Tuesday, 31 March 2015

নারী-পুরুষে রচিত মানব সভ্যতা

দয়াময়ের করুণাতেই তো বেঁচে আছি আমরা। তার করুণা ছাড়া কোনো সৃষ্টির অস্তিত্বের কল্পনা সম্ভব নয়। জগতের চিরস্থায়ী সুখ অথবা দুঃখ নির্ধাণের পরীক্ষার জন্যই আমাদের পাঠানো হয়েছে এ দুনিয়ায়। কোরআনে এরশাদ হচ্ছে ‘যিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন, যেন তোমাদের পরীক্ষা করেন যে, তোমাদের মধ্যে কাজে কে অধিক উত্তম’। দুনিয়ার সামান্য এ ক্ষণটি আমাদের পরীক্ষার সময়, মূল গন্তব্য আখিরাতের পথে। তাই পরীক্ষার হলে যেমন নির্দিষ্ট কিছু নিয়মে চলতে হয়। দুনিয়ার সময়টি যথার্থ ও আনন্দময় করার জন্য মানবজাতিকে সৃষ্টিগতভাবে নারী ও পুরুষের সমন্বয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে, নারী ও পুরুষ মিলেই পূর্ণ হয়েছে মানবসভ্যতা। আর নারী ও পুরুষের মাঝে সামান্য কিছু পার্থক্য মূলত কোনো বিভাজন নয়, বরং সৃষ্টির পূর্ণতা ও উৎকর্ষতার জন্যই একে অপরের পরিপূরক হিসেবে সৃজিত জুটি সৃষ্টার অপরূপ ও মমতাময়ী সৃষ্টি নারীজাতি। পবিত্র কোরআনে নারীদের ব্যাপারে আল্লাহর বাণী- হে মানব সমাজ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় করো, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং যিনি তার থেকে তার সঙ্গিনীকে সৃষ্টি করেছেন, আর বিস্তার করেছেন তাদের দু’জন থেকে অগণিত পুরুষ ও নারী। তেমনি আল্লাহকে ভয় কর, যার নামে তোমরা একে অপরের নিকট যাচনা করে থাক এবং আত্মীয়-স্বজনদের ব্যাপারে সতর্ক থাক। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের ব্যাপারে সচেতন রয়েছেন।’ এটি সূরা নিসার প্রথম আয়াত।

[‘নিসা’ শব্দটির অর্থ নারী।] এ সূরা নিসা নামটিই প্রমাণ করে কোরআন নারী জাতিকে, কি সম্মান দিয়েছে। মূলত এ আয়াতটি নারী জাতি সম্পর্কে ইসলামের ভাবধারা, ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি এবং পুরুষ ও নারীর পারস্পরিক দায়িত্ব-কর্তব্য ও সম্পর্কের রূপরেখা সম্পর্কে পূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে। প্রথমত আল্লাহতায়ালা এ আয়াতে কারিমায় ইরশাদ করেন, এ দুই শ্রেণীর সৃষ্টি একই পদ্ধতিতে হয়েছে। এ দুই শ্রেণীর ভাগ্য পরস্পরের সঙ্গে জড়িত। যেন একই দেহের দুটি অঙ্গ। পুরুষ ও নারীর শারীরিক গঠনাকৃতিতে সামান্য পার্থক্যের কারণ হচ্ছে, যাতে দু’জন তাদের জীবন সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যে পাড়ি দিতে পারে। কেননা প্রথমত এ দুই জাতির অস্তিত্ব একই সত্তা থেকে। তারপর ওই এক সত্তাকে দু’ভাগে ভাগ করে দেয়া হয়েছে। এতদসত্ত্বেও এ দু’জাতির মধ্যে কোনো বিরোধ-বৈপরিত্য নেই। বরং অবশেষে তারা গিয়ে একই কেন্দ্রে মিলিত হয়।

