Monday, 8 September 2014

কানকথা শুনে ইতিহাস লেখা যায় না


আমাদের এক বিখ্যাত কবি লিখেছিলেন, ‘সব শালা কবি হতে চায়।’ তিনি যদি একথাটাও লিখতেন, ‘সব শালা ইতিহাসবিদ হতে চায়’, তাহলে সম্ভবত ভালো করতেন। কারণ, বাংলাদেশের জন্য কথাটা সত্য। নীরদ সি. চৌধুরী লিখেছিলেন, ‘বাঙালিরা জন্মালেই কবি, হাঁটতে শেখার আগেই ইতিহাসবিদ।’ নীরদ চৌধুরী অত্যুক্তি করেননি। বাংলাদেশে প্রকৃত ইতিহাসবিদরা কল্কে পান না। কিন্তু ভুয়া ইতিহাসবিদের অন্ত নেই। এই ইতিহাস লেখার জন্য গবেষণা, অধ্যয়ন কোনো কিছুরই এদের কাছে দরকার নেই। কানকথা, শোনা কথা ইত্যাদি দিয়ে তারা ইতিহাস লেখেন। স্মৃতিকথা লেখার নামেও কেউ কেউ মনগড়া কথা লেখেন। বাংলাদেশের মতো এত ইতিহাস-বিকৃতির নজির আর কোনো সভ্য দেশে নেই।

আমাদের সবার শ্রদ্ধাভাজন এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) একে খন্দকার ‘১৯৭১ : ভেতরে বাইরে’ নামে সম্প্রতি যে বইটি প্রকাশ করেছেন, সেটিও তিনি শোনা কথা ও কানকথার ওপর নির্ভর করে লিখেছেন। তিনি তার বইতে সত্য প্রকাশের বড়াই করেছেন। কিন্তু এই সত্য জানার জন্য কিছুমাত্র সত্যানুসন্ধান ও তথ্যানুসন্ধান করেননি। তিনি বইটির ৫৭ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, ‘ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হওয়ার ঠিক আগে শেখ সাহেব ইপিআরের বেতারযন্ত্রের মাধ্যমে চট্টগ্রামের জহুর আহমদ চৌধুরীর কাছে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠিয়েছিলেন এই তথ্যটি মোটেই বিশ্বাসযোগ্য নয়।’
কেন বিশ্বাসযোগ্য নয়? তিনি কি এই ব্যাপারে একটু গবেষণা ও তথ্যানুসন্ধানের চেষ্টা করেছিলেন? না করেননি। তার সূত্র কানকথা। তিনি তার বইতে নিজেই লিখেছেন, ‘একদিন আমি তাজউদ্দীন আহমদকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, স্যার, বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার হওয়ার আগে আপনি কি তার কাছ থেকে কোনো নির্দেশনা পেয়েছিলেন? উত্তরে তিনি বলেছিলেন, না, আমি কোনো নির্দেশ পাইনি।’
ব্যস, এই কানকথা শুনেই একজন এয়ার ভাইস মার্শালের বিশ্বাস হয়ে গেল বঙ্গবন্ধু চট্টগ্রামে জহুর আহমদ চৌধুরীর কাছে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠাননি! আর সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাস লেখা হয়ে গেল। খন্দকার সাহেবকে বলি, ইতিহাস লেখা কি এতই সহজ? যদি এতই সহজ হতো তাহলে নবাব সিরাজউদ্দৌল্লাকে ইংরেজদের ভাড়াটিয়া বাঙালি ইতিহাসবিদদের ছড়ানো কালিমা থেকে মুক্ত করতে অক্ষয়কুমার মৈত্রয়কে বারো বছর ধরে নিরন্তর গবেষণা ও তথ্যানুসন্ধান করতে হতো না। তিনি কানকথা শুনে ইতিহাস লেখেননি। কানকথা শুনে ইতিহাস লেখা যায় না।
আমি যদি খন্দকার সাহেবকে জিজ্ঞাসা করি, তিনি তাজউদ্দীন সাহেবকে বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে কোনো নির্দেশ পাওয়া সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলেন এবং তাজউদ্দীন সাহেব তাতে পাননি বলেছেন, একথা যে সত্য তারই বা প্রমাণ কী? একমাত্র প্রমাণ তিনি নিজে। তার কথায় সত্যতা সম্পর্কে কেউ যদি সন্দেহ প্রকাশ করতে চান তাহলে ব্যাপারটা কী দাঁড়ায়?
২৬ মার্চ রাতে ঢাকার ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে আটকে পড়েছিলেন এমন এক বিদেশী সাংবাদিক লিখেছেন, বেতার যন্ত্রটি অত্যন্ত দুর্বল থাকা সত্ত্বেও অত্যন্ত ক্ষীণ কণ্ঠের এই ঘোষণাটি তিনি শুনেছেন। চট্টগ্রামের জহুর আহমদ চৌধুরীও একাধিকবার বলেছেন, তিনি বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা পেয়েছেন। ওই ঘোষণা পেয়ে তারা ঘোষণাটি প্রচারের উদ্যোগ নেন।
একে খন্দকার যদি সত্যিই সত্যের সন্ধান করতে চাইতেন, তাহলে জহুর আহমদ চৌধুরীকেও তো পেয়ে কথাটি জিজ্ঞেস করতে পারতেন। তিনি তা না করে এখন তাজউদ্দীন আহমদ ও জহুর আহমদ চৌধুরী দুজনেই যখন প্রয়াত, তখন তাজউদ্দীন আহমদের বরাত দিয়ে যে কথাটি প্রচার করছেন, তার সত্যতা কে বিশ্বাস করবে? তার এই দায়িত্বহীন কথাবার্তায় নিজে তো বিতর্কিত হয়েছেনই, তার ওপর মুক্তিযুদ্ধের একজন মহান নেতা তাজউদ্দীন আহমদকেও বিতর্কিত করার চেষ্টা করেছেন।
কানকথা শুনে ইতিহাস লিখতে নেই বলেই (যার সত্যতা প্রমাণ করা বা অন্যকে বিশ্বাস করানো মুশকিল) তাজউদ্দীন আহমদের কাছ থেকে আমার নিজের শোনা একটি কথা ইতিপূর্বে আমি বিশদভাবে লিখিনি। আজ খন্দকার সাহেবকে জানানোর জন্য লিখছি। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মুজিবনগরে থাকার সময় আমি তাজউদ্দীন সাহেবকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ’৭১ সালের মার্চ মাসে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলোচনা বৈঠক অসমাপ্ত রেখে ইয়াহিয়া ও ভুট্টো যখন রাতের অন্ধকারে গা-ঢাকা দিয়ে ঢাকা থেকে রাওয়ালপিন্ডি রওনা হন, সে খবর পাওয়ার পরও কি বঙ্গবন্ধু কোনো সিদ্ধান্ত নেননি, কোনো নির্দেশনা দেননি?
তাজউদ্দীন হেসে বলেছেন, না দিলে আমরা সীমান্ত পাড়ি দিলাম কী করে, মুজিবনগরই বা হল কী করে? সে রাতে ইয়াহিয়ার ঢাকা ত্যাগের খবর পাওয়া পর্যন্ত আমরা পরামর্শ-বৈঠকে ছিলাম। ভুট্টো ঢাকা ত্যাগ করেন শেষ রাতে। লিডারকে এবং আমাদেরও সেই রাতে গ্রেফতার করা হবে বলে ধরে নিয়েছিলাম। তিনি আমাদের গ্রেফতার বরণ না করার এবং আত্মগোপন করে সীমান্তে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন। ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে কী কথাবার্তা বলতে হবে তারও নির্দেশ দেন, এ সম্পর্কিত ব্রিফিং তিনি দিয়েছিলেন ড. কামাল হোসেনকে। কিন্তু কামাল হোসেন আত্মগোপনে না গিয়ে হানাদারদের কাছে ধরা দেন এবং লাহোরে চলে যান।
তাজউদ্দীন আহমদ আমাকে বলেছেন, বঙ্গবন্ধু আমাদের ধরা না পড়ার নির্দেশ দেন। কিন্তু নিজে ধরা পড়ার সিদ্ধান্ত নেন। তাকে না পেলে হানাদাররা তার খোঁজে ঢাকা শহরে তাণ্ডব চালাবে বলে তিনি ভয় করছিলেন। তাজউদ্দীন আহমদ সাহেব আজ নেই। ড. কামাল হোসেন এখনও বেঁচে আছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তার ভূমিকা সম্পর্কে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে নানা অভিযোগ প্রচার করা হয়েছে। তিনি আজ পর্যন্ত তার কোনো জবাব দেননি। মুক্তিযুদ্ধকালে তার লাহোরে অবস্থান এবং তার ভূমিকা সম্পর্কে তিনি বিস্ময়করভাবে নীরব। আমাদের অব. এয়ার মার্শাল মুক্তিযুদ্ধের সূচনাপর্বে বঙ্গবন্ধুর সিদ্ধান্ত ও ঘোষণা কী ছিল (তখন ড. কামাল হোসেন বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন) তা জানার জন্য তার সঙ্গেও কথা বলেননি কেন? তাজউদ্দীন আহমদ বেঁচে নেই বলেই কি তাকে সাক্ষী গোপাল করা হল?
৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু ‘জয় পাকিস্তান’ বলেছেন এটাও সম্ভবত খন্দকার সাহেব কানকথা শুনে লিখেছেন। তার আগে প্রয়াত বিচারপতি হাবিবুর রহমান (শেলী) এই কথাটি লিখে সমালোচিত হয়েছেন। তিনিও নাকি আমাদের ‘গোলআলু পণ্ডিত’ ড. আনিসুজ্জামানের কানে কানে বলে গেছেন যে, তিনি (বিচারপতি) বঙ্গবন্ধু জয় পাকিস্তান বলেছেন এটা স্বকর্ণে শুনেছেন। এটা নিয়ে বিচারপতির সঙ্গে আমার কলম যুদ্ধ হয়। আমাকে তিনি অত্যন্ত স্নেহ করতেন। এই কলমযুদ্ধের পর ঢাকায় তার সঙ্গে দেখা হতেই তিনি আমার কাছে স্বীকার করেন, তিনি বঙ্গবন্ধুর ৪ জানুয়ারির (৭১) ও ৭ মার্চের (৭১) ভাষণকে গুলিয়ে ফেলেছেন। ৪ জানুয়ারির নির্বাচন বিজয়ের অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু জয় পাকিস্তান বলেছিলেন, ৭ মার্চের ভাষণে বলেননি। তিনি বিভ্রান্ত হয়েছিলেন।
তাকে বলেছি, মনে এই দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ও বিভ্রান্তি নিয়ে কথাটি আপনি কেন লিখতে গেলেন? তিনি বিব্রতভাবে বলেছেন, যে পত্রিকাটিতে আমার এ সম্পর্কিত লেখাটি বের হয় তার সম্পাদক আমাকে উৎসাহ দিয়ে বলেছেন, ‘বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ভাষণে জয় পাকিস্তান বলেছেন কথাটা যখন আপনার মনে জেগেছে তখন লিখে ফেলুন। একটা কনট্রোভাসি সৃষ্টি হোক। কনট্রোভাসির মধ্য দিয়ে সত্য বেরিয়ে আসবে।’ আমি আমার প্রিয় বিচারপতি শেলী ভাইকে বলেছিলাম, আপনি ওই অসাধু সম্পাদকের ফাঁদে পা দিয়েছেন। আপনাকে দিয়ে কনট্রোভাসি সৃষ্টি করে ওই সম্পাদক তার কাগজের কাটতি বাড়াবেন, কিন্তু আপনি সুনাম হারাবেন। এই একই খেলার ফাঁদে একে খন্দকারও পা দিয়েছেন কিনা আমি জানি না। তবে ওই সম্পাদকের প্রকাশনা সংস্থাই খন্দকার সাহেবের বইটি প্রকাশ করেছে। বিতর্কের ঝড়ে বইটি নাকি হু হু করে বিক্রি হয়ে গেছে। তাতে পকেট ভারি হয়েছে মুনাফালোভী সম্পাদকের। সুনাম খোয়াচ্ছেন মুক্তিযুদ্ধের একজন বর্ষীয়ান নেতা।
আওয়ামী লীগ একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর দল। এই বইটি যতটা গুরুত্ব পাওয়া উচিত তার বেশি গুরুত্ব দিয়ে তারা পার্লামেন্টেও হৈচৈ করেছেন এবং বইটি নিষিদ্ধ করার জন্যও কেউ কেউ দাবি তুলেছেন। আমি অর্থমন্ত্রী মুহিত সাহেবের সঙ্গে সহমত পোষণ করি। এই বই মোটেই নিষিদ্ধ করা উচিত হবে না। বরং এই বইয়ের মিথ্যাচারগুলো পাঠকদের কাছে তুলে ধরে সত্য ও সঠিক ইতিহাস চর্চা আজ বড় বেশি প্রয়োজন। খন্দকার সাহেব যদি সত্যই বিবেকবান মানুষ হন, তার উচিত হবে বইটি বাজার থেকে প্রত্যাহার করে নেয়া। এর সংশোধিত ও পরিমার্জিত সংস্করণ প্রকাশের ব্যবস্থা করা।
খন্দকার সাহেব যদি তা না করেন, তাহলে সেক্টর কমান্ডাস ফোরামের উচিত হবে, তার কাছে কৈফিয়ত তলব করা এবং তিনি উপযুক্ত কৈফিয়ত দিতে ব্যর্থ হলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা। খন্দকার সাহেবকে বোঝানো উচিত, কানকথা শুনে ইতিহাস লেখা অন্যায়।

# আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
www.jugantor.com/sub-editorial/2014/09/08/144846


Saturday, 6 September 2014

মিথ্যাচারের দলিল ভেতরে বাইরে, বাজেয়াপ্ত নয় কেন

জিয়া এরশাদসহ সব সরকারের সুবিধাভোগী এ কে খন্দকার 

১. মুক্তিযুদ্ধে গৌরবময় ভূমিকা রাখার জন্য বীরউত্তম খেতাবপ্রাপ্ত আমাদের বাহিনীর ডেপুটি চিফ এ কে খন্দকার শেখ হাসিনার সরকারের পাঁচটি বছর পরিকল্পনামন্ত্রী হিসেবে খেয়ে দেয়ে হাত মুখ মুছে আরাম করে একখানি বই লিখেছেন। সম্প্রতি ‘প্রথমা’ থেকে প্রকাশিত এ বইটির নাম ‘১৯৭১ : ভেতরে বাইরে’। ১৯৭১ সালের এপ্রিলে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়া তৎকালীন বিমানবাহিনীর গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকারের এ বইটি বিতর্কের ঝড় তুলেছে। সুমহান স্বাধীনতা সংগ্রামে ও মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে জড়িত নেতারাও বৃহস্পতিবার সংসদে এ নিয়ে তুমুল ক্ষোভ প্রকাশ করে যুক্তিনির্ভর বক্তব্য রেখেছেন। বইখানি পূর্ণ সত্য নয়, অর্ধসত্য। ইতিহাস নয়, ইতিহাস নিয়ে নির্জলা মিথ্যাচারের দলিল। আমাদের সুমহান মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব ও ইতিহাসকে কেমন করে খাটো করা যায় তা তো বটেই, রীতিমতো ধর্ষণ করা যায় তার চেষ্টা হয়েছে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ থেকে ২৫ মার্চ রাতের ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে বইটির পরতে পরতে লেখকের রেখে যাওয়া মন্তব্য ও মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে। রাজনৈতিক নেতৃত্বকে ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়ার প্রাণান্তকর চেষ্টা হয়েছে। বইটি পড়ে কখনো কখনো মনে হয়েছে লেখক নিজেই বিভ্রান্ত, অথবা বয়সের ভারে ইতিহাসবিস্মৃত কিংবা সেই অগ্নিঝরা রক্তাত স্বাধিকার-স্বাধীনতা সংগ্রামের দিনগুলো না দেখা এক আত্মস্বীকৃত মানুষের কোনো এক অদৃশ্য শক্তির ইন্ধনে সৃষ্ট মুক্তিযুদ্ধের গৌরবকে ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়ার প্রয়াস। মুক্তিযুদ্ধের একজন উপ-প্রধান যিনি আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য এবং শেখ হাসিনা সরকারের সদ্যবিদায়ী মন্ত্রী তাকে দিয়ে ইতিহাসের বুকে ছুরি চালালে যতটা গ্রহণযোগ্যতা পাবে অন্য কাউকে দিয়ে চালালে পাওয়া যাবে না সেই মতলব থেকে এটি লেখানো হয়েছে।

