প্রিয় পাঠকগণ, আপনাদের অভিবাদন।
আমার সাংবাদিকতা জীবন খোলা বইয়ের মতো আপনাদের সামনে উন্মুক্ত। মানুষের জীবনে ভুল-ত্রুটি থাকে, কর্মজীবনে আমারও হয়তো ভুল-ত্রুটি ছিল। কিন্তু রিপোর্টার থেকে কলামিস্ট হিসেবে উঠে আসার পুরোটা সময় পেশাগত কাজকে আমি ইবাদতের মতো নেওয়ার চেষ্টা করেছি। মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বুকে নিয়ে যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে আমার বেড়ে ওঠা। একটি বৈষম্যহীন, অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র আমার চিন্তা ও চেতনায় লালিতই হয়নি, অস্থিমজ্জায় বসত গেঁড়েছে। স্রোতের বিপরীতে সাঁতার-কাটা মানুষ আমি। পেশাগত জীবনে নানামুখী টানাপোড়েন ও ঝুঁকি মোকাবেলা করেছি ধৈর্য্য, সাহস ও সহনশীলতা নিয়ে। জীবন মানেই যে সংগ্রাম- এই পাঠ আমি নিয়েছি ইতিহাসের পূর্বসুরীদের আদর্শ থেকে।
মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমার আদর্শ। শৈশবে দেখা মুক্তিযুদ্ধ আমার অহংকার। আমার দলের নাম মানুষ। তাই কোনো দলীয় সংকীর্ণতা নয় দেশ ও মানুষের স্বার্থই আমার কাছে বড়। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রাণশক্তি যুগিয়েছেন বার বার। তার ‘সত্য যে কঠিন, কঠিনেরে ভালবাসিলাম’ পংক্তি আমার এগিয়ে চলার মূলমন্ত্র। পেশার তারে জড়ানো জীবনে ভলতেয়ারের হৃদয়-ছোঁয়া উক্তি ‘আমি তোমার মতের সঙ্গে একমত নাও হতে পারি, কিন্তু তোমার মত প্রকাশের স্বাধীনতার জন্য জীবন দিতে পারি’ এই চিন্তা ও চেতনা লালন করে পথ হেঁটেছি। জীবনের উপলব্ধি থেকে কবি নজরুলের বাণী বিশ্বাস করতে শিখেছি ‘বিবেক বেঁচে থাকলে সুখ মরে যায়’।
জীবনের এই কঠিন সময়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, প্রথাগত চাকরি আর নয়। কবি জীবনানন্দ দাশের ভাষায়, “পৃথিবীতে নেই কোনো বিশুদ্ধ চাকুরি”। যত জায়গায় কাজ করেছি, আন্তরিকতা নিয়েই করেছি। সেইসব প্রতিষ্ঠানের প্রতি কৃতজ্ঞ।
কোনো শাসক বা ক্ষমতাবানের করুণাশ্রিত জীবন নয়, পেশাগত জীবনে আত্মমর্যাদার সঙ্গে সুলুকসন্ধানীর মতো চোখ-কান খোলা রেখে সত্যের মুখোমুখি হবার চেষ্টা করেছি। দেশ ও মানুষের স্বার্থের প্রশ্নে আপস করিনি। করপোরেট সংস্কৃতির এই যুগে চাকরি করা যত কঠিন, চাকরি না করে টিকে থাকার সংগ্রাম আরো কঠিন। আমি শেষ চ্যালেঞ্জটি গ্রহণ করেছি।
প্রিয় পাঠকগণ, আমি কখনো সম্পাদক হতে চাইনি। আপনাদের মতো আমিও জানি দলবাজি, সুবিধাবাজি, আর মূল্যবোধের অবক্ষয়ে রক্তাক্ত ক্ষত বিক্ষত আমাদের সমাজে আজ সাংবাদিকতার মতো মহান পেশাও অন্যান্য পেশার বাইরে যেতে পারেনি। সাংবাদিকতা পেশায় আজকাল কেউ তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, আবুল মনসুর আহমদ, জহুর চৌধুরী, কিংবা নিদেনপক্ষে এবিএম মুসা বা আতাউস সামাদ হতে চান না। সরকারি আনুকুল্য, রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে অনুকম্পা, আনুগত্য, সরকারি পদ পদবি নিতে চান। বরাবর ছোটখাটো সাধারণ মানুষ হয়েও নিজেকে সেই সব পূর্বসুরীদের উত্তরাধিকারীত্ব বহন করার চেষ্টা করেছি যারা এই মহান পেশাকে গৌরবের মর্যাদায় আসীন করেছিলেন। একদম সাধু ফেরেস্তা নই, তবুও অন্তহীন বেদনা, দহন, নানামুখী টানপোড়েন, ঝুঁকির পথকেই বেছে নিতে হয়েছে।
কিছু কিছু মানুষেরা পৃথিবীতে আলো ঝলমলে পরিবেশে আসেন, ভোগ বিলাসের রঙ মাখতে মাখতে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে চলে যান। কিছু কিছু মানুষ আসেন, সৃষ্টিশীলতার নেশায়। নতুনত্বের হাতছানিতে অন্তহীন বেদনা ও হাহাকার সয়ে হৃদয় ক্ষয়ে পথ হাঁটেন। লেখক, সাংবাদিক, কবি হন। যেমন আমাদের পূর্বসুরীরা জীবন ক্ষয়ে রাজনীতিবিদি হয়েছিলেন। এই সব মানুষেরা ঘোর অন্ধকার সময়ের মুখোমুখি হয়ে দীর্ঘ সুরঙ্গ কেটে আলোর সন্ধান করেন। আমি তাদের পথটিই গ্রহণ করেছিলাম। দুই দুই বার হৃদযন্ত্র মেরামত করার পরেও আমার স্বাধীনচেতা জাগ্রত বিবেকের ক্রন্দন, আকুলতা, দগ্ধ করেছে জীবনের পরতে পরতে। তাই না পেয়েছি স্বস্তি, না পেয়েছি নিরাপদ নিশ্চিন্ত জীবন। মত ও পথের অমিলের কারণে ৫২ বছরের জীবনের অর্ধেকেরও বেশি সময় পেশাগত জীবনে কাটালেও স্থায়ী ভাবে ঘর বাঁধতে পারিনি কোথাও। দশ বারেরও বেশি চাকরি ছেড়েছি।