এ পৃথিবীতে সফররত মানুষকে তার সফরসঙ্গী স্বজাতি থেকে দেয়া হয়েছে আর সে তারই শরীরের অংশ। এরপর ওই দু’জনের মাধ্যমে মানব প্রজন্মের সৃষ্টি ও বিস্তার হয়েছে। আল্লাহতায়ালা দু’জনের বন্ধুত্ব, প্রেম-ভালোবাসা ও সহযাত্রায় বরকত দান করেছেন। ফলে যারা মাত্র দু’জন ছিল, তাদের থেকে জন্ম নিয়েছে শত-সহস্র আর হাজার থেকে লাখলাখ কোটি। এমনকি মানব জাতির নির্ভুল পরিসংখ্যান কেউই দিতে পারবে না, কত কত মানুষ সৃষ্টি হয়েছে, তা একমাত্র আল্লাহই জানেন। ‘কাসিরা’ শব্দে সে ইঙ্গিতই করেছেন আল্লাহ।

এত গেল সৃষ্টির সূচনা ও নারীর সৃষ্টিগত মর্যাদার বিষয়। এখন আমরা দেখব সামাজিকভাবে ইসলাম নারীর কতটুকু মূল্যায়ন করেছে এবং সামাজিক অধিকার নিশ্চিত করেছে, সূরা আহযাবের ৩৫নং আয়াতের অর্থ ‘নিশ্চয় মুসলমান পুরুষ, মুসলমান নারী, ঈমানদার পুরুষ, ঈমানদার নারী, অনুগত পুরুষ, অনুগত নারী, সত্যবাদী পুরুষ, সত্যবাদী নারী, ধৈর্যশীল পুরুষ, ধৈর্যশীল নারী, বিনীত পুরুষ, বিনীত নারী, দানশীল পুরুষ, দানশীলা নারী, রোজা পালনকারী পুরুষ, রোজা পালনকারী নারী, যৌনাঙ্গ হেফাজতকারী পুরুষ, যৌনাঙ্গ হেফাজতকারী নারী, আল্লাহর অধিক জিকিরকারী পুরুষ ও জিকিরকারী নারী- তাদের জন্য আল্লাহ প্রস্তুত রেখেছেন ক্ষমা ও মহাপুরস্কার।’ দেখুন, আল্লাহর বাণী কত প্রজ্ঞাময়, পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য এ আমলগুলোর চেয়ে উত্তম প্রতিষেধক আর কি হতে পারে। কাজেই মহান আল্লাহ ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারীদের ঐক্যবদ্ধ আর কল্যাণ তাকওয়ার কাজে পরস্পর সাহায্যকারী রূপে দেখতে চান। তিনি ইরশাদ করেন ‘আর ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারী একে অপরের সহায়ক। তারা ভালো কথার শিক্ষা দেয় এবং মন্দ থেকে বিরত রাখে। নামাজ প্রতিষ্ঠা করে, জাকাত দেয় এবং আল্লাহ ও তার রাসূলের নির্দেশ অনুযায়ী জীবনযাপন করে। এদেরই ওপর আল্লাহর দয়া করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ পরাক্রমশালী, সুকৌশলী’। (সূরা ওতওবা : ৭১)।

ইসলামে নারীর অবস্থান ও মর্যাদা স্পষ্ট, প্রথমত নারীকে আলাদাভাবে দেখার সুযোগ নেই। তাই শিক্ষা-দীক্ষার ক্ষেত্রে নারীর পিছিয়ে থাকার কোনো অবকাশ নেই। আজকের এ সময়ে আমাদের নারীরা সমাজে বিভিন্নভাবে হয়রানি ও লাঞ্ছনার শিকার হচ্ছে। মানুষ হিসেবে এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত লজ্জার বিষয়। বিশ্বজুড়েই নারীরা আজ নিগৃহিত হচ্ছে বিভিন্নভাবে। তাই সৃষ্টির উৎস মমতাময়ী নারী জাতির সামগ্রিক কল্যাণ ও উন্নতির জন্য আল্লাহর বিধানই হতে পারে একমাত্র মুক্তির সনদ।