২. এ কে খন্দকার বইটির ভূমিকায় লিখেছেন- ‘আমি রাজনীতিবিদ ছিলাম না, বরং কুড়ি বছর পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে নিষ্ঠার সঙ্গে চাকরি করেছি। তার পরও দেশ ও জাতির ক্রান্তিলগ্নে আমি সিদ্ধান্ত নিতে একটুও ভুল করিনি। যথাসময়ে আমি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিই এবং যুদ্ধ শেষে বিজয়ীর বেশে দেশে ফিরে আসি।’ তিনি রাজনীতিবিদ ছিলেন না, এ দেশের রাজনৈতিক সংগ্রামের ভিতর দিয়ে একটি জাতি কীভাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে এক মোহনায় মিলিত হয়েছে তা তিনি দেখেননি। রণাঙ্গনে যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্বে থাকা বিমানবাহিনীর অফিসার হিসেবে দাবি করতে পারেন না তিনি একজন ইতিহাসবিদ। কিন্তু তিনি মুক্তিযুদ্ধের, স্বাধীনতা সংগ্রামের মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের বীরত্ব ও স্বাধীনতা সংগ্রামকে এতটাই খাটো করেছেন যে, তা পাঠ করলে একাত্তরের পরাজিত পাকিস্তানি শাসক ইয়াহিয়া খান কবরে শুয়ে অট্টহাসিতে ফেটে পড়বেন। বাঙালি জাতি, মাটি এবং স্বাধীনতার প্রতি আনুগত্যের প্রশ্নে অবিচল থাকায় আমাদের মহান নেতা শেখ মুজিবকে জল্লাদ ইয়াহিয়া খান ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়ে মারতে চেয়েছিলেন কিন্তু নিজের জন্য খোদাই করা কবরের পাশে দাঁড়িয়েও যে বঙ্গবন্ধু একজন দুনিয়া কাঁপানো জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের নেতা হিসেবেই নয়, বাংলাদেশের স্থপতি হিসেবে বীরত্ব দেখিয়েছেন, যাকে পাকিস্তানি শাসকরা এবং তাদের বিশ্বমোড়লরা নত করতে পারেনি সেই মহান নেতাটিকে কী অনায়াসেই না এ কে খন্দকার মাটিতে শুইয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন! পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী, শাসকগোষ্ঠী এমনকি তাদের সমর্থনকারী সেদিনের মার্কিন প্রশাসনের নথিপত্রে যা নেই তাই আছে এ কে খন্দকারের ‘১৯৭১ : ভেতরে বাইরে’ গ্রন্থখানিতে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দোসর জামায়াতের নেতারাও দাবি করেন তারা অখণ্ড পাকিস্তান চেয়েছিলেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের মুকুটহীন সম্রাট ও স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি! যুদ্ধাপরাধের অপরাধে অভিযুক্ত কারাবন্দী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীও বিএনপির রাজনৈতিক নেতৃত্ব থেকে বারবার বলেছেন, ‘শেখ মুজিব মুক্তিযুদ্ধের ইমাম’। আর এ কে খন্দকার তার ভূমিকায় লিখেছেন- ‘বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণেই যে মুক্তিযুদ্ধ আরম্ভ হয়েছিল তা আমি মনে করি না।’ তিনি লিখেছেন- “৭ মার্চের ভাষণটি আমি শুনেছি। এর মধ্যে যে কথাগুলো আমার ভালো লেগেছিল তা হলো ‘দুর্গ গড়ে তোলো’, ‘তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো’, ‘শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে’, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। এ সময় সমগ্র বাংলাদেশের মানুষ তার কাছ থেকে এ ধরনের কথা আশা করছিল। ওই কথাগুলো শক্তিশালী ছিল বটে, তবে তা বাস্তবে রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা আওয়ামী লীগের নেতাদের ছিল না।... ভাষণে চূড়ান্ত কোনো দিকনির্দেশনা পাওয়া গেল না। ভাষণটির পর মানুষজন ভাবতে শুরু করল এরপর কী হবে? আওয়ামী লীগের পূর্বপ্রস্তুতি না থাকায় যুদ্ধ শুরু করার কথা বলাও একেবারে বোকামি হতো। সম্ভবত এ কারণেই বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চ সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা করা থেকে বিরত থাকেন। তা ছাড়া ইয়াহিয়া খান নিজেও ওই ধরনের ঘোষণা না দেওয়ার জন্য বঙ্গবন্ধুকে অনুরোধ করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু হয়তো ঢাকায় ইয়াহিয়ার উপস্থিতিতে একটি রাজনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছিলেন...। যদি আওয়ামী লীগ নেতাদের কোনো যুদ্ধ পরিকল্পনা থাকত... তাহলে আমার মনে হয় যুদ্ধটি হয়তো অল্প সময়ের মধ্যে শেষ হয়ে যেত এবং আমাদের বিজয় নিশ্চিত হতো। কিন্তু পরিতাপের বিষয় সেটা করা হয়নি।”৩. এ কে খন্দকারের এ বক্তব্য গভীরভাবে পাঠ করলে দেখা যায় তিনি ৭ মার্চের ভাষণ শুনলেও শোনেননি বঙ্গবন্ধুর সেই কথাটি ‘আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি তোমাদের যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করো, ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল...। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে পাড়া-মহল্লায় সংগ্রাম কমিটি গঠন করো।’ বঙ্গবন্ধুর এই নির্দেশনার মধ্যেই কি প্রস্তুতি ছিল না? বঙ্গবন্ধু একদিকে যেমন ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে তার আলোচনা অব্যাহত রেখেছিলেন তেমনি তিনি তার নেতৃবৃন্দ মরহুম তাজউদ্দীন আহমদসহ জাতীয় নেতাদের অবহিত রেখেছেন। মুজিববাহিনীর চার প্রধান- শেখ ফজলুল হক মণি, সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমেদকে প্রতিনিয়ত জানিয়েছেন, আলোচনার নামে ওরা কালক্ষেপণ করছে, তোমরা তোমাদের প্রস্তুতি রাখো। জনগণকে যদি স্বাধীনতা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সত্তরের গণরায় নিয়ে একাত্তরের ৭ মার্চ এক মোহনায় মিলিত করে অভূতপূর্ব, বিস্ময়কর অসহযোগ আন্দোলনের সাফল্যের মধ্য দিয়ে নিজের শাসন প্রতিষ্ঠা না করতেন তাহলে এ কে খন্দকার মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গন খুঁজে পেতেন না। ২৫ মার্চের রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা ও আক্রমণের পর জনগণ যদি প্রতিরোধযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে না পড়ত তাহলে তারা কোথায় গিয়ে দাঁড়াতেন। ভারতের গণতন্ত্রের মহান নেত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে পূর্ব বাংলার অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবের যদি পূর্ব সমঝোতা না-ই থাকত তাহলে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ ও পাকিস্তান বাহিনী ত্যাগ করে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়া সামরিক বাহিনীসহ বিভিন্ন সিভিল প্রশাসনের লোকজন কীভাবে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন?৭ মার্চ বেলা দেড়টায় বাঙালি জাতির ঐক্যের স্মারক ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িটিতে সিরাজুল আলম খান ও তোফায়েল আহমেদ যখন বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে গিয়েছিলেন তখন তিনি তাদের কাঁধে হাত রেখে কথা বলছিলেন। সিরাজুল আলম খান বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলেন, আজ আপনি পূর্ণ স্বাধীনতা ঘোষণা না করলে মানুষ মেনে নেবে না। বঙ্গবন্ধু জবাবে বলেছিলেন, আমার জনগণের নির্বাচিত নেতা হিসেবে কী মেসেজ দিতে হবে তা আমি জানি। সেইদিন জাতির নেতৃত্বের আসনে ছিলেন শেখ মুজিব। পাকিস্তান সৃষ্টির পর পরই যিনি তার অভীষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করে হাঁটি হাঁটি পা পা করে জাতিকে ও নিজেকে স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত করেছিলেন। তার দূরদর্শিতার কারণে জনগণের মনোভাব বুঝতে পেরে অনেকের আপত্তির মুখেও তিনি সত্তরের নির্বাচনে অংশ নেন এবং বিজয় অর্জন করেন। ১ মার্চ যখন হোটেল পূর্বাণীতে তিনি নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠক করছিলেন তখন ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চের জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন। সঙ্গে সঙ্গে মানুষ বারুদের মতো জ্বলে উঠেছিল। পাকিস্তানের পতাকা দিকে দিকে পুড়ছিল। পল্টনে তিনি তোফায়েলকে পাঠিয়েছিলেন, তোফায়েল