জীবনে একবার এই বেলাতে এসে চাকরি খোয়াতে হয়েছে কেন তা অনেকেই জানেন। এর কারণ ব্যাখ্যা করে হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে চাই না। জীবনের মধ্যগগনের সূর্য অতিক্রম করে নিউজ পোর্টাল পূর্বপশ্চিমবিডি ডটকমের চ্যালেঞ্জ নিয়ে পথ হাঁটতে শুরু করেছি আজ। একদল অভিজ্ঞ আত্মমর্যাদা সম্পন্ন সাংবাদিকদের ছায়ায় তৈরি হয়েছে একটি উদ্যমী সংবাদকর্মীর টিম। পূর্বপশ্চিম ক্রিয়েটিভস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অনুজ প্রতিম সৈয়দ সারওয়ার রহমান, নিউজ পোর্টালের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক মুহাম্মদ রায়হানুর রহমান পীর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তথ্য প্রযুক্তিতে প্রথম শ্রেণী নিয়ে শিক্ষকতা করেছিলেন। সেটি ছেড়ে তারা তথ্য প্রযুক্তি খাতে নিজেদের মেধা ও মননশীলতাকে বিনিয়োগ করেন। তাদেরকে সঙ্গে নিয়েই আমাদের এই পূর্বপশ্চিম পরিবার। পূর্বপশ্চিম পরিবারের চৌকস মেধাবী সদস্য এস. জি ফারুক কলিন্সের পরিচালনায় মহিউদ্দিন মারুফ, একে মোহাম্মদ শরিফুল আলম, তানজীর আহমেদ দ্রুত সময়ে অফিস সাজিয়ে দিয়ে অনন্য ভুমিকা রেখেছেন। প্রিন্স ও রায়হান, দিবারাত্রি পরিশ্রম করে ওয়েবপোর্টাল ডিজাইনের কাজ সম্পন্ন করেছেন। পূর্বপশ্চিম বিডি ডটকমের উপদেষ্টা দেশবরেণ্য শিল্পী ধ্রুব এষ একুশের বইমেলা সামনে রেখেও তার ব্যস্ত সময়ের ফাঁকে গভীর আন্তরিকতা দিয়ে নিউজ পোর্টালের লোগো তৈরি করে দিয়েছেন। মত ও পথের অমিলে নানাসময়ে গণমাধ্যমে বাহাস হলেও আমার বন্ধু লেখক সাংবাদিক এবং গবেষণা সংস্থা পরিপ্রেক্ষিত ও বিজ্ঞাপনী সংস্থা ক্রিয়েটিভ মিডিয়ার চেয়ারম্যান সৈয়দ বোরহান কবীর পরামর্শ দিয়েছেন। দুটি নান্দনিক টেলিভিশন বিজ্ঞাপন তৈরি করে দিয়েছেন সৃষ্টিশীলতার সাক্ষর রেখে। অর্থমূল্য নেননি, হৃদয় মূল্য দিয়েছেন। পূর্ব পশ্চিম পরিবারের সঙ্গে উপদেষ্টা হিসেবে যুক্ত হয়ে ঢাকা স্টক এক্সেচেঞ্জের সাবেক পরিচালক ও লেখিকা খুজিস্তা-নুর ই নাহরীন মুন্নী, অভিনেত্রী নির্মাতা রোকেয়া প্রাচী, সংগীত শিল্পী সেলিম চৌধুরী, রাকসুর সাবেক পত্রিকা সম্পাদক জাকিরুল হক টিটন, স্থপতি লেখক ও নাট্যকার শাকুর মজিদ, নিয়মিত মিটিংয়ে থেকে তাদের হৃদয় নি:সৃত আন্তরিকতাই দেননি, নানামুখি আইডিয়াও দিয়েছেন। চিত্রনির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীও তার হৃদয় নিয়ে উপদেষ্টা হিসেবে পাশে দাঁড়িয়েছেন। নির্বাহী সম্পাদক দীপু হাসান, সহযোগী সম্পাদক শাকির আহমদ, উপ সম্পাদক সুবীর দাশ, শরীফ তালুকদার, প্রধান প্রতিবেদক প্রতীক ইজাজ, বার্তা সম্পাদক বিপুল হাসান, সিনিয়র সহকারী সম্পাদক রনজু রাইম, সমন্বয়কারী সেজুল হোসেন, বিশেষ প্রতিনিধি খোন্দকার সোহেল, সিনিয়র নিউজ রুম এডিটর নিপু বড়ুয়া, নতুনদের নিয়ে কর্মশালা থেকে টানা দু’মাসের প্রস্তুতি যুদ্ধে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন।
প্রিয় পাঠকগণ, দেশবরেণ্য বিভিন্ন শ্রেণী পেশার অনেকে এই চ্যালেঞ্জে আমার পাশে দাঁড়িয়েছেন, বিভিন্ন কর্পোরেট হাউজের আলোকিত মুখগুলো যে ভাবে সাহায্য করেছেন তাতে আমি অভিভূত। বিভিন্ন গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব স্নেহের ঋণে বন্দী করেছেন। সারাদেশের প্রতিনিধিদের সম্মিলনে ও সংবাদকর্মীদের কর্মশালায় প্রশিক্ষণ দিয়ে বন্ধুবর সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা, সামিয়া রহমান, পলাশ আহসান ও চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক আর রাজি সাহায্য করেছেন। প্রবাসের মুখগুলো স্বত:স্ফুর্তভাবে আমাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন।
প্রিয় পাঠকগণ, বাংলাদেশ প্রতিদিনে থাকাকালীন আমাদের ভাই বন্ধু, পরম আপনজন ডাক্তার জাহাঙ্গীর সাত্তার টিংকু ব্রেইন টিউমারে অকাল মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুকে ঘিরে তার প্রথম তারুণ্যের হাত ধরে বেড়ে ওঠা বন্ধু মোজাম্মেল বাবু এবং প্রয়াতের স্ত্রী খুজিস্তা নুর ই নাহরীন মুন্নীকে এই অকাল মৃত্যু নিয়ে লিখতে অনুরোধ করি। খুজিস্তা নুর ই নাহরীন মুন্নী তার ১৮ বছরের জীবনসঙ্গী ডাক্তার জাহাঙ্গীর সাত্তার টিংকুকে নিয়ে একটি হৃদয়স্পর্শী লেখা পাঠান। সেটি ছাপা হওয়ার পর ক্যানসারে অকালে চলে যাওয়া আরেক চলচ্চিত্রকার চাষী নজরুল ইসলাম টেলিফোন করে লেখিকার টেলিফোন নাম্বার নিয়ে যোগাযোগ করেন। তিনি চেয়েছিলেন, এই লেখার ওপর ভিত্তি করে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করবেন। ঘাতক ক্যান্সার তাকে সেই সুযোগ দেয়নি। টিংকুর বাড়ির মেঝেতে তার ফোঁটা ফোঁটা অশ্রুবিন্দু শুধু দীর্ঘশ্বাসের স্মৃতিচিহ্ন হয়ে রয়েছে। সেই থেকে আমার দেখা এক আত্মপ্রত্যয়ী