্লাহর নির্দেশ যথাযথ অনুসরণ করলে ইসলামের বিজয় একসময় হবে এটা নিশ্চিত। জ্ঞান ও উত্তম আদর্শের বলেই সে বিজয় সূচিত হবে। আদর্শ বিচ্যুত হলে কিংবা আবেগতাড়িত অবিবেচনাপ্রসূত কাজ সে বিজয়কে বাধাগ্রস্ত করবে। মনে রাখতে হবে প্রত্যেক জাতি ও ধর্মাবলম্বীর রয়েছে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও আদর্শ। বহুধাবিভক্ত সমাজ ব্যবস্থায় বহুদল-উপদল ও নানা মতের মানুষ থাকতে পারে। এক্ষেত্রে সংঘাত ও বাড়াবাড়ির কোনো সুযোগ নেই। রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘সাবধান! ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি ও সংঘাতের পথ বেছে নিও না। এই বাড়াবাড়ির ফলেই অতীতে বহু জাতি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে।’

তাই মুসলিম জাতিকে শিক্ষা-দীক্ষায় উজ্জীবিত হতে হবে। ইসলামের মূল বাণী উপলব্ধি করতে হবে। সে লক্ষ্যে সুফিবাদের জ্ঞান চর্চা বাড়াতে হবে। কেননা সুফিগণ সর্বাবস্থায় মানবতাবাদ ও শান্তির পক্ষে কাজ করে যাচ্ছেন। ইসলামের পূর্ণ অনুসারী হিসেবে তারা হিংসা, বিদ্বেষ, হানাহানি, লোভ-লালসা, ভোগ-বিলাস, দখলদারিত্ব ভুলে পরস্পর প্রেম-ভালোবাসার বন্ধন গড়তে আগ্রহী। তাদের দৃষ্টিতে হিন্দু-মুসলিম, বৌদ্ধ-খ্রিস্টান কোনো বৈষম্য নেই। তারা মানুষকে মানুষ হিসেবে গণ্য করেন। সব ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, শ্রেণী, গোষ্ঠীর মানুষকে সমান দৃষ্টিতে দেখে। তারা নিজের স্বার্থ ভুলে মানুষের হিত সাধনে ব্রত।

বর্তমানে দেশ-বিদেশে সর্বত্র ইসলামের ছত্রছায়ায় যে সন্ত্রাস-নৈরাজ্য সৃষ্টি করে ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে এবং ইসলামের দুর্নাম বিশ্বময় ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে, তা থেকে মুক্তির লক্ষ্যে সুফি সমাজকে সামনে এগিয়ে আসার সুযোগ করে দিতে হবে। ইসলামের প্রকৃত অনুসারী, শান্তির ধারক-বাহক সুফিদের যথাযথ মূল্যায়নের মাধ্যমে সমাজ, রাষ্ট্র ও বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। 

লেখক : সৈয়্যেদ নূরে আখতার হোসাইন, প্রাবন্ধিক, ইসলামী চিন্তাবিদ ও গদিনশীন পীর, দরবারে আউলিয়া সুরেশ্বর দ্বায়রা শরীফ, E-mail : ahmadinurisds@gmail.com, intlmoonsighting@gmail.com