কী বলেছিলেন সেখানে তা এ কে খন্দকার জানেন না। কারণ তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের কোনো পর্বেরই সাক্ষী ছিলেন না। তিনি ছিলেন পাকিস্তান বিমানবাহিনীর কর্মরত একজন অফিসার। সেদিন ছাত্রলীগ ও ডাকসুর সমন্বয়ে স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়েছিল। সেই স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতাদের মানুষ চার খলিফা বলে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় অভিষিক্ত করেছিল। চার নেতা ছিলেন নূরে আলম সিদ্দিকী, আ স ম আবদুর রব, শাজাহান সিরাজ ও আবদুল কুদ্দুস মাখন। ২ মার্চ পতাকা উত্তোলিত হয়েছিল। ৩ মার্চ পল্টনে স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ হয়েছিল। সেই দিন বঙ্গবন্ধুকে বাংলাদেশের স্থপতি বা জাতির জনক ও স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা ঘোষণা করা হয়েছিল। এ কে খন্দকার কীভাবে একজন শেখ মুজিব আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় জড়ালেন, কীভাবে কারাগার থেকে মুক্ত হলেন, কীভাবে জাতির জীবনে আসাদের রক্তভেজা শার্ট, মতিউরের গুলিবিদ্ধ নিথর দেহ নিয়ে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এলো তার কিছুই জানেন না। জানবেন কী করে?৪. তিনি তার বইয়ের ভূমিকায় নিজেই বলেছেন, ‘বাহান্ন সালের সেপ্টেম্বর মাসে কমিশনপ্রাপ্ত হই। এর পর থেকেই ঊনসত্তর সাল পর্যন্ত আমি পশ্চিম পাকিস্তানে ছিলাম। একান্ন থেকে ঊনসত্তর সাল পর্যন্ত ১৮ বছর পাকিস্তানে অবস্থানকালে পাকিস্তানি কর্মকর্তা ও সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ভালো ব্যবহার পেয়েছি। পশ্চিম পাকিস্তানে আমার অনেক ভালো বন্ধুও ছিলেন। তারা সব সময় আমার ও আমার পরিবারের প্রতি খুব যত্নবান ছিলেন। যেমন রাতে বাসায় বিশ্রাম নিচ্ছি, হঠাৎ খবর এলো ফ্লাইংয়ে যেতে হবে। ব্যস, অফিসের কাজে বের হয়ে যেতাম। এ সময় আমার স্ত্রী একদম একা থাকতো। কিন্তু আশপাশের পরিবারগুলো ছিল অত্যন্ত বন্ধুসুলভ। তারা আমার স্ত্রীর দেখাশোনা করত, সবসময় খেয়াল রাখতো, যেন আমার অনুপস্থিতিতে ওর কোনো অসুবিধা না হয়, যেন ভয় না পায়। ঊনসত্তর সালের ৪ মার্চ আমি পাকিস্তান বিমানবাহিনীর ঢাকা ঘাঁটিতে উইং কমান্ডার হিসেবে বদলি হয়ে আসি। পঁয়ষট্টি থেকে ঊনসত্তর সাল পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানে যেসব ঘটনা ঘটেছিল, বিশেষত ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, পশ্চিম পাকিস্তানে থাকার ফলে আমি তা জানতে পারিনি।’ ঊনসত্তর যিনি জানেননি তিনি ছয় দফার সংগ্রাম ও তা ঘিরে শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের কপালে কী ঘটেছে তা জানবেন কী করে? আর বঙ্গবন্ধুসহ স্বাধীনতা সংগ্রামীরা যেখানে বৈরী স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে বলতেন পূর্ব বাংলা সেখানে নিজের কমিটি থেকে বীরউত্তম খেতাব নেওয়া এ কে খন্দকার এখনো বলছেন পূর্ব পাকিস্তান। এখনো যেখানে প্রজন্ম শাহবাগে দাঁড়িয়ে পাকিস্তানের পণ্য বর্জনের ডাক দেয়, একাত্তরের নৃশংসতা স্মরণ করে সেখানে তিনি বলছেন, তিনি ও তার স্ত্রী যৌবনে পশ্চিম পাকিস্তানিদের কাছে কতই না আরাম আর শান্তিতে ছিলেন! এ কে খন্দকার ইস্কান্দার মির্জা, আইয়ুব খান, ইয়াহিয়া খান সব আমলেই নিশ্চিন্তে নিরাপদে চাকরি করেছেন। তার জবানিতেই সেটি ফুটে উঠেছে। সশস্ত্র বাহিনীতে বাঙালি অফিসারদের পশ্চিমারা কী নজরে দেখত তা সবাই মোটামুটি জাতির সামনে উন্মোচন করেছেন। সেখানে তিনি এক ধরনের তৃপ্তি ও কৃতজ্ঞতার ঢেঁকুর তুলছেন। মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েও ডেপুটি চিফের পদবি পেয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের পর বিমানবাহিনীর প্রধান হয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর রক্ত মাড়িয়ে খুনি মোশতাকের প্রতি আনুগত্য দেখিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে তিনি বিমানবাহিনীর প্রধান থেকে পদত্যাগ করেছেন বলে যে দাবি করেছেন তা তার মিথ্যাচারের প্রথম দফা। তাকে বিমানবাহিনীর প্রধান থেকে সরে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল। যেমন করা হয়েছিল সেনাবাহিনী থেকে জেনারেল সফিউল্লাহকে। তিনি সেনাশাসক জিয়াউর রহমানের আমলে ১৯৭৬ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়া এবং সেনাশাসক এরশাদের জমানায় ১৯৮২ থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত ভারতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। এরশাদের পরিকল্পনামন্ত্রীও ছিলেন। এমন কোনো আমল নেই তিনি রাষ্ট্রীয় পদ-পদবির বাইরে ছিলেন। আসলে তিনি সব শাসকের সঙ্গেই ছিলেন। সামরিক, বেসামরিক, গণতান্ত্রিক- সব সরকারের অনুকম্পা ও অনুগ্রহ লাভে তার পাশে কেউ দাঁড়াতে পারেননি। ১৯৯৮ ও ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ থেকে সংসদে নির্বাচিত হয়ে আসেন। শেখ হাসিনা ২০০৯ সালে সরকার গঠন করলে দলে অনেক পরীক্ষিত ত্যাগী নেতাদের বাদ দিলেও মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামের দিকে তাকিয়ে পাকিস্তানি ও বাংলাদেশের সেনাশাসকদের আজ্ঞাবহ এ কে খন্দকারকে পরিকল্পনামন্ত্রী করেছিলেন। সংবিধানে বিসমিল্লাহ ও রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম রাখায় তিনি মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রশ্ন তুলেছিলেন। জবাবে শেখ হাসিনা জানতে চেয়েছিলেন রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম তো এরশাদ করেছিলেন, সেদিন তো আপনি তার মন্ত্রী ছিলেন। ঠেকালেন না কেন? নীতির প্রশ্নে যদি অবিচল থাকতেন এ কে খন্দকার সেদিন পদত্যাগ করতেন। আত্মসম্মানহীন মানুষেরা বীরদের অনুসরণ করে না, মীরজাফর, মোশতাকদের অনুসরণ করে। মন্ত্রিত্বের লোভে, মোহে তিনি মন্ত্রিসভায় রয়ে যান। এবার তিনি সংসদ ও সরকারে ঠাঁই না পেয়ে অন্তর্জ্বালা থেকে একজন হতাশ, ক্ষুব্ধ মানুষের প্রতিহিংসাসুলভ চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন মিথ্যাচারের খোয়াবনামা ‘ভেতরে বাইরে’ লিখে। এ বইয়ের পরতে পরতে সাজানো কল্পকাহিনী দিয়ে তিনি কী মন্ত্রিত্ব হারানোর দুঃখ ঘুচিয়েছেন। তা না হলে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণে ইয়াহিয়া খান ‘জয় পাকিস্তান’ শুনলেন না, তিনি শুনেছেন। এমন নির্লজ্জ মিথ্যাচার, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে এমন বিশ্বাসঘাতকতা নজিরবিহীন।তিনি শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে গিয়ে একটি জাতির বীরত্বের সংগ্রামকে অবমাননা করেছেন। স্রোতস্বিনী নদীর মতো কলকল করে ছুটে চলা ইতিহাসের পথ আগলে দাঁড়িয়েছেন। লন্ডনে বসে বিএনপির হতাশাক্ষুব্ধ সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান যে আর্তনাদ করছেন, যেভাবে ইতিহাস বিকৃতির পথ নিয়েছেন, এ কে খন্দকার বিবেক, বিচারবোধ পদদলিত করে সেই পথ অনুসরণ করেছেন মাত্র। তার স্ববিরোধী বইয়ের ৩২ পৃষ্ঠায় লিখেছেন- ‘মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকেই সামরিক বাহিনীতে পাকিস্তানিরা কৌশলে সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ডে বাঙালিদের এড়িয়ে যেতে শুরু করে। ফলে বাঙালি ও পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্যদের মধ্যে সন্দেহ ও অবিশ্বাস ক্রমেই বাড়তে থাকে। সরকারি এবং বেসরকারি অফিসেও বাঙালি ও পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থার অভাব দেখা দেয়। এ সময় বাঙালি সৈনিকদের রাইফেল নিয়ে কুচকাওয়াজ থেকে বিরত রাখা হয়।’ এখানেই বোঝা যায় পাকিস্তানি শাসকরাও বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রস্তুতি জেনে গিয়েছিল। বঙ্গবন্ধু বরাবরই চেয়েছিলেন আঘাত প্রতিপক্ষের কাছ থেকে আসুক। তিনি বিচ্ছিন্নতাবাদী হতে চাননি। তিনি যেমন করে ২৪ বছরের সংগ্রামে তার জাতিকে তৈরি করেছেন তেমনিভাবে স্বাধীনতাযুদ্ধের দিকে অগ্রসর করেছেন। এ কে খন্দকারের সেই ইতিহাস জানার কথা নয়। জেনারেল ওসমানীর সঙ্গে ইন্দিরা রোডের সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর বাসভবনে প্রথম বঙ্গবন্ধুর দেখা হয়। সেভাবেই তিনি সেনাবাহিনীতে কর্মরত বাঙালি অফিসারদের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করেছিলেন। জেনারেল ওসমানী আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে সত্তরের নির্বাচনে এমএনএ নির্বাচিত হন। মুক্তিযুদ্ধে তাকে প্রধান সেনাপতি আকস্মিক করা হয়নি। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও গতিপথ রাজনীতির পথেই সেদিন অগ্রসর হয়েছে এবং তার চূড়ান্ত পরিণতি লাভ করেছে। সেই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় একটি চূড়ান্ত অধ্যায় মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে এ কে খন্দকার ভূমিকা রেখেছেন মাত্র। তিনি রণাঙ্গনের যুদ্ধ নিয়ে লিখলে বা কথা বললে কোনো প্রশ্ন ছিল না। যুদ্ধের কাহিনী লিখতে গিয়ে তিনিও ইতিহাসের কলিজার ভিতর হাত দিয়ে বসেছেন। তিনি যে ভাষায় লিখছেন সেই ভাষায় তারেক রহমানও কথা বলেননি। তিনি হয়তো চাচ্ছেন মুক্তিযোদ্ধা সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম তো রয়েছেই, আওয়ামী লীগবিরোধী বা মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির কাছে জীবনের পড়ন্তবেলায় নিজের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করে আগামী দিনে কোনো অসাংবিধানিক পরিবর্তন ঘটলে নিজেকে রাষ্ট্রের উচ্চ আসনে প্রতিষ্ঠিত করতে। আর না হয় বয়সের ভারে এতটাই বিস্মৃত যে, কী লিখতে গিয়ে কী লিখেছেন তা তিনি নিজেই জানেন না। আর না হয় অনেকের মতোই জীবনের পড়ন্তবেলায় ফরমায়েশি লেখা লিখেছেন। বিনিময়ে কী পেয়েছেন বা পাবেন তা তিনি নিজেই জানেন। সেটি অনুসন্ধানের বিষয়।৫. চট্টগ্রাম বেতার থেকে আওয়ামী লীগ নেতা এম এ হান্নানের ২৬ মার্চের বঙ্গবন্ধুর হয়ে স্বাধীনতা ঘোষণার কথাটি উল্লেখ করেছেন। বঙ্গবন্ধু যদি নির্দেশনা না-ই দিতেন এম এ হান্নান কীসের ওপর ভিত্তি করে সেই ঘোষণা দিয়েছিলেন? ২৭ মার্চ কোন প্রেক্ষাপটে সেদিনের মেজর জিয়াউর রহমানই বা বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন? ১৯৭১ সালের ১৮ মার্চ বঙ্গবন্ধু তাজউদ্দীনের সামনে মুজিববাহিনীর চার প্রধানকে একখানি ঠিকানা মুখস্ত করিয়েছিলেন। সেটি হচ্ছে- চন্দ্রশীল ২১, রাজেন্দ্র রোড, নর্দান পার্ক, ভবানীপুর। বরিশাল অঞ্চল থেকে নৌকা নিয়ে নির্বাচিত ষাটের জেলখাটা চিত্তরঞ্জন সুতার আগেই সেখানে চলে গিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু তরুণ নেতাদের বলেছিলেন, তোমরা সেখানে গেলেই সব পেয়ে যাবে। এমনকি আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দসহ, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক এবং সেক্টর কমান্ডাররা ভারতে গিয়ে যে আশ্রয়, ট্রেনিং, সাহায্য পেয়েছিলেন সেটিও আকস্মিক ঘটনা ছিল না। বঙ্গবন্ধুর পূর্ব পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সব ছিল। এমনকি তাজউদ্দীন আহমদের ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং ভারত সরকারের ভূমিকাও। ২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা নিয়ে এ কে খন্দকার মিথ্যাচার নয়, রীতিমতো পাগলের প্রলাপ বকেছেন। বঙ্গবন্ধু জানতেন তিনি আত্মগোপনে যাওয়ার মতো নেতা ছিলেন না। তিনি ৩২ নম্বর থেকে বেরোলে পাকিস্তানি ঘাতকেরা হত্যা করে দুষ্কৃতকারীদের ওপর দোষ চাপিয়ে দিত। তাকে খুঁজতে গিয়ে আরও বেপরোয়া হত্যাযজ্ঞে লিপ্ত হতো। এমনকি ৭ মার্চের ভাষণ ৪৩ বছর পরও বিশ্ব ইতিহাসে হাতে গোনা ভাষণগুলোর শীর্ষে স্থান পেয়েছে। সেই ভাষণকে সব গবেষকই দিকনির্দেশনামূলক বলে চিহ্নিত করেছেন। ৭ মার্চের সেই মহাকাব্যকে মেজর জিয়াউর রহমান (পরবর্তীতে সেনাপ্রধান ও রাষ্ট্রপতি) গ্রিন সিগন্যাল বলে মূল্যায়ন করেছেন।৬. ১৯৭৪ সালের ২৬ মার্চ সংখ্যা সাপ্তাহিক বিচিত্রায় ‘একটি জাতির জন্ম’ শিরোনামে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের যে নিবন্ধ ছাপা হয়েছে সেখানে তিনি পরিষ্কার লিখেছেন- ‘তারপর এলো ১ মার্চ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদাত্ত আহ্বানে সারা দেশে শুরু হলো ব্যাপক অসহযোগ আন্দোলন।... ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ঘোষণা আমাদের কাছে এক গ্রিন সিগন্যাল বলে মনে হলো। আমরা আমাদের পরিকল্পনাকে চূড়ান্ত রূপ দিলাম। কিন্তু তৃতীয় কোনো ব্যক্তিকে তা জানালাম না।’ সবাই দিকনির্দেশনা দেখে প্রতিরোধযুদ্ধে নামলেও একজন শুধু ৪৩ বছর পর এসে দেখেন না, তিনি শেখ হাসিনার আগের মন্ত্রিসভার পাঁচ বছর আরাম আয়েশে খেয়ে পরা সদস্য এ কে খন্দকার। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা করলে সেদিনের রেসকোর্স ময়দানই নয়, গোটা বাংলাদেশ রক্তাক্ত হয়ে যেত পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আক্রমণে। শেখ হাসিনা সরকারের পাঁচ বছর ক্ষমতার স্বাদ নিয়ে খেয়ে দেয়ে মুখ মুছে থালাখানি কীভাবে ফুটো করে দিতে হয় এ কে খন্দকারের চেয়ে আর কেউ দেখাতে পারেননি। তবে তিনি ভুল করেছেন যে, ইতিহাসের হৃৎপিণ্ডে বিষাক্ত ছুরি চালিয়ে বসেছেন। এখন কোথায় সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম? কোথায় শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ? কোথায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সেইসব অধ্যাপক যারা ছুটে এসেছিলেন শাহবাগের মঞ্চে? আজ তারা কী করবেন? ইতিহাসের মীমাংসিত সত্যকে বিতর্কিত করার অপরাধে একজন এ কে খন্দকারের কি আজ বিচার চাইবেন? নাকি বোবা দর্শক হয়ে এড়িয়ে যাবেন? ভলতেয়ারের সেই উক্তিকে চিন্তা ও মননে লালন করি ‘আমি তোমার মতের সঙ্গে একমত না-ও হতে পারি, কিন্তু তোমার মত প্রকাশের স্বাধীনতার জন্য জীবন দিতে পারি’। কিন্তু এখানে মতপ্রকাশের নামে ইতিহাসের মীমাংসিত সত্যকে অস্বীকার করা হয়েছে। ইতিহাসকে নির্জলা মিথ্যাচারে বিকৃত করা হয়েছে। একজন নির্বাসিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন তার আত্মজীবনীতে সাহসিকতার সঙ্গে অনেক সত্য তুলে ধরেছিলেন। সেটি ইতিহাসের সঙ্গে, একটি রাষ্ট্রের জন্ম ও সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কিছু ছিল না। তার জীবনের সঙ্গে জড়ানো কিছু চরিত্র উন্মোচন করেছিলেন। পাঠক যা বোঝার সব ঠিকঠাকমতো বুঝলেও অনেকে মানহানির মামলা নিয়ে আদালতে ছুটেছিলেন। তসলিমার সেই ‘ক’-তে ঠাঁই পাওয়া চরিত্রগুলো বড়র মতো দেখালেও বড় যে হতে পারেননি সেটি যেমন পাঠক বুঝতে ভুল করেনি, তেমনি আজ ভুল করবে না মুক্তিযুদ্ধের আমাদের বাহিনীর উপ-প্রধান হলেও এমনকি পাকিস্তানের পরাজিত বাহিনীর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকলেও সব সরকারের খেয়ে পরা এ কে খন্দকার স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের সঙ্গে একাত্মা হতে পারেননি। তাকে বড়র মতো দেখালেও শেখ হাসিনার এবারের সরকারে ঠাঁই না পাওয়ার অন্তর্জ্বালায় দগ্ধ হয়ে বামন হয়ে বসে আছেন। তসলিমার আত্মজীবনীমূলক ‘ক’ যদি নিষিদ্ধ হতে পারে ইতিহাস বিকৃতির দায়ে, সংবিধান লঙ্ঘনের অপরাধে কেন এ কে খন্দকারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না? কেনই বা মিথ্যাচারের দলিল ‘১৯৭১ : ভেতরে বাইরে’ বাজেয়াপ্ত করা হবে না। লেখক রবার্ট পেইন লিখেছিলেন- ২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধু সবাইকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, ‘আজ আমি সুখী। বাংলাদেশ স্বাধীন হতে চলেছে। আমাকে হত্যা করলেও লাভ হবে না। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে যাবে।’