সংগ্রামী বিদুষী নারী খুজিস্তা নুর ই নাহরীন নিয়মিত লেখালেখিতে আসেন। একদিন তিনি আলাপকালে আগামীতে প্রিন্ট মিডিয়ার বদলে অনলাইন মিডিয়া জনপ্রিয়তা পাবে বলে মন্তব্য করেন। পশ্চিমা দুনিয়ায় ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে প্রিন্ট মিডিয়া মুখ থুবড়ে পড়লেও দক্ষিন এশিয়ায় প্রিন্ট মিডিয়া মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে বলে তর্কে জিতে যাই। সেই বিতর্কের অনেকদিন পর দেখা যায় পশ্চিমা দুনিয়াই নয় দক্ষিণ এশিয়া এমনকি বাংলাদেশেও অনলাইন মিডিয়া মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। সরকার নীতিমালা প্রনয়ণের তোড়জোড় শুরু করেছে। অন্যদিকে প্রিণ্ট মিডিয়া থেকে বেরিয়ে আসার মধ্য দিয়ে ভেতরে তৈরি হওয়া একগুয়ে, ক্ষেপাটে, জেদি, সৃষ্টিশীল মনে নিজের মতো করে দাঁড়াবার তাড়া দেয়। নিজের সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় আমার চিন্তায় নিউজ পোর্টাল ঠাঁই পায়। সেই বীজ ডালপালা মেলতে শুরু করে যখন গেল কোরবানীর ঈদে লন্ডন ও নিউ ইয়র্ক সফরে যাই। প্রবাসী সতীর্থদের সঙ্গে এ নিয়ে আমার কথাবার্তা হয়। দুনিয়াজুড়ে যেখানেই যাই বিমান বন্দর থেকে শপিং মল, হোটেল লবি সবখানেই মুঠোফোনে অনলাইনে খবরপাঠ এক চেনা দৃশ্য হয়ে গেছে।
দেশে ফিরে আমার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে বনানীতে স্থপতি শাকুর মজিদের অফিসে যাই। সেখানের আড্ডায় যেতে ফোনটি করেছিলেন সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা। অস্থির পায়চারী করতে করতে বললাম, এবার নিজেই কিছু করবো। তারা দুজন তাকালেন। বললাম নিউজ পোর্টাল অনলাইন। শাকুর মজিদ একটি নাম বললেন। আমার পছন্দ হলো না। বললাম, পূর্বপশ্চিম। ইশতিয়াক রেজা ও তিনি সমর্থন দিলেন। সহযোগিতার আশ্বাস দিলেন। পূর্ব দিগন্তে সূর্য ওঠে পশ্চিমে লাল আভা ছড়াতে ছড়াতে তামাম দুনিয়ায় কত খবর ঘটে যায়! শুধু কি তাই? প্রিয় লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে পূর্ব পশ্চিম নামে যে ইতিহাস নির্ভর উপন্যাস লিখেছেন সেটি আমাদের অহংকার। শাকুর মজিদ কাকে জানি ফোন করলেন। সঙ্গে সঙ্গে ক্রেডিট কার্ডে ডোমেইন কিনে দিলেন। তারপর প্রিন্স ও রায়হান হয়ে একটি স্বপ্নের পূর্ণতা পেলো ধীরে ধীরে। এইখানে সাবেক ছাত্র নেতা আব্দুল্লাহিল কাইয়ুম উৎসাহ দিয়ে বললেন নামেই অর্ধেক এগিয়ে গেছেন আপনি। আমার এই যাত্রাপথে ভালোবাসা ও হৃদয় দিয়ে যারা সাথী হয়েছেন তাদের ঋণ কখনো শোধ হবার নয়।
প্রিয় পাঠকগণ,
মার্কিন সংবাদপত্র এসোসিয়েশন জরিপ করে বলেছে ২০৫০ সালে পৃথিবীতে প্রিন্ট মিডিয়া থাকছে না। সানডে টাইমস জরিপ করে বলেছে ইংল্যান্ডে ৫ বছর পর প্রিন্ট মিডিয়া থাকবে না। আমাদের দেশে প্রিন্ট মিডিয়া কম হলেও আরো দুই যুগ থাকবে। যদিও অনেকে বাড়িয়ে বলছেন আগামী দিনে অনলাইন টিভির কাছে ইলেকট্রনিক মিডিয়াও মুখ থুবড়ে পড়বে।
প্রিয় পাঠকগণ,
বাংলাদেশের তরুণ সমাজ এখন অনলাইন মিডিয়াকে শক্তিশালী গণমাধ্যমে রূপ দিয়েছে। তারুণ্যের এই শক্তির ওপর ভর করে আমাদের চ্যালেঞ্জ পিছিয়ে না থাকার। একুশ শতকের কান সংবাদপ্রধান, এই শ্লোগান নিয়ে বহুরৈখিক সংবাদ, মতামত, শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, রাজনীতি, প্রশাসন, অপরাধ জগৎ নিয়ে সব মত পথের মহাসম্মিলনে বাংলা ভাষাভাষী মানুষের মুক্তচিন্তার প্লাটফর্ম হচ্ছে পূর্বপশ্চিমবিডি ডটকম।
আমাদের স্বপ্ন আকাশছোঁয়া। অর্ধেক জীবন পার করে নেয়া এই চ্যালেঞ্জে আপনারা পাশে থাকুন, সর্বাত্মক সহযোগিতা করুন, আমরা আপনাদের নিয়ে পূর্বপশ্চিম বিডি ডটকমের পথ চলতে শুরু করেছি। আপনারা লিখুন, আপনারা মতামত দিন, আপনারা পরামর্শ দিন, মানুষের শক্তির চেয়ে কোন শক্তিকে আমরা বড় মনে করি না। মহাত্মা গান্ধী বলেছেন অপর পক্ষের মতামত গ্রহণ করার মানসকিতা না থাকলে গণতন্ত্রেও বিবর্তন সম্ভব নয়।