© তানজিল আমির
www.facebook.com tanjil amirl

বর্ণবাদের আগুন এবং মানবতার সাম্যবাদ

মানুষের বড় পরিচয় সে মানুষ। পৃথিবীর সব মানুষ মিলে যে বিরাট এক মানবপরিবার প্রতিটি মানুষ সেই গর্বদীপ্ত সংসারের সদস্য। সম্মান ও গৌরবের এই অম্লান মুকুট প্রতিটি মানুষের জন্মগত অর্জন। এই মুকুট ছিনিয়ে নেওয়ার অধিকার নেই কারও। সাদা-কালো, ধনী-গরিব, উঁচু-নিচু আরব আজমÑ এসবই ক্ষুদ্রতার হিংস্র নখর। এই নখর যখনই যেখানেই উদ্যত হয় রক্তাক্ত হয় মানবতা; বিক্ষত হয় মানবসভ্যতার বিমল বদন। মানব ও মানবতার চিরন্তন শত্রু এই বিভেদ দানব। ভেদাভেদের এই দানব যেখানেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে সেখানেই ধূলিসাৎ হয়েছে মানব জীবনের সমূহ শৃঙ্খলা। ভেঙে গেছে মানবতার সব আয়োজন। মানুষ নেমে গেছে পশুর স্তরে।
মানবজাতির অতীত ইতিহাসজুড়ে যেমন ছড়িয়ে আছে ভেদাভেদতাড়িত এমন অনেক কলঙ্কের ইতিহাস, তেমনি আছে মানুষের মাথা উঁচু করা অনেক উজ্জ্বল অর্জন। বলতে দ্বিধা নেই, মানুষ হিসেবে যতটুকু মানমর্যাদা এবং সম্মানের আশিস আমরা আমাদের দয়াময় সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে লাভ করেছি সেটাই আমাদের শ্রেষ্ঠ অর্জন। শাশ্বত ধর্মগ্রন্থ পবিত্র কোরআনে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন ‘হে মানুষ! আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ এক নারী থেকে। তারপর তোমাদের বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রেÑ যাতে তোমরা পরস্পরে পরিচিত হতে পার। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সেই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন যে তোমাদের মধ্যে অধিক আল্লাহভীরু। নিশ্চয় আল্লাহ সব কিছু জানেন এবং সব খবর রাখেন।’ [হুজুরাত : ১৩]

অর্থাৎ সমুদয় মানুষ একজন পুরুষ ও একজন নারীর সন্তান। একই নারী-পুরুষের সন্তানদের মধ্যে যেমন মান ও রঙের কোনো ভেদাভেদ থাকতে পারে না তেমনি পৃথিবীর কোনো মানুষের সঙ্গে অপর কোনো মানুষের বর্ণ, বংশ ও মানের ভেদাভেদ থাকতে পারে না। উচু-নিচুর কোনো প্রশ্নই দাঁড়াতে পারে না এখানে। এ শুধু বংশানুক্রমিক মানব ইতিহাসেরই দাবি নয়। যে মিথ্যা অহংবোধ জন্ম দেয় বিভেদের পঙ্ক এবং বিভাজনের কলঙ্ক কত শক্ত ভাষায় তার মূলোৎপাটন করেছেন মহান সৃষ্টিকর্তা। জগতের প্রতিটি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেছেনÑ ‘কালপ্রবাহে প্রতিটি মানুষের ওপর তো এমন একটি সময় এসেছিল যখন সে উল্লেখযোগ্য কিছুই ছিল না। আমি তো মানুষকে সৃষ্টি করেছি মিলিত শক্রবিন্দু থেকেÑ তাকে পরীক্ষা করার জন্য; আর এ জন্য আমি তাকে করেছি শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন। আমি তাকে পথের নির্দেশ দিয়েছিÑ হয় সে কৃতজ্ঞ হবে, না হয় সে অকৃতজ্ঞ হবে।’ আমি অকৃতজ্ঞদের জন্য প্রস্তুত করে রেখেছি শৃঙ্খল বেড়ি ও লেলিহান অগ্নিশিখা। [দাহর-৭৬:১-৪]