© পীর হাবিবুর রহমান
www.bd-pratidin.com/2014/09/06/28563

Monday, 1 September 2014

সাদাসিধে কথা:
একটি অসাধারণ আত্মজীবনী

মাঝে মাঝে আমার মনে হয় আমাদের কতো বড় সৌভাগ্য যে, বাংলাদেশের মাটিতে বঙ্গবন্ধুর মতো একজন মানুষের জন্ম হয়েছিল। ঠিক যেই সময়টিতে দরকার হয়েছিল, তখন যদি তার মতো একজন মানুষের জন্ম না হতো তাহলে কী হতো? তাহলে কী বাঙালিরা নিজের একটা দেশের স্বপ্ন দেখতে পারতো?

সেই দেশের জন্যে যুদ্ধ করতে পারতো? অকাতরে প্রাণ দিতে পারতো? যদি আমরা নিজের একটি দেশ না পেতাম, এখনো পাকিস্তান নামে সেই বিদঘুটে দেশটির অংশ হিসেবে থাকতাম, তাহলে আমাদের কী হতো, সেই কথা চিন্তা করে আমি আতঙ্কে শিউরে উঠি।

এই মানুষটিকে পঁচাত্তরে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছিল। পৃথিবীর অনেক দেশেই অনেক মহামানবকে নিজের দেশ কিংবা দেশের মানুষের জন্যে প্রাণ দিতে হয়েছে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর বিষয়টি ছিল অবিশ্বাস্য।

তাকে সপরিবারে হত্যা করেই হত্যাকারীরা দায়িত্ব শেষ করেনি, এই দেশের ইতিহাস থেকে তার চিহ্ন মুছে দেওয়ার জন্যে একুশটি বছর এমন কোনো কাজ নেই যেটি করা হয়নি। যে মানুষটির কারণে আমরা আমাদের দেশটি পেয়েছি, সেই দেশের রেডিও টেলিভিশনে কোনো দিন তার নাম পর্যন্ত উচ্চারিত হয়নি।

আমার মনে আছে, প্রথমবার আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর আমি আমার স্ত্রীকে বলেছিলাম,‌ ‘চলো আমরা একটা টেলিভিশন কিনে আনি, এখন নিশ্চয়ই বঙ্গবন্ধুকে টেলিভিশনে দেখাবে!’ শুধুমাত্র তাকে দেখার জন্য আমরা একটা টেলিভিশন কিনে এনেছিলাম!

আমরা আমাদের চোখের সামনে বাংলাদেশকে জন্ম নিতে দেখেছি। আমরা এ দেশের ইতিহাসের সাক্ষী, ইতিহাসের অংশ। আমাদের চোখের সামনে বঙ্গবন্ধু ধীরে ধীরে বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠেছিলেন। শৈশব-কৈশোরে তার সব কিছুর গুরুত্ব সব সময় বুঝতে পারিনি। এখন বড় হয়ে যখন পেছনে ফিরে তাকাই, তখন বিস্মিত হই, কখনো রোমাঞ্চিত হই, হতচকিত হয়ে যাই।

কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে একজন মানুষ হিসেবে অনুভব করার অবিশ্বাস্য ঘটনাটি ঘটেছে ২০১২ সালে, যখন তার নিজের হাতের লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইটি হাতে পেয়েছি। আমি যখন নেলসন ম্যান্ডেলার আত্মজীবনী পড়ছিলাম, তখন আমার বারবার মনে হয়েছিল, বছরের হিসেবে আমাদের বঙ্গবন্ধু তো নেলসন ম্যান্ডেলা থেকে খুব একটা কম সময় জেলে ছিলেন না, অবদান হিসেবে তার অবদানতো নেলসন ম্যান্ডেলার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। তাহলে তিনি কেন তার মতো করে নিজের আত্মজীবনীটা লিখে ফেললেন না- আমরা কেন সেটি পড়ে রোমাঞ্চত হওয়ার সুযোগ পেলাম না। তাই শেষ পর্যন্ত যখন বঙ্গবন্ধুর নিজ হাতের লেখা আবিষ্কৃত হল, সেটি প্রকাশিত হল, আমার আনন্দের সীমা ছিল না।

শিশু-কিশোররা যেভাবে রুদ্ধশ্বাসে ডিটেকটিভ বই পড়ে, আমি ঠিক সেভাবে রুদ্ধশ্বাসে বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনীটি পড়েছি। আমি মনে করি, এই বইটি আমাদের দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি বই। যারা দেশকে ভালোবাসে, তাদের সবাইকে এই বইটি পড়তে হবে। যারা দেশের ইতিহাস জানতে চায়, তাদেরকে এই বই পড়তে হবে। যারা দেশ শাসন করে, তাদেরকে এই বই পড়তে হবে। যারা দেশ শাসন করতে চায়, তাদেরকেও এই বই পড়তে হবে। এই বইটি পড়লেই শুধুমাত্র একজন মানুষ বুঝতে পারবে কীভাবে একজন মানুষ একটি জাতি হয়ে ওঠে, একটি জাতি কীভাবে দেশ হয়ে ওঠে।

২.
বইটিতে অসংখ্য বিষয় আছে। যেমন ধরা যাক, বাঙালিদের কথা। তিনি বাঙালিদের কীভাবে দেখেছেন? বইয়ের অনেক জায়গায় তাদের কথা লেখা আছে। আমার পছন্দের একটা অংশ যখন তাদেরকে পাকিস্তানিদের সাথে তুলনা করেছেন (পৃষ্ঠা ২১৪): ‘প্রকৃতির সাথে মানুষের মনেরও একটা সম্বন্ধ আছে। বালুর দেশের মানুষের মনও বালুর মত উড়ে বেড়ায়। আর পলিমাটির বাংলার মানুষের মন ঐ রকমই নরম, ঐ রকমই সবুজ। প্রকৃতির অকৃপণ সৌন্দর্যে আমাদের জন্ম, সৌন্দর্যই আমরা ভালবাসি’।

বাঙালির চরিত্রের নিখুঁত ব্যাখ্যাও করেছেন অন্য জায়গায় (পৃষ্ঠা ৪৭): ‘আমাদের বাঙালির মধ্যে দুইটা দিক আছে। একটা হল ‘আমরা মুসলমান, আর একটা হল আমরা বাঙালি। পরশ্রীকাতরতা এবং বিশ্বাসঘাতকতা আমাদের রক্তের মধ্যে রয়েছে। বোধহয় দুনিয়ার কোন ভাষাতেই এই কথাটা পাওয়া যাবে না, ‘পরশ্রীকাতরতা’ পরের শ্রী দেখে যে কাতর হয়, তাকে ‘পরশ্রীকাতর’ বলে। ঈর্ষা, দ্বেষ সকল ভাষাতেই পাবেন, সকল জাতির মধ্যেই কিছু কিছু আছে, কিন্তু বাঙালিদের মধ্যে আছে পরশ্রীকাতরতা। ভাই ভাইয়ের উন্নতি দেখলে খুশি হয় না। এই জন্যই বাঙালি জাতির সকল রকম গুণ থাকা সত্ত্বেও জীবনভর অন্যের অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে। নিজেকে এরা চেনে না, আর যতদিন চিনবে না এবং বুঝবে না ততদিন এদের মুক্তি আসবে না’।

বাঙালিদের নিয়ে এর চেয়ে খাটি মূল্যায়ন আমার চোখে আর কখনো পড়েনি।

এই বাঙালিদের জন্যে তার বুকে ছিল গভীর ভালোবাসা। নির্বাচনের সময় একবার হেঁটে হেঁটে প্রচারণার কাজ চালাচ্ছেন। তখন এক হতদরিদ্র বৃদ্ধা মহিলার সাথে দেখা। বঙ্গবন্ধুকে দেখার জন্যে কয়েক ঘণ্টা থেকে দাঁড়িয়ে আছে, তাকে ধরে নিজের কুঁড়েঘরে এক বাটি দুধ, একটা পান আর চার আনা পয়সা দিয়েছে, বলেছে, ‘খাও বাবা, আর পয়সা কয়টা তুমি নেও, আমার তো কিছু নেই’। বঙ্গবন্ধু সেই পয়সা না নিয়ে উল্টো তাকে সাহায্য করার চেষ্টা করেছিলেন, লাভ হয়নি।

সেই হতদরিদ্র মহিলার বাড়ি থেকে বের হবার পর, বঙ্গবন্ধু লিখছেন (পৃষ্ঠা ২৫৬): ‘নীরবে আমার চক্ষু দিয়ে দুই ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়েছিল, যখন তার বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসি। সেইদিনই আমি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, মানুষরে ধোঁকা আমি দিতে পারব না’।

আমরা সবাই জানি, বঙ্গবন্ধু তার এই জীবনে প্রতিজ্ঞা কখনো ভঙ্গ করেননি।

‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ এই পুরো বইটার একটা বড় অংশ হচ্ছে কীভাবে বঙ্গবন্ধু মুসলিম লীগের গুণ্ডা আর পুলিশের নির্যাতন সহ্য করেছেন, জেল খাটছেন। পাকিস্তানের জন্যে আন্দোলন করেছেন। কিন্তু দেশ বিভাজনের পরপরই খুবই দ্রুত মুসলিম লীগের ওপর বীতশ্রদ্ধ হয়ে গেছেন। আর এই মুসলিম লীগ সরকার তার ওপর নির্যাতন করছে, বিনা বিচারে দিনের পর দিন জেলখানায় আটকে রাখছে।

এক জায়গায় বর্ণনা আছে, মাওলানা ভাসানীকে নিয়ে শোভাযাত্রা করছেন তখন পুলিশ আক্রমণ করেছে। বঙ্গবন্ধু লিখছেন (পৃষ্ঠা ১৩২): ‘আমার উপরও অনেক আঘাত পড়ল। এক সময় প্রায় বেহুঁশ হয়ে এক পাশের নর্দমায় পড়ে গেলাম। আমার পা দিয়ে খুব রক্ত পড়ছিল। কেউ বলে গুলি লেগেছে, কেউ বলে গ্যাসের ডাইরেক্ট আঘাত, কেউ বলে কেটে গেছে পড়ে যেয়ে’। তারপর কীভাবে ধরাধরি করে পার্টির অফিসে নিয়ে যাওয়া হল তার বর্ণনা আছে। সেখানে একটু চিকিৎসা করে বেদনায় কষ্ট পাচ্ছিলেন বলে ইনজেকশন দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেওয়া হল। কিন্তু গভীর রাতে পুলিশ এলো তাদের গ্রেফতার করতে।