একজন দার্শনিক বলেছেন সত্য কারো একার সম্পদ নয়। প্রিয় পাঠক, সত্য জানার আগ্রহ অধিকার প্রতিিিট নাগরিকের। প্রতিটি মানুষের। খবর বন্ধ রাখার কোন সুযোগ আজকের দুনিয়ায় নেই। আপনাদের কাছে অঙ্গীকার করছি আমরা একটি অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক সমাজে বিশ্বাসী। এমন সময়ে আমরা এসেছি যখন দেশ নয়, দুনিয়া জুড়েই ধর্মের নামে সন্ত্রাসবাদ ছড়িয়ে পড়ছে। এক শ্বাসরুদ্ধকর প্রতিকুল পরিস্থিতি অতিক্রম করছে বিশ^। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের অহংকার। সন্ত্রাসবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার প্রশ্নে আমাদের আপোস নেই। আপনাদেরকে কথা দিচ্ছি আপনাদের মতামত আমরা প্রাধান্য দেব। আপনাদের সমালোচনার জবাব দেব। গালমন্দটুকু শুধু মুছে দেব। নির্মোহ সত্য প্রকাশে দ্বিধাহীন যেমন থাকবো, তেমনি কারো প্রতি ব্যক্তিগত রাগ ক্ষোভ বা বিদ্বেষ নিয়ে মনগড়া রিপোর্টে যাবো না। বিশ্ব সংসার তন্ন তন্ন করে আপনাদের সামনে যেমন পূর্ণসত্য উপস্থাপন করবো তেমনি আমাদের সাফল্যের অংশীদার করবো দেশ ও মানুষকে। আপনারা আস্থা রাখুন, সঙ্গে থাকুন।
পীর হাবিবুর রহমান
প্রধান সম্পাদক: পূর্বপশ্চিমবিডি ডটকম
পড়াই প্রথম বাণী । পড়ার সাথে সখ্যতা গড়ে তুলতে আমার প্রচেষ্টা । কবিতা আমার ভীষণ প্রিয় । Poetry touches my mind, moves me and makes me and forget self. তাই আমার প্রিয় কিছু কবিতা, প্রবন্ধ ও আরো কিছু বিষয় দিয়ে সাজিয়েছি আমার এ বর্ণমালার ঊচ্চারনের ব্লগ । এখানে বেড়াতে এসে যদি আপনার মনে সামান্য প্রশান্তির ছোঁয়া লাগে, তবে ভাববো আমার প্রচেষ্টা সার্থক হয়েছে ।
Monday, 30 November 2015
Sunday, 18 October 2015
শরণার্থী সমস্যা : -- আরব দেশগুলো কেন নিদায় নীরব?
ভূমধ্যসাগরতীরে মানবতার করুণ উপাখ্যান রচিত হচ্ছে প্রতিদিন। হাঙ্গেরিতেও কাঁটাতার পেরোতে গিয়ে পাঁচ বছর বয়সী ছেলেটার বাহু কেটে রক্তাক্ত হলেও সীমান্তরক্ষীরা শুনবে বলে সে একটুও কাঁদেনি। গর্ব করে তার বাবা বলেন, আমার ছেলেটা বীর। সাগরতীরে আয়লান কুর্দির লাশ হৃদয় ভেঙে দেয়, সৌদি আরব ও উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর উদাসীনতার দুর্গ তবু ভাঙে না।
৪০ লাখের বেশি সিরীয় দেশ থেকে দেশে, সীমান্ত থেকে সীমান্তে আশ্রয়ের সন্ধানে ভুগছে ও ছুটছে। অথচ যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব একযোগে নির্বিকার। সভ্যতার আঁতুড়ঘর বলা হতো ইরাক ও সিরিয়াকে। এখন তারা বধ্যভূমি। এখন খবর বের হচ্ছে আইএস তাদেরই সৃষ্টি। আর আইএস সৃষ্টি করছে লাখ লাখ উদ্বাস্তু। পাশ্চাত্যের মদদপুষ্ট জঙ্গিরা পৃথিবীতেই দোজখের মডেল দেখাচ্ছে। ব্যক্তিগতভাবেও
আরব ধনকুবেরদের দানে সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী এসব ধ্বংসের কারিগর। তুরস্কে আশ্রয় নেওয়া সিরীয় ওমর হারিরির কণ্ঠে তাই তিক্ত হতাশা, ‘তারা বিদ্রোহীদের সাহায্য করে, শরণার্থীদের দেখে না।’
উপসাগরীয় সালতানাতগুলো বিশ্বের শীর্ষ ধনী, অথচ শরণার্থীদের জন্য তাদের দরজা বন্ধ। যে কুয়েতিরা ১৯৯০ সালে ইরাকি হামলায় শরণার্থী হয়েছিল, সিরীয় শরণার্থীরা তাদের চোখে ‘ভিন্ন, আতঙ্কগ্রস্ত ও মানসিকভাবে অসুস্থ, আমাদের জীবনধারায় তারা বেমানান!’ ইরাক আক্রমণের পক্ষে জর্জ বুশের যুক্তিও ছিল এমন: তারা আমাদের জীবনধারা ধ্বংস করে দেবে। কিন্তু ভোগবিলাসে মত্ত থেকে স্বজাতি, স্বধর্মের আরবদের জীবন তছনছ করা কেমন সুস্থতা? ওদিকে ইয়েমেনে হামলা করে করে উদ্বাস্তুর ঢল প্রতিদিন বাড়িয়ে চলেছে সৌদি আরব। আরব উপদ্বীপ ও উপসাগরীয় দেশগুলোয় একজন সিরীয়ও আশ্রয় পায়নি। বরং আশ্রয় দেওয়ার পক্ষে বলায় আরব আমিরাত থেকে এক ফিলিস্তিনি ব্লগারকে বহিষ্কার করা হয়।
সিরিয়াকে অস্থিতিশীল করায় তুরস্কের ভূমিকাও কম নয়। তারপরও দেশটির ২০ লাখ আশ্রিত মানুষের মধ্যে ১৭ লাখ সিরীয় ও এক লাখ ইরাকি। লেবাননের প্রতি পাঁচজনের একজন সিরীয়। ইরাকেও আশ্রয় নিয়েছে আড়াই লাখ সিরীয়। আরবদের মধ্যে মিসর ও জর্ডানে রয়েছে যথাক্রমে ১ লাখ ৩০ হাজার ও ৬৩ হাজার সিরীয়। তিউনিসিয়ায় রয়েছে ২২ লাখ লিবীয়। আলজেরিয়ায় আছে ৫৫ হাজার।
শরণার্থীদের ডুবন্ত হাত যখন আরব শাসকেরা ফিরিয়ে দেয়, তখনই অগতির গতি হয় ইউরোপ। এ বছর ভূমধ্যসাগর পেরিয়েছে সাড়ে তিন লাখ শরণার্থী, এদের ২ হাজার ৬০০ জনের সলিলসমাধি ঘটেছে। গত সপ্তাহে অস্ট্রিয়ায় এক লরির ভেতর ৭১ জনের গলিত লাশ মেলে। তুরস্কের উপকূলে শিশু আয়লানের মৃত্যুদৃশ্যের অভিঘাতে পরদিনই জার্মানি সীমান্ত খুলে দেয়। তিন বছরের সেই শিশুটিই হয়ে ওঠে মানবতার আপন সন্তান। ইউরোপীয় বিবেক নড়ে ওঠে। নিজেদের হাতেও রক্ত ও কালিমার দাগ দেখে বিব্রত হয় তারা। ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী অভিবাসনকামীদের ‘পঙ্গপাল’ বললেও জনমতের চাপে দ্রুত অবস্থান বদলান। অথচ আরব িলগ, ওআইসি ও জিসিসি যেন অবশ। এ দেশগুলোর কোনোটিই শরণার্থীর অধিকার–বিষয়ক আন্তর্জাতিক কনভেনশনে স্বাক্ষর করেনি।