এটা পবিত্র কোরআনের ৭৬ নম্বর সুরা। এই সুরাটির দুটি নামÑ দাহর ও ইনসান। দাহর অর্থ কাল ও সময় আর ইসসান অর্থ মানুষ। মর্ম খুবই সরল। সামান্য পানি থেকে সৃষ্টিজগতের প্রতিটি মানুষের। ধনী-গরিব, রাজা-প্রজা, সাদা-কালো কোথাও এই নিয়মের ব্যত্যয় নেই। তাহলে কেন মানসম্মানে ব্যত্যয়ের হিংস্র প্রকাশ! কালপ্রবাহে প্রতিষ্ঠিত সর্বজনবিদিত মানবজীবনের এই মমতার সৃষ্টিগত রেখায় যারা সমর্পিত তারাই ‘মানুষ’। যারা সৃষ্টি ও জন্মের সুবাদে প্রাপ্ত এই শিক্ষাকে ভুলে যায়, ভুলে যায় একজন পুরুষ ও একজন নারীর বন্ধনে প্রতিষ্ঠিত বনুআদমিক সাম্যের আত্মীয়তা তারা মানুষ নয়Ñ মানুষ সমাজের কলঙ্ক! নজরুল ভালোই বলেছেন
গাহি সাম্যের গান
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান!
নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্মজাতি,
সব দেশে সব কালে ঘরে ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি!
[সঞ্চিতা : কবিতার নাম : মানুষ]

আমাদের নবীর কথা বলি! প্রখ্যাত সাহাবি হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. বলেন : আমি হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখলাম তিনি কাবা শরিফ তাওয়াফ করছেন এবং বলছেন : এত যে শ্রেষ্ঠ তুমি আর কত যে শ্রেষ্ঠ তোমার সুবাস! কত যে মহান তুমি আর কত যে মহান তোমার সম্মান! সেই আল্লাহর শপথ যার হাতে মুহাম্মদের প্রাণÑ একজন মুমিন বান্দার সম্মান আল্লাহর কাছে তোমার সম্মানের চেয়েও অধিক! তার জীবন ও সম্পদ সম্পর্কে অশুভ কিছু ভাবা যায় না।’ [আলমাকাসিদুল হাসানা, হাদিস : ১২২০]

 আমরা স্মরণ করতে পারি বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণের কথাও। লক্ষাধিক সাহাবির বিশাল সমাবেশে তিনি খাপখোলা তরবারির ভাষায় বলেছেনÑ হে লোক সকল! মনে রেখো! তোমাদের সকলের প্রভু একজন এবং তোমাদের পিতাও একজন। কোনো আরবি কোনো আজমির চাইতে শ্রেষ্ঠ নয়। নয় কোনো আজমি কোনো আজমি কোনো আরবির চাইতে শ্রেষ্ঠতর কোনো সাদা কোনো কালোর চেয়ে শ্রেষ্ঠ নয়; নয় কোনো কালো কোনো সাদার চেয়ে শ্রেষ্ঠ! তবে তাকওয়া ও আল্লাহভীরুতার বিাচরে... [মানবতার নবী : ৩৪]