মাওলানা ভাসানী খবর দিয়েছিলেন যেন কোনোভাবে গ্রেফতার না হন। তাই লিখছেন, ‘আমার শরীরে ভীষন বেদনা, জ্বর ওঠেছে, নড়তে পারছি না। কি করি, তবুও উঠতে হল এবং কি করে ভাগব তাই ভাবছিলাম। তিন তলায় আমরা থাকি, পাশেই একটা দোতলা বাড়ি ছিল। তিন তলা থেকে দোতলায় লাফিয়ে পড়তে হবে। দুই দালানের ভিতর ফারাকও আছে। নিচে পড়লে শেষ হয়ে যাব। তবুও লাফ দিয়ে পড়লাম’।

আমরা হলিউডের ছবিতে এরকম দৃশ্য দেখে অবিশ্বাসের হাসি হেসে থাকি। কিন্তু এটা হলিউডের ছবি নয়; বঙ্গবন্ধুর নিজের জীবনের ঘটনা, নিজের হাতে লেখা।

একবার পাকিস্তান থেকে দিল্লি হয়ে বঙ্গবন্ধু পূর্ব বাংলায় ফিরে আসছেন। তিনি জানেন তাকে গ্রেফতার করা হবে। তিনিও প্রস্তুত আছেন, তার ভাষায় (পৃষ্ঠা ১৪৫): ‘আমিও প্রস্তুত আছি। তবে ধরা পড়ার পূর্বে একবার বাবা-মা, ভাই-বোন, ছেলে-মেয়েদের সাথে দেখা করতে চাই। কারণ (পৃষ্ঠা ১৪৬), কয়েক মাস পূর্বে আমার বড় ছেলে কামালের জন্ম হয়েছে, ভাল করে দেখতেও পারি নাই ওকে। হাচিনা তো আমাকে পেলে ছাড়তেই চায় না’ (এই বইয়ে শেখ হাসিনাকে বঙ্গবন্ধু সবসময় হাচিনা লিখেছেন)।

এরপর পুলিশের চোখে ধূলা দেওয়ার জন্যে ট্রেনে স্টেশনে কী করছেন তার চমকপ্রদ বর্ণনা আছে। সবচেয়ে বিচিত্র্য বর্ণনা হচ্ছে জাহাজে ওঠার অংশটুকু। বঙ্গবন্ধুর ভাষায় (পৃষ্ঠা ১৪৬): ‘সকল যাত্রী নেমে যাওয়ার পরে আমার পাঞ্জাবী খুলে বিছানার মধ্যে দিয়ে দিলাম। লুঙ্গি পরা ছিল, লুঙ্গিটা একটু উপরে উঠিয়ে বেধে নিলাম। বিছানাটা ঘাড়ে, আর সুটকেসটা হাতে নিয়ে নেমে পড়লাম। কুলিদের মত ছুটতে লাগলাম, জাহাজ ঘাটের দিকে। গোয়েন্দা বিভাগের লোক তো আছেই। চিনতে পারল না’।

বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার এড়িয়ে শেষ পর্যন্ত বাড়ি পৌঁছাতে পেরেছিলেন, অল্প কিছুদিন স্ত্রী পুত্র কন্যার কন্যার সাথে কাটাতে পেরেছিলেন। যখন যাবার সময় হয়েছে তখন লিখছেন (পৃষ্ঠা ১৬৪): ‘ছেলেমেয়েদের জন্য যেন একটু বেশি মায়া হয়ে উঠেছিল। ওদের ছেড়ে যেতে মন চায় না, তবুও তো যেতে হবে। দেশ সেবায় নেমেছি, দয়া মায়া করে লাভ কি? দেশকে ও দেশের মানুষকে ভালোবাসলে ত্যাগ তো করতেই হবে এবং সে ত্যাগ চরম ত্যাগও হতে পারে’।

বঙ্গবন্ধু যখন এই বাক্যটি লিখেছিলেন তখন কী তিনি জানতেন, তার জন্যে একদিন এটি কত বড় একটি সত্য হয়ে দাঁড়াবে?

জেলখানায় থাকতে থাকতে তার ছেলে মেয়েরা বড় হয়ে গেছে। অনেক কষ্টে একবার ছাড়া পেয়ে বাড়ি এসে সকাল বেলা বিছানায় বসে স্ত্রীর সাথে গল্প করছেন। তার ছেলে মেয়ে নিচে বসে খেলছে। বঙ্গবন্ধু লিখছেন (পৃষ্ঠা ২০৯): ‘হাচু মাঝে মাঝে খেলা ফেলে আমার কাছে আসে আর ‘আব্বা’ ‘আব্বা’ বলে ডাকে। কামাল চেয়ে থাকে। এক সময় কামাল হাচিনাকে বলছে, ‘হাচু আপা, হাচু আপা, তোমার আব্বাকে আমি একটু আব্বা বলি’। বঙ্গবন্ধু তখন বিছানা থেকে নেমে ছেলেকে কোলে নিয়ে বললেন, ‘আমি তো তোমারও আব্বা’। তার ছেলে তাকে চেনে না তাই কাছে আসতে চাইত না, এই প্রথমবার বাবার গলা ধরে পড়ে রইল।

লেখক-সাহিত্যিকেরা বানিয়ে বানিয়ে কতো কী লিখে পাঠকদের মন দুর্বল করে ফেলেন। কিন্তু এরকম সত্যি ঘটনা কী তারা লিখতে পারবেন?

ভাষা আন্দোলনের সময় বঙ্গবন্ধু জেলে, দুই বছরের থেকে বেশি সময় বিনা বিচারে জেলে আটকা পড়ে আছেন, তখন ঠিক করলেন মুক্তির জন্য আমরন অনশন করবেন। খবর পেয়ে কর্তৃপক্ষ তাকে এবং তার রাজনৈতিক সহকর্মীকে ফরিদপুর জেলে পাঠিয়ে দিয়েছে।

অনশন শুরু হওয়ার দুই দিনের ভেতর খুব শরীর খারাপ হলে তাদের হাপসপাতালে পাঠানো হলো। বঙ্গবন্ধুর নাকে ঘা হয়ে গেছে, রক্ত আসে, যন্ত্রণায় ছটফট করেন। যখন বুঝতে পারলেন আর বেশিদিন বাঁচবেন না, গোপনে কয়েক টুকরা কাগজ আনিয়ে তার বাবা, স্ত্রী এবং দুই রাজনৈতিক নেতা সোহরাওয়ার্দী এবং মওলানা ভাসানীকে চিঠি লিখলেন। কারণ, তখন বুঝে গেছেন কয়েকদিন পর তার লেখার শক্তি থাকবে না।

বঙ্গবন্ধু অনশনে কিভাবে ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ছিলেন তার বর্ণনা দিয়েছেন। চিঠি চারটি ঠিকভাবে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করেছেন। লিখেছেন (পৃষ্ঠা ২০৪): ‘আমাদের অবস্থা এমন পর্যায়ে এসে পরেছে যে কোনো মূহুর্তে মৃত্যুর শান্তি ছায়ায় চিরদিনের জন্য স্থান পেতে পারি। সিভিল সার্জন সাহেব দিনের মধ্যে পাঁচ সাতবার আমাদের দেখতে আসেন। ২৫ তারিখ সকালে যখন আমাকে তিনি পরীক্ষা করছিলেন হঠাৎ দেখি তার মুখ গম্ভীর হয়ে গেছে। তিনি কোনো কথা না বলে মুখ কালো করে বেরিয়ে গেলেন। আমি বুঝলাম, আমার দিন ফুরিয়ে গেছে।...ডেপুটি জেলর সাহেব বললেন, ‘কাউকে খবর দিতে হবে কিনা? আপনার ছেলেমেয়ে ও স্ত্রী কোথায়? আপনার আব্বার কাছে কোন টেলিগ্রাফ করবেন’? বললাম, ‘দরকার নাই। আর তাদের কষ্ট দিতে চাই না। আমি আশা ছেড়ে দিয়েছি, হাত পা অবশ হয়ে আসছিল’।

এভাবে আরো দুদিন কেটে গিয়েছে। বঙ্গবন্ধু লিখছেন (পৃষ্ঠা ২০৫): ‘২৭ তারিখ রাত আটটার সময় আমরা দুইজন চুপচাপ শুয়ে আছি। কারো সাথে কথা বলার ইচ্ছাও নাই, শক্তিও নাই। দুজনেই শুয়ে শুয়ে কয়েদির সাহায্যে ওজু করে খোদার কাছে মাপ চেয়ে নিয়েছি’।

বঙ্গবন্ধু মৃত্যুর জন্য পুরোপুরি প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অনশনে তাকে মৃত্যুবরণ করেতে হয়নি। তাদের এই জীবন বাজি ধরা আন্দোলনের কাছে সরকার মাথা নত করে তাদের মুক্তি দিতে বাধ্য হয়েছিল।

পুরো বইটিতে অন্যরকম অসংখ্য ঘটনার বর্ণনা আছে। কীভাবে একেবারে শূন্য থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে একটি রাজনৈতিক দল গড়ে তুলেছেন তার নিখুঁত বর্ণনা আছে। ষড়যন্ত্র, সাম্প্রদায়িকতা, বাধাবিপত্তি, ভয়ঙ্কর অর্থকষ্ট, পুলিশের নির্যাতন, বিশ্বাসঘাতকতা সবকিছুকে সামাল দিয়ে কীভাবে একটা রাজনৈতিক দল গড়ে তুলতে হয়, সেটি এর চাইতে সুন্দর করে আর কোনো বইতে লেখা আছে বলে আমার জানা নাই।