সৌদি আরবের অবস্থান তবু বদলায় না। আরব বসন্তের পর থেকে শিয়া, ফিলিস্তিনি ও সিরীয়দের আশ্রয় দেওয়ায় সেখানে নিষেধাজ্ঞা আছে। তাদের ভয়, এরা রাজতান্ত্রিক দুঃশাসন মানবে না বেশি দিন। সৌদি আরব ও আরব আমিরাত একজন শরণার্থীকেও আশ্রয় না দেওয়াকে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিনিধি ‘চরম লজ্জাজনক’ আখ্যা দেন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মুখপাত্রের ভাষায়, ‘দায়ের অংশীদার তারা হতে চায় না, তারা চায় অন্যরা বোঝা সামলাক, তারা কেবল চেক লিখে দিয়েই খালাস।’
সিরিয়ার বিপর্যয়ের দায় এককভাবে যুক্তরাষ্ট্রেরই বেশি। অথচ তাদের ‘রাইট টু প্রটেক্ট’ কিংবা ‘মানবিক হস্তক্ষেপের’ হাত সিরিয়ায় পৌঁছায় না। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের কিছু সদস্যের ভাষ্য, শরণার্থীরা সন্ত্রাসীদের পাইপলাইন বানাবে। অথচ যুক্তরাষ্ট্রই সেক্যুলার সিরিয়ায় গণতন্ত্র রপ্তানির নামে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের অস্ত্র দিয়েছে জঙ্গিদের। হাজার হাজার যুবককে প্রশিক্ষণ দিয়ে ‘মুক্তিযোদ্ধা’ খেতাব দিয়ে সন্ত্রাসের পাইপলাইন এখনো চালু রেখেছে।
জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেলের আট লাখ শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়ার অঙ্গীকার মহৎ দৃষ্টান্ত। জার্মানির এই উদারতার পেছনে রয়েছে অর্থনীতি ও সংস্কৃতি। তাদের জনসংখ্যা কমতির দিকে। উন্নতি বজায় রাখতে আরও শ্রমিক চাই। প্রচলিত কোটায় এত শ্রমিক আনা সম্ভব না। দ্বিতীয়ত, প্রধান দুই দল ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাট ও গ্রিন পার্টি একজোট হওয়ায় বর্ণবাদীদের আপত্তি ধোপে টিকছে না।
এই যুদ্ধের আগে সিরীয়রা কখনোই শরণার্থী হয়নি। পড়তে আসা সিরীয়রা আশ্রয়প্রার্থী হয়নি পাশ্চাত্যে। সেই সিরিয়ার এমন অবমাননায় আরবশাহির হাত থাকা লজ্জাজনক।
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।
bagharu@gmail.com
৪০ লাখের বেশি সিরীয় দেশ থেকে দেশে, সীমান্ত থেকে সীমান্তে আশ্রয়ের সন্ধানে ভুগছে ও ছুটছে। অথচ যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব একযোগে নির্বিকার। সভ্যতার আঁতুড়ঘর বলা হতো ইরাক ও সিরিয়াকে। এখন তারা বধ্যভূমি। এখন খবর বের হচ্ছে আইএস তাদেরই সৃষ্টি। আর আইএস সৃষ্টি করছে লাখ লাখ উদ্বাস্তু। পাশ্চাত্যের মদদপুষ্ট জঙ্গিরা পৃথিবীতেই দোজখের মডেল দেখাচ্ছে। ব্যক্তিগতভাবেও
আরব ধনকুবেরদের দানে সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী এসব ধ্বংসের কারিগর। তুরস্কে আশ্রয় নেওয়া সিরীয় ওমর হারিরির কণ্ঠে তাই তিক্ত হতাশা, ‘তারা বিদ্রোহীদের সাহায্য করে, শরণার্থীদের দেখে না।’
উপসাগরীয় সালতানাতগুলো বিশ্বের শীর্ষ ধনী, অথচ শরণার্থীদের জন্য তাদের দরজা বন্ধ। যে কুয়েতিরা ১৯৯০ সালে ইরাকি হামলায় শরণার্থী হয়েছিল, সিরীয় শরণার্থীরা তাদের চোখে ‘ভিন্ন, আতঙ্কগ্রস্ত ও মানসিকভাবে অসুস্থ, আমাদের জীবনধারায় তারা বেমানান!’ ইরাক আক্রমণের পক্ষে জর্জ বুশের যুক্তিও ছিল এমন: তারা আমাদের জীবনধারা ধ্বংস করে দেবে। কিন্তু ভোগবিলাসে মত্ত থেকে স্বজাতি, স্বধর্মের আরবদের জীবন তছনছ করা কেমন সুস্থতা? ওদিকে ইয়েমেনে হামলা করে করে উদ্বাস্তুর ঢল প্রতিদিন বাড়িয়ে চলেছে সৌদি আরব। আরব উপদ্বীপ ও উপসাগরীয় দেশগুলোয় একজন সিরীয়ও আশ্রয় পায়নি। বরং আশ্রয় দেওয়ার পক্ষে বলায় আরব আমিরাত থেকে এক ফিলিস্তিনি ব্লগারকে বহিষ্কার করা হয়।সিরিয়াকে অস্থিতিশীল করায় তুরস্কের ভূমিকাও কম নয়। তারপরও দেশটির ২০ লাখ আশ্রিত মানুষের মধ্যে ১৭ লাখ সিরীয় ও এক লাখ ইরাকি। লেবাননের প্রতি পাঁচজনের একজন সিরীয়। ইরাকেও আশ্রয় নিয়েছে আড়াই লাখ সিরীয়। আরবদের মধ্যে মিসর ও জর্ডানে রয়েছে যথাক্রমে ১ লাখ ৩০ হাজার ও ৬৩ হাজার সিরীয়। তিউনিসিয়ায় রয়েছে ২২ লাখ লিবীয়। আলজেরিয়ায় আছে ৫৫ হাজার।
শরণার্থীদের ডুবন্ত হাত যখন আরব শাসকেরা ফিরিয়ে দেয়, তখনই অগতির গতি হয় ইউরোপ। এ বছর ভূমধ্যসাগর পেরিয়েছে সাড়ে তিন লাখ শরণার্থী, এদের ২ হাজার ৬০০ জনের সলিলসমাধি ঘটেছে। গত সপ্তাহে অস্ট্রিয়ায় এক লরির ভেতর ৭১ জনের গলিত লাশ মেলে। তুরস্কের উপকূলে শিশু আয়লানের মৃত্যুদৃশ্যের অভিঘাতে পরদিনই জার্মানি সীমান্ত খুলে দেয়। তিন বছরের সেই শিশুটিই হয়ে ওঠে মানবতার আপন সন্তান। ইউরোপীয় বিবেক নড়ে ওঠে। নিজেদের হাতেও রক্ত ও কালিমার দাগ দেখে বিব্রত হয় তারা। ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী অভিবাসনকামীদের ‘পঙ্গপাল’ বললেও জনমতের চাপে দ্রুত অবস্থান বদলান। অথচ আরব িলগ, ওআইসি ও জিসিসি যেন অবশ। এ দেশগুলোর কোনোটিই শরণার্থীর অধিকার–বিষয়ক আন্তর্জাতিক কনভেনশনে স্বাক্ষর করেনি।