কোনো সাদা কোনো কালোর চাইতে শ্রেষ্ঠ নয় এমন বাণী হয়তো আরও কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে! হয়তো পাওয়া যাবে কালো মানুষের পক্ষে বয়িত দীঘল দীঘল কবিতা এবং দার্শনিক অনেক রচনাও। কিন্তু সত্যিকার অর্থে সাদা-কালোর ভেদাভেদ ভেঙে সমাজজীবনে কালোকে সাদার সঙ্গে সমান গৌরবে সমান সম্মানে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর সংস্কৃতি নির্মাণে ইসলাম ও ইসলামের নবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে অবদান রেখেছেন তা সভ্যতার ইতিহাসে এক অবাককরা বাতিঘর! ধর্মদর্শন আর যাপিত জীবনের এমন মিল হয়তো আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। পৃথিবীর পূর্ব থেকে পশ্চিম অবধি যেখানেই মুসলমানের বাস সেখানেই বাজিয়ে দেখা যেতে পারে, আমাদের এই দাবি কতটা সত্য। এখনো প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষ কাবার প্রাঙ্গণে সমবেত হয় ওমরা করতে। ছুটে যায় পাক মদিনায় নবীজির কবর জিয়ারত করতে। সাদা-কালো আর আরব আজম কী যে আন্তরিকতায় মিশে যায় পথের বাঁকে বাঁকে! গভীর উষ্ণতায় করমর্দন করছে! পরস্পরে আলিঙ্গনে মিলিত হচ্ছে। হয়তো জীবনে এই প্রশ্ন সাক্ষাৎ। কিন্তু উদ্ভাসিত হাসি যে কথা অনুমান করতেও বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এরচেয়ে বড় কথাÑ মুসলমানদের শ্রেষ্ঠ ইবাদত নামাজে পৃথিবীজুড়ে কত যে কালো সাদাদের ইমাম হয়ে নেতৃত্ব দিচ্ছে তার কোনো হিসাব কষা যাবে?

এই বেলাল রা.-এর কথাই বলি! পৃথিবী একশ সত্তর কোটি মুসলমান যতটা সম্মান ও গৗরবের সঙ্গে স্মরণ করে হজরত আবু বকর সিদ্দিক, হজরত ওমর ফারুক, হজরত উসমান ও হজরত আলী রা.কে ঠিক ততটা আবেগ ও সম্মানেই স্মরণ করে হজরত বেলাল রা.কে। অথচ তিনি ছিলেন একজন হাবশি কৃষ্ণবর্ণ ক্রীতদাস! সমকালীন অর্ধেক পৃথিবীর শাসক হজরত ওমর রা. যখনই হজরত আবু বকর রা.-কে স্মরণ করতেন, স্মরণ করতেন হজরত বেলাল রা.-কেও। বলতেনÑ ‘আবু বকর আমাদের নেতা আর তিনি আজাদ করেছেন আমাদের নেতা বেলালকে।’ অথচ কেউ যখন নানা কৃতকর্মের কথা বলে মুখের ওপর প্রশংসা করত হজরত বেলাল বিনয়ের সঙ্গে মাথানত করে উত্তর দিতেনÑ ‘আমি তো একজন কৃষ্ণবর্ণ হাবশি... গতকালও এক ব্যক্তির ক্রীতদাস ছিলাম!

আমাদের ইতিহাসের এক উজ্জ্বলতম ঘটনা মক্কা বিজয়। আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও আর সম্মানিত সঙ্গীগণকে শুধু এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস ও সমর্পণের ‘অপরাধে’ আপন জন্মভূমি থেকে বিতাড়িত হতে হয়েছিল। মাত্র আট বছরের ব্যবধানে যখন ফিরে আসেন প্রিয় মক্কায় মহান বিজয়ীর বেশে তখন পুরো মক্কাকে আন্দোলিত করে কাবা শরিফের ছাদের ওপর দাঁড়িয়ে আজান দিয়েছিলেন হজরত বেলাল রা.! অতঃপর বিজিত মক্কাবাসীর উদ্দেশে প্রদত্ত ভাষণে আমাদের নবীজি বলেছিলেনÑ ‘হে কুরায়েশ সম্প্রদায়! আল্লাহতাআলা তোমাদের মূর্খতার যুগের অহঙ্কারকে চূর্ণ করে দিয়েছেন; চূর্ণ করে দিয়েছেন বাপ-দাদাদের নামের দাম্ভিকতাকে! শোন, সকল মানুষ এক আদমের সন্তান আর আদম ছিলেন মাটির তৈরি। [রিজালুন হাওলার রাসুল : ১০৪]