মাঝে মাঝে যে হাস্যরস বা কৌতুক নেই তা নয়। রাতের বেলা নৌকা করে যাচ্ছেন, বঙ্গবন্ধু ঘুমিয়ে আছেন তখন ডাকাত পড়েছে। এলাকার সবাই বঙ্গবন্ধুকে চেনেন, তাকে ভালোবাসে। ডাকাতরা যখন জানতে পারলো নৌকায় বঙ্গবন্ধু শুয়ে আছেন, তখন ডাকাতি না করেই মাঝিকে এক ঘাঁ দিয়ে বললো, ‘শালা আগে বলতে পারো নাই, শেখ সাহেব নৌকায়’।
ঘুম থেকে ওয়ে বঙ্গবন্ধু ঘটনা শুনে বললেন, (পৃষ্ঠা ১২৫): ‘বোধহয় ডাকাতরা আমাকে ওদের দলের একজন বলে ধরে নিয়েছে’।

আরেকবার জনসভায় মওলানা ভাসানীকে নিয়ে বক্তৃতা করতে গিয়েছেন, পুলিশ তখন ১৪৪ ধারা জারি করে দিয়েছে, কেউ আর বক্তৃতা করতে পারবে না। বঙ্গবন্ধু তেজস্বী মানুষ, বললেন (পৃষ্ঠা ১২৮): ‘মানি না ১৪৪ ধারা, আমি বক্তৃতা করবো’। মাওলানা সাহেব দাঁড়িয়ে বললেন, ‘১৪৪ ধারা জারি হয়েছে আমাদের সভা করতে দেবে না। আমি বক্তৃতা করতে চাই না। তবে আসুন আপনারা মোনাজাত করুন, আল্লাহ আমিন’। মাওলানা সাহেব মোনাজাত শুরু করলেন। মাইক্রোফোন সামনেই আছে। আধ ঘণ্টা চিৎকার করে মোনাজাত করলেন, কিছুই বাকি রাখলেন না, যা বলার সবই বলে ফেললেন। পুলিশ অফিসার সেপাইরা হাত তুলে মোনাজাত করতে লাগলেন। আধা ঘণ্টা মোনাজাত পুরো বক্তৃতা করে মাওলানা সাহেব সভা শেষ করলেন। পুলিশ ও মুসলিম লীগ ওয়ালারা বেয়াকুফ হয়ে গেলো! পুরো দৃশ্যটা কল্পনা করে এতোদিন পরে আমরা হেসে কুটি কুটি হই।

৩.
এই অসাধারণ বইটি সম্পর্কে লিখে শেষ করার কোনো সুযোগ নেই। তারপরও আমি বই থেকে নানা বিষয় বঙ্গবন্ধুর কিছু কথা তুলে দেই। যেহেতু তিনি আপাদমস্তক রাজনীতিবিদ, তাই তার রাজনীতি নিয়ে কথাগুলো সবচেয়ে সুন্দর। রাজনীতি কখনো দলবাজি হিসেবে দেখেননি। লিখেছেন, (পৃষ্ঠা ২৩৯): ‘ম্যানিফোস্টা বা ঘোষণাপত্র না থাকলে কোনো রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান চলতে পারে না। আমলাতন্ত্র দুই চোখে দেখতে পারতেন না’।

আবার একই সাথে অযোগ্য রাজনীতিবিদদের সম্পর্কে এভাবে সতর্ক করেছেন, (পৃষ্ঠা ২৭৩): অযোগ্য নেতৃত্ব, নীতিহীন নেতা ও কাপুরুষ রাজনীতিবিদদের সাথে কোনোদিন একসাথে হয়ে দেশের কোনো কাজে নামতে নেই’। বামপন্থি রাজনীতি সম্পর্কে বলেছেন, (পৃষ্ঠা ২৩৪): ‘আমি নিজে কমিউনিস্ট নই। তবে সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করি এবং পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে বিশ্বাস করি না’।

আমাদের দেশে বামপন্থী রাজনীতি কেন কখনো বেশি সুবিধা করতে পারেনি, বঙ্গবন্ধু সেটি অর্ধশত বছরের আগে বিশ্লেষণ করেছে। তার বামপন্থী বন্ধুদের উল্লেখ করে বলেছেন, (পৃষ্ঠা ১০৯): ‘জনসাধারণ চলছে পায়ে হেঁটে, আর আপনারা আদর্শ নিয়ে উড়োজাহাজে চলছেন। জনসাধারণ আপনাদের কথা বুঝতেও পারবে না, আর সাথেও চলবে না। যতটুকু হজম করতে পারে ততটুকু জনসাধারণের কাছে পেশ করা উচিৎ’।

অতি প্রগতিবাদীদের সম্পর্কেও তার কথাটা তখনো সত্যি ছিলো এখনো সত্যি, (পৃষ্ঠা ২৪৫): ‘অতি প্রগতিবাদীদের কথা আলাদা। তারা মুখে চায় ঐক্য। কিন্তু দেশের জাতীয় নেতাদের জনগণের সামনে হেয় প্রতিপন্ন করতে এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলি যাতে জণগণের আস্থা হারিয়ে ফেলে , চেষ্টা করে সেজন্যে!’

তবে বঙ্গবন্ধুর কাছে রাজনীতির বিষয়টি ছিল খুবই স্পষ্ট এবং সেটি ছিল খুবই মহৎ কাজ। বার বার বলেছেন, (পৃষ্ঠা ১২৮) ‘যেকোনো মহৎ কাজ করতে হলে ত্যাগ ও সাধনার প্রয়োজন। যারা জীবনে ত্যাগ করতে প্রস্তুত নয়, তারা জীবনে কোনো ভাল কাজ করতে পারে নাই’। রাজনীতি করে তার জীবনে এক প্রকার পূর্ণতা এসেছিল। কারণ, নির্বাচনে মুসলিম লীগকে পুরোপুরি ধরাশায়ী করে লিখেছেন, (পৃষ্ঠা ২৫৭): ‘আমার ধারণা হয়েছিল, মানুষকে ভালবাসলে মানুষও ভালবাসে। যদি সামান্য ত্যাগ স্বীকার করেন, তবে জনসাধারণ আপনার জন্য জীবন দিতেও পারে’।

বঙ্গবন্ধু মানুষের ভালোবাসা পেয়েছিলেন। একবার নয়, বার বার।

৪.
এই লেখার শুরুতে আমি বলেছিলাম, ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইটি সবার পড়া উচিৎ- যারা দেশ চালাচ্ছে তাদেরও। আমার কেন জানি মনে হয়, যারা দেশ চালাচ্ছ্নে, তাদের সবাই এই বইটি পড়েননি- কিংবা তার চাইতেও দুঃখের বিষয় হয়তো বইটি পড়েছেন কিন্তু বঙ্গবন্ধুর কথাগুলো বিশ্বাস করেননি।

আমার এ রকম মনে হওয়ার কারণ হচ্ছে, এই বইয়ে সবচেয়ে বেশি যে কথাটি লেখা হয়েছে সেটি হচ্ছে (পৃষ্ঠা ১২৬): ‘শক্তিশালী বিরোধী দল না থাকলে গণতন্ত্র চলতে পারে না’ কিংবা (পৃষ্ঠা ১২০): ‘বিরোধী দল সৃষ্টি করতে না পারলে এ দেশে একনায়কতন্ত্র চলবে’।

শক্তিশালী বিরোধী দল দূরে থাকুক আমরা কী এই দেশে কোনো বিরোধী দল দেখতে পাচ্ছি? দেশে আসলে কোনো বিরোধী দল নেই, একটা গৃহপালিত বিরোধী দল আছে। তাদের থাকা না থাকায় কিছু আসে যায় না।

জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে রাজনীতি করে এবং বঙ্গবন্ধুকে অস্বীকার করে বলে আমি মনে করি, এই দেশে বিএনপির রাজনীতি করার কোনো নৈতিক অধিকার নেই। এখন বাকি আছে সংবাদ মাধ্যম। যতোই দিন যাচ্ছে আমার দেখছি সংবাদ মাধ্যমগুলোকে কেমন জানি গলাটিপে ধরা হচ্ছে। মন্ত্রীরা কারণে-অকারণে আজকাল সাংবাদিকদের গালাগাল করেন, ভয়-ভীতি দেখান। গণজাগরণ মঞ্চ যখন আওয়ামী লীগের সমালোচনা করল, তখন তাদেরকেও দুই টুকরো করে দেওয়া হলো। পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে বলে আমি যখন চেচামেচি করছিলাম, তখন আমাকে নানাভাবে উপদেশ দেওয়া হয়েছিল, আমি যেন সরকারকে বিপদে না ফেলি।

বঙ্গবন্ধু বার বার বলেছেন, সরকারকে ঠিক রাখতে হলে একটা শক্তিশালী বিরোধী দল দরকার। আমি এই দেশে তাই একটা বিরোধী দল খুঁজে বেড়াই। মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের একটা বিরোধী দল।
সেটি কোথায়?

লেখক - © মুহম্মদ জাফর ইকবাল : অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়;