সৌদি আরবের অবস্থান তবু বদলায় না। আরব বসন্তের পর থেকে শিয়া, ফিলিস্তিনি ও সিরীয়দের আশ্রয় দেওয়ায় সেখানে নিষেধাজ্ঞা আছে। তাদের ভয়, এরা রাজতান্ত্রিক দুঃশাসন মানবে না বেশি দিন। সৌদি আরব ও আরব আমিরাত একজন শরণার্থীকেও আশ্রয় না দেওয়াকে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিনিধি ‘চরম লজ্জাজনক’ আখ্যা দেন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মুখপাত্রের ভাষায়, ‘দায়ের অংশীদার তারা হতে চায় না, তারা চায় অন্যরা বোঝা সামলাক, তারা কেবল চেক লিখে দিয়েই খালাস।’
সিরিয়ার বিপর্যয়ের দায় এককভাবে যুক্তরাষ্ট্রেরই বেশি। অথচ তাদের ‘রাইট টু প্রটেক্ট’ কিংবা ‘মানবিক হস্তক্ষেপের’ হাত সিরিয়ায় পৌঁছায় না। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের কিছু সদস্যের ভাষ্য, শরণার্থীরা সন্ত্রাসীদের পাইপলাইন বানাবে। অথচ যুক্তরাষ্ট্রই সেক্যুলার সিরিয়ায় গণতন্ত্র রপ্তানির নামে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের অস্ত্র দিয়েছে জঙ্গিদের। হাজার হাজার যুবককে প্রশিক্ষণ দিয়ে ‘মুক্তিযোদ্ধা’ খেতাব দিয়ে সন্ত্রাসের পাইপলাইন এখনো চালু রেখেছে।
জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেলের আট লাখ শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়ার অঙ্গীকার মহৎ দৃষ্টান্ত। জার্মানির এই উদারতার পেছনে রয়েছে অর্থনীতি ও সংস্কৃতি। তাদের জনসংখ্যা কমতির দিকে। উন্নতি বজায় রাখতে আরও শ্রমিক চাই। প্রচলিত কোটায় এত শ্রমিক আনা সম্ভব না। দ্বিতীয়ত, প্রধান দুই দল ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাট ও গ্রিন পার্টি একজোট হওয়ায় বর্ণবাদীদের আপত্তি ধোপে টিকছে না।
এই যুদ্ধের আগে সিরীয়রা কখনোই শরণার্থী হয়নি। পড়তে আসা সিরীয়রা আশ্রয়প্রার্থী হয়নি পাশ্চাত্যে। সেই সিরিয়ার এমন অবমাননায় আরবশাহির হাত থাকা লজ্জাজনক।
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।
bagharu@gmail.com
মানুষ হত্যার এমন উৎসব আগে কখনো দেখা যায়নি
কোথাও যুদ্ধ হয়, বেশুমার মানুষ মরে। আমরা তার খবর পড়ি আর ভুলে যাই। বাড়ির পাশে ‘বন্দুকযুদ্ধ’ হয়, পরদিন খবরের কাগজ থেকে জানা যায়, আরও একটি লাশ পড়েছে। যুদ্ধে যে মারে তার জবাবদিহি হয় না। যাদের মারা যায়, তারাও জানে এসব হত্যার বিচার হবে না; হয় না কদাচিৎ। নিহত স্বজনের লাশ পাওয়ার আর আদরযত্নে আর শোকে তাকে দাফন করার সুযোগও থাকে না যুদ্ধের দিনে। যুদ্ধ থামলে হয়তো সুযোগ পেলে তারা স্বজনের শেষনিঃশ্বাস ছাড়ার জায়গাটা দেখে আসে। পারলে গণকবর খুঁজে বের করে ফুল দেয়। তারপর আবার ফিরে আসে যার যার জীবনে। জীবন এমন এক কঠিন কারাগার, যেখানে ফিরতেই হয়।
বাংলাদেশে অপঘাতে মৃত্যুও এক নাছোড় দানব, যার লাশের ক্ষুধা মেটাতে হয় প্রতিদিন। এখানে এখন গড়ে প্রতিদিন একজন মানুষ মারা যাচ্ছে ‘যুদ্ধে’। যুদ্ধই বলছি, কারণ সরকারি বাহিনীগুলো এসব হত্যাকাণ্ডকে যুদ্ধের পরিভাষা দিয়েই চিনিয়েছে: ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ ইত্যাদি। কথাশিল্পী মাহমুদুল হকের একটি গল্পের নাম ছিল ‘প্রতিদিন একটি রুমাল’। এখন আমাদের খবরের কাগজের শিরোনাম হয় ‘প্রতিদিন গড়ে একটি হত্যা’।
খুন করে নদীতে লাশ ভাসিয়ে দেওয়ার ‘ঐতিহ্য’ আছে বাংলাদেশে। প্রায়ই নদীর ধারে নিয়ে গিয়ে খুন করে লাশ ডোবানোর ঘটনা সংবাদে আসে। লঞ্চডুবির পরও অজস্র লাশ ভাসে। একাত্তর সালে, পাকিস্তানি বাহিনী নদীর ধারে সারবেঁধে বাঙালিদের দাঁড় করিয়ে গুলি করত। দেহগুলো নদীতে পড়ে ভাসতে ভাসতে কাক-শকুন আর মাছের খোরাক হতো। পুরাকালে সাপে কাটা কিংবা বেওয়ারিশ লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেওয়ার রীতিও ছিল। এখনকার রীতি হলো বন্দুকযুদ্ধ। সবাই জানে এসব আসলে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড।
এত মৃত্যুর জন্য পেশাদার বাহিনী লাগে, প্রয়োজন হয় ‘ডেথ স্কোয়াডের’। আমাদেরই চারপাশে তারা থাকে, খায়, ঘুমায়, আনন্দ করে, টহল দেয়। তারপর তালিকা ধরে ধরে মধ্যরাত থেকে ভোরের কোনো সময়ে নদীর বাঁধ বা খেতের কিনারে নিয়ে শিকারকে হত্যা করে। এ রকম করে প্রতিদিন একটি রুমাল এখন কার প্রয়োজন?