রঙ নয়Ñ গুণ ও চরিত্রের মাপে মানুষকে গ্রহণ করার এই যে শিক্ষা তিনি দিয়ে গেছেন আজও শিক্ষার সেই সরল রেখা থেকে একপা বিচ্যুত হয়নি মুসলিম উম্মাহ। শুভ্র ও ক্রীমবর্ণ পোশাকে চিকচিকে কালো কিশোরদের প্রাণময় উপস্থিতি যারা অন্তত একবার মক্কা শরিফ কিংবা মদিনা শরিফে দেখেছেনÑ শীতল করা কাজলবরণ সেই ছবি সেকি জীবনে কোনোদিন ভুলতে পারবে? এক কথায় বর্ণবৈষম্যের কলঙ্ক বিনাশে হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে অবদান রেখে গেছেন মানব ইতিহাসে তার কোনো তুলনা নেই।

বিশেষ করে তাকে মনে পড়ে তখন যখন এই একুশ শতকের বিদ্বান পৃথিবীতে বসে পড়তে হয় পত্রিকার শিরোনামÑ ‘কৃষ্ণাঙ্গ নাগরিককে শ্বাসরোধে হত্যা’ খালাস আরেক শ্বেতাঙ্গ পুলিশ।’ ঘটনা আমাদের মতো কোনো গরিব কিংবা শিক্ষাবঞ্চিত কোনো আফ্রিকান দেশের নয়। সরাসরি শিক্ষা ও সভ্যতার পীঠস্থান আমেরিকার। পত্রিকার ভাষায়Ñ যুক্তরাষ্ট্রে এবার আরও এক কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তি হত্যার দায়ে এক শ্বেতাঙ্গ পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন না করার সিদ্ধান্ত দিয়েছেন নিউইয়র্কের স্ট্যাটেন আইসল্যান্ড আদালতের একটি গ্যান্ড জুরি। যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় অনুযায়ী বুধবার (৩.১২.১৪) গ্র্যান্ড জুরি (মামলা চালানোর জন্য সাক্ষ্য-প্রমাণ মূল্যায়নকারী বিচারকদের বোর্ড) এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরপরই দেশটির বেশ কয়েকটি স্থানে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ব্যাপক বিক্ষোভের মুখে অবশেষে মার্টিন অ্যাটর্নি জেনারেল এরিক হোল্ডার জানান, কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনায় নাগরিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখতে কেন্দ্রীয়ভাবে তদন্তের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

এই হলো আমাদের উদার আমেরিকা! এখানে আমরা এও স্মরণ করছিÑ ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে দক্ষিণ আফ্রিকার সরকারের আদেশÑ ‘সকল আফ্রিকানকে তাদের সঙ্গে পরিচিত বই রাখতে হবেÑ এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর উদ্দেশ্যে ২১ মার্চ সে দেশের শার্পভিলে সমবেত বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশ গুলি চালায়। এতে শান্তিপূর্ণ ও নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের মধ্যে ৬৯ ব্যক্তি নিহত ও ১৮০ জন আহত হয়। অবশেষে ১৯৬৬ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ১৯৬০ সালের শার্পভিল ঘটনার স্মরণে ২১ মার্চ দিনটিকে আন্তর্জাতিকে বর্ণবৈষম্য বিলোপের আন্দোলন দ্বিগুণ তীব্র করার জন্য বিশ্ব সমাজকে অনুরোধ জানায়। সেই থেকে জাতিসংঘ সদস্যভুক্ত সব দেশে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। পালিত হয়ে আসছে বাংলাদেশেও। আমরা বিশ্বাস করিÑ এই দাবি মহৎ ও মানবিক। প্রশংসিত এই আয়োজন। তবে বর্ণবৈষম্যের আগুন থেকে পৃথিবীকে বাঁচাতে হতে হলে সমর্পিত হতে হবে পরীক্ষিত শরণালয়ে। পৃথিবীর দেড় হাজার বছরের যাপিত ইতিহাস এবং যুগযুগান্তের ধর্মদর্শনের ইতিহাস সাক্ষীÑ পৃথিবীর সব মানুষকে মর্যাদার একই চাদোয়ার নিচে যেভাবে সমবেত করতে পেরেছেন ইসলামের নবী তেমনটি আর কেউ পারেনি। তিনিই পেরেছেন স্পষ্ট করে বলতেÑ যারা মানুষকে সাম্প্রদায়িকতার দিকে ডাকে, যারা সাম্প্রদায়িকতার জন্য যুদ্ধ করে এবং সাম্প্রদায়িকতার জন্য জীবন উৎসর্গ করে তারা আমাদের সমাজভুক্ত নয়। [আবু দাউদ, হাদিস : ৫১২৩] সুতরাং দল গোষ্ঠী ও বর্ণবাদের কলঙ্ক থেকে বেরিয়ে আসতে হলে, পৃথিবীকে বাঁচাতে হলে বর্ণবাদের আগুন থেকে ফিরে যেতে হবে পাক মদিনায় হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে।

