Friday, 28 March 2014

বাবুই পাখিরে ডাকি,বলিছে চড়াই,
“কুঁড়ে ঘরে থাকি কর শিল্পের বড়াই,
আমি থাকি মহা সুখে অট্টালিকা পরে
তুমি কত কষ্ট পাও রোধ, বৃষ্টির, ঝড়ে৷”

বাবুই হাসিয়া কহে, “সন্দেহ কি তায়?
কষ্ট পাই, তবু থাকি নিজের বাসায়৷
পাকা হোক, তবু ভাই, পরের ও বাসা,
নিজ হাতে গড়া মোর কাঁচা ঘর, খাসা৷”
                                                                                                                                    [রজনীকান্ত সেন]

স্বাধীনতা, উলঙ্গ কিশোর

জননীর নাভিমূল ছিঁড়ে উল্ঙ্গ শিশুর মত
বেরিয়ে এসেছো পথে, স্বাধীনতা, তুমি দীর্ঘজীবী হও।
তোমার পরমায়ু বৃদ্ধি পাক আমার অস্তিত্বে, স্বপ্নে,
প্রাত্যহিক বাহুর পেশীতে, জীবনের রাজপথে,
মিছিলে মিছিলে; তুমি বেঁচে থাকো, তুমি দীর্ঘজীবী হও।
তোমার হা-করা মুখে প্রতিদিন সূর্যোদয় থেকে
সূর্যাস্ত অবধি হরতাল ছিল একদিন,
ছিল ধর্মঘট, ছিলো কারখানার ধুলো।
তুমি বেঁচেছিলে মানুষের কলকোলাহলে,
জননীর নাভিমূলে ক্ষতচিহ্ন রেখে
যে তুমি উল্ঙ্গ শিশু রাজপথে বেরিয়ে এসেছো,
সে-ই তুমি আর কতদিন ‘স্বাধীনতা, স্বাধীনতা’ বলে
ঘুরবে উলঙ্গ হয়ে পথে পথে সম্রাটের মতো?
জননীর নাভিমূল থেকে ক্ষতচিহ্ন মুছে দিয়ে
উদ্ধত হাতের মুঠোয় নেচে ওঠা, বেঁচে থাকা
হে আমার দূঃখ, স্বাধীনতা, তুমিও পোশাক পরো;
ক্ষান্ত করো উলঙ্গ ভ্রমণ, নয়তো আমারো শরীরি থেকে
ছিঁড়ে ফেলো স্বাধীনতা নামের পতাকা।
বলো উলঙ্গতা স্বাধীনতা নয়,
বলো দূঃখ কোনো স্বাধীনতা নয়,
বলো ক্ষুধা কোন স্বাধীনতা নয়,
বলো ঘৃণা কোন স্বাধীনতা নয়।

জননীর নাভিমূল ছিন্ন-করা রক্তজ কিশোর তুমি
স্বাধীনতা, তুমি দীর্ঘজীবী হও। তুমি বেঁচে থাকো
আমার অস্তিত্বে, স্বপ্নে, প্রেমে, বল পেন্সিলের
যথেচ্ছ অক্ষরে,
শব্দে,
যৌবনে,
কবিতায়।

[নির্মলেন্দু গুণ]

Thursday, 27 March 2014

গৃহশত্রু - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

আমি একাকিনী যবে চলি রাজপথে 
 নব অভিসারসাজে , 
 নিশীথে নীরব নিখিল ভুবন , 
 না গাহে বিহগ , না চলে পবন , 
 মৌন সকল পৌর ভবন 
 সুপ্তনগরমাঝে — 
 শুধু আমার নূপুর আমারি চরণে 
 বিমরি বিমরি বাজে । 
অধীর মুখর শুনিয়া সে স্বর 
পদে পদে মরি লাজে । 

আমি চরণশব্দ শুনিব বলিয়া 
 বসি বাতায়নকাছে — 
 অনিমেষ তারা নিবিড় নিশায় , 
 লহরীর লেশ নাহি যমুনায় , 
 জনহীন পথ আঁধারে মিশায় , 
 পাতাটি কাঁপে না গাছে — 
 শুধু আমারি উরসে আমারি হৃদয় 
 উলসি বিলসি নাচে । 
 উতলা পাগল করে কলরোল , 
 বাঁধন টুটিলে বাঁচে । 

 আমি কুসুমশয়নে মিলাই শরমে , 
 মধুর মিলনরাতি — 
 স্তব্ধ যামিনী ঢাকে চারিধার , 
 নির্বাণ দীপ , রুদ্ধ দুয়ার , 
 শ্রাবণগগন করে হাহাকার 
 তিমিরশয়ন পাতি — 
 শুধু আমার মানিক আমারি বক্ষে 
 জ্বালায়ে রেখেছে বাতি । 
 কোথায় লুকাই , কেমনে নিবাই 
 নিলাজ ভূষণভাতি । 

 আমি আমার গোপন মরমের কথা 
 রেখেছি মরমতলে । 
 মলয় কহিছে আপন কাহিনী , 
 কোকিল গাহিছে আপন রাগিণী , 
 নদী বহি চলে কাঁদি একাকিনী 
 আপনার কলকলে — 
 শুধু আমার কোলের আমারি বীণাটি 
 গীতঝংকারছলে 
 যে কথা যখন করিব গোপন 
 সে কথা তখনি বলে ।