এই মৃত্যুর চানমারি শুরু হয়েছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরুদ্ধে জামায়াত-শিবিরের সহিংস প্রতিরোধের মাধ্যমে। যে সহিংসতা তারা শুরু করেছিল, আজ তা-ই বহুগুণে বড় হয়ে হয়ে তাদের বিনাশ করছে। সেই ককটেল, পেট্রলবোমা—যার শুদ্ধ নাম মলোটভ ককটেল খুবই গরিব-দরদি। বেছে বেছে মেহনতি মানুষকেই তারা হত্যা করত। সেটা এমন সময়, যখন সরকারি দলের সমর্থকদেরও কেউ কেউ বোমা-বারুদসহ জনতার হাতে ধৃত হয়েছে। অন্যদিকে বিরোধী দলের লোকেরা তো আগুন নিয়ে খেলছিলই। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর হঠাৎ সেই সব বোমাবাজ গায়েব হয়ে গেল। কোথায় গেল? এখন কেন আর তাদের প্রয়োজন হচ্ছে না?
এসব ককটেল আর পেট্রলবোমা সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছে সাধারণ মানুষের, দ্বিতীয় ক্ষতিগ্রস্ত বিরোধীদের ভাবমূর্তি। এর জন্য তাদের জনপ্রিয়তা কমেছে। অন্যদিকে হিসাব করলে বোঝা যায়, লাভবান হয়েছে ‘সরকার’। সেই লাভ এমনই লাভ যে নির্বাচন, গণতন্ত্র, জনপ্রতিনিধিত্ব—সবকিছুই ওই ‘পেট্রলবোমার’ ভয়ে উবে গেল, তেমন কোনো আহাজারিও করল না কেউ।
আগুন দিয়ে চলন্ত বাস-গাড়ি-ট্রাকে নিরীহ মানুষ পুড়িয়ে মারার মতো নৃশংসতা কি একাত্তরের পরে দেখেছে বাংলাদেশ? হ্যাঁ, কি স্বৈরশাসক, কি নির্বাচিত শাসক—সব আমলেই গুলি চলেছে। কিন্তু মানুষ হত্যার এমন উৎসব আগে কখনো দেখা যায়নি। ২০১৩ সালে এ রকম রাজনৈতিক সহিংসতায় ৫০৭ জন নিহত হন। এখন শোনা যাচ্ছে, জামায়াতি সন্ত্রাসীদেরই নাকি খুঁজে খুঁজে হত্যা করা হচ্ছে। সরকারের বিভিন্ন নেতা-নেত্রী পরোক্ষভাবে এসব হত্যাকাণ্ডকে জায়েজ করে বক্তব্য দিয়েছেন।
অবাক হওয়ার কিছু নেই, আমরা যাঁরা পকেটমারকে পিটিয়ে মেরে ফেলে উচিত শিক্ষা দিই, তাঁদের অনেকেই এ রকম আইনবহির্ভূত হত্যাকে সমর্থন করছেন। এই সমর্থনের শুরু হয়েছিল বিএনপি আমলের অপারেশন ক্লিন হার্টের সময়। তারপর এল ক্রসফায়ার। অনেকেই এটাকেই সন্ত্রাস দমনের ধন্বন্তরি পথ বলে বাহবা দিলেন। কিন্তু তাতে কি জনগণের নিরাপত্তাহীনতা কমেছে? রাজনীতি থেকে সহিংসতা দূর হয়েছে? নাকি তা আরও বহুগুণে বেড়েছে। এখন আর বিচ্ছিন্ন সন্ত্রাস হয় না। এখন হয় বেআইনি ও আইনি বাহিনীর সংঘবদ্ধ হত্যাযজ্ঞ। পৌরাণিক কাহিনিতে পরশুরাম পাপের বিনাশে কুঠার হাতে নিজের বংশকেই নাশ করেছিলেন। নদীর তীর ধরে তিনি হত্যা করতে করতে এগিয়ে গিয়েছিলেন। পরিণামে সেই কুঠার তাঁর হাতের অংশ হয়ে যায়, কোনোভাবেই তাকে ছাড়ানো যায় না। অবশেষে করতোয়া নদীর জলে হাত ধুলে সেই ঘাতক
কুঠার খসে। রাষ্ট্রের হাতে যাঁরা পরশুরামের কুঠার তুলে দিয়েছেন, আশা করছেন প্রতিপক্ষ বিনাশেই সেটা শেষ হবে, তাঁরা ভুল করছেন।
র্যাবের জন্ম দিয়েছিল বিএনপি, অথচ আজ তারাই এই বাহিনীর বিচারবহির্ভূত হত্যা নিয়ে সোচ্চার। যে আওয়ামী লীগ ২০০৮-এর নির্বাচনী ইশতেহারে ক্রসফায়ার বন্ধের কথা বলেছিল, আজ তারাই হয়েছে ‘বন্দুকযুদ্ধের’ প্রবর্তক। হত্যা আরও হত্যা ডেকে আনে; এই সত্য তারা ভুলে
যেতে পারে, কিন্তু নাগরিক হিসেবে আমাদের জন্য এমন বিস্মরণ হবে আত্মঘাতী।
যারা পেট্রলবোমায় মানুষ মেরেছে, তাদের বিচার করতে অসুবিধা কোথায়? এত মৃত্যু যাদের হাতে ঘটেছে, তাদের নিশ্চয়ই একটা পরিকল্পনা ছিল, উদ্দেশ্য ছিল, সহায়-সরঞ্জাম ও তহবিল ছিল। তার চেয়েও বড় কথা, তাদের ছিল ‘নিয়োগদাতা, হুকুমদাতা’। আটক করে বিচার করলে তাদের মুখ থেকে সম্পূর্ণ সত্যটা মানুষ জানতে পারত। যে রাজনীতি এ রকম হত্যার আয়োজন চালায়, তাদের মুখোশ খসে পড়ত। কিন্তু সরকার সেই জরুরি কাজটা কেন করছে না? সত্য উন্মোচনে তাদের কিসের ভয়? এ ধরনের রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড শেষাবধি রাজনীতিকেই হত্যা করে। হত্যা করে আইন, যুক্তি ও ন্যায়কে।