লেখক : মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীন, শিক্ষাবিদ ও কলামনিস্ট

Tuesday, 24 March 2015

ইসলাম অর্থ আল্লাহতে আত্মসমর্পিত হওয়া


ইসলাম অর্থ আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পণ করা এবং সম্পূর্ণভাবে সেই মহান সত্তার অনুগত থাকা। ইসলাম হলো আল্লাহর প্রেরিত দীন। এই দীন বা জীবন ব্যবস্থায় নিজের সত্তাকে সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর কাছে সমর্পিত করতে হয়। আল্লাহর প্রতি নিরঙ্কুশ আনুগত্যকে জীবনের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করতে হয়।

পবিত্র কোরআনের সূরা আলে-ইমরানের ৮৫ নম্বর আয়াতে ইরশাদ করা হয়েছে 'কেউ ইসলাম ব্যতীত অন্য কোনো জীবন ব্যবস্থা তালাশ করলে আদৌ তার থেকে তা গ্রহণ করা হবে না। আর সে পরকালে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।'

উক্ত আয়াতে স্পষ্ট করা হয়েছে, ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো জীবন ব্যবস্থা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাবে না। যারা অন্য কোনো জীবন ব্যবস্থায় প্রলুব্ধ হবে পরকালে তাদের কঠিন পরিণতির সম্মুখীন হতে হবে।

পাঁচটি স্তম্ভের ওপর ইসলাম প্রতিষ্ঠিত। প্রথমত, আল্লাহর একাত্ববাদ অর্থাৎ আল্লাহ এক এবং তাঁর কোনো শরিক নেই, এটিকে মনে-প্রাণে বিশ্বাসের পাশাপাশি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ রসুল হিসেবে স্বীকার করা। দ্বিতীয়ত, নামাজ আদায় করা, তৃতীয়ত জাকাত প্রদান করা, চতুর্থত, রোজা পালন করা এবং পঞ্চমত, পবিত্র কাবাঘরে হজ করা।

আল্লাহর কাছে নিজের সত্তাকে সমর্পণ করা ও সেই মহান সত্তার অনুগত থাকার জন্য এই পাঁচটি স্তম্ভের প্রতি মুমিনদের মনোযোগ নিবিষ্ট করতে হবে। আল্লাহর হুকুম-আহকাম পালনে আন্তরিক হতে হবে। তবে নিছক আল্লাহর হুকুম-আহকাম পালনই ইসলাম নয়। ইসলাম হলো আল্লাহর কাছে সম্পূর্ণভাবে আনুগত্য পোষণ করা। আল্লাহর রসুল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি সন্দেহাতীতভাবে ভালোবাসার প্রকাশ ঘটানো। হজরত আনাস (রা.) হতে বর্ণিত, রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, তোমাদের কেউ মুমিন হতে পারবে না, যে পর্যন্ত না আমি তার নিকট তার পিতা, তার সন্তান এবং অন্যান্য সব মানুষ হতে প্রিয়তম হই। (বোখারি)

নিজেকে আল্লাহর দীন ইসলামের অনুসারী বলে দাবি করতে হলে সর্বক্ষেত্রে দায়িত্বশীল হতে হবে। রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যার জবান ও হাত হতে মুসলমানরা নিরাপদ রয়েছেন তিনিই সত্যিকারের মুমিন।

লেখক : মাওলানা আবদুর রশিদ, গবেষক।