সত্য নেই, রয়েছে গুজব। ভূতের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি করে না আধুনিক কোনো সরকার; কিন্তু জগতে এমন সরকার কম যে গুজবের বিরুদ্ধে লড়াই করে না। এ যেন হাওয়ায় তরবারি চালিয়ে গুজবের আগামাথা তরমুজের মতো ফালাফালা করার কারবার। যখন সত্য বিতর্কিত বা জানার অতীত, তেমন সময়ই গুজবের বসন্ত। সময়ের জ্বলন্ত প্রশ্নগুলোয় যে-ই হাত দিচ্ছে, তার হাতই পুড়ে যাচ্ছে। সরকারি প্রেসনোটের মধ্যিখানে ফোকর ধরা পড়লে জানবেন, সত্যটা ওই পথেই পগারপার। এমন দিনেই তারে বলা যায়: মতিঝিলে নাকি...রানা প্লাজার রেশমা নাকি...বিএনপি নাকি..., বন্দুকযুদ্ধ নাকি... ইত্যাদি। গুজবে উত্তর থাকে না, থাকে সময়ের সবচেয়ে জ্বলন্ত ও জরুরি প্রশ্ন। সবলের বিরুদ্ধে গুজব দুর্বলের অস্ত্র। যখন সত্যের কারবারিরা জনমনের আস্থা হারায়, তখন ‘নাকি’ শব্দটা আমাদের বাক্যের মধ্যে খিল গেড়ে প্রতিষ্ঠিত মিডিয়াকে প্রশ্ন করে, ‘তোমরা নাকি...’। আমাদের কালের দুর্ধর্ষ গুজব রাশি সেসব প্রশ্নেরই উত্তর প্রস্তাব করে, একচক্ষু সরকার যার ওপর ধামা হয়ে চেপে বসেছে; যার উত্তর দিতে ব্যর্থ হয়েছে। বন্দুকযুদ্ধ নিয়ে, প্রতিদিন একটি বা ততোধিক হত্যা নিয়েও গুজব ডানা মেলা শুরু করেছে।
তাহলেও সরকার নড়বে না চড়বে না। সাগর-রুনির মতো ব্যাখ্যাতীত অনেক মৃত্যুর প্রতিকারে ব্যাখ্যাতীত দায়িত্বহীনতা দেখিয়েই যাবে। কেবল নদীমাতৃক বাংলাদেশের নদীগুলো মায়ের মতো অসীম মমতায় অপঘাতে নিহত সন্তানদের লাশ বুকে নিয়ে বইতে থাকবে। বইতেই থাকবে। যারা বন্দুকযুদ্ধ বা ক্রসফায়ার বা পেট্রলবোমায় নিহতদের লাশ আনতে যায়, সকালে বা সন্ধ্যায়, তাদের বোবা প্রতিবাদের ভাষা পড়ার ক্ষমতা জাতি হিসেবেই হয়তো আমরা হারিয়ে ফেলেছি।
তুর্কি চলচ্চিত্রকার ইলমাজ গুনের ছবি ইওল। ছবির একটি দৃশ্যে কুর্দিস্তানের বিদ্রোহীদের লাশ নিয়ে আসতে দেখা যায় সেনাদের। তাদের ট্রাকের পেছনটায় সার সার লাশ। ট্রাকটা একের পর এক কুর্দি গ্রামে ঢোকে, আর গ্রামবাসীদের বলা হয় লাশ শনাক্ত করতে। তারা বাধ্য হয় সারবেঁধে নির্বিকার মুখে একে একে লাশগুলো দেখে যেতে। একটি লাশের সামনে এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়াতে দেখা যায় এক বাবাকে। সেনারা এগিয়ে আসে, চোখে প্রশ্ন: আপনার? লোকটি নীরবে মাথা নাড়িয়ে সরে যায়। নিজের ছেলের লাশ শনাক্ত করাও যে বিপদ! বাংলাদেশে আমরা ধন্য, আমাদের বাবাদের নিহত ছেলের লাশ শনাক্ত করার সুযোগ আছে।
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।
bagharu@gmail.com
বাংলাদেশে অপঘাতে মৃত্যুও এক নাছোড় দানব, যার লাশের ক্ষুধা মেটাতে হয় প্রতিদিন। এখানে এখন গড়ে প্রতিদিন একজন মানুষ মারা যাচ্ছে ‘যুদ্ধে’। যুদ্ধই বলছি, কারণ সরকারি বাহিনীগুলো এসব হত্যাকাণ্ডকে যুদ্ধের পরিভাষা দিয়েই চিনিয়েছে: ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ ইত্যাদি। কথাশিল্পী মাহমুদুল হকের একটি গল্পের নাম ছিল ‘প্রতিদিন একটি রুমাল’। এখন আমাদের খবরের কাগজের শিরোনাম হয় ‘প্রতিদিন গড়ে একটি হত্যা’।
খুন করে নদীতে লাশ ভাসিয়ে দেওয়ার ‘ঐতিহ্য’ আছে বাংলাদেশে। প্রায়ই নদীর ধারে নিয়ে গিয়ে খুন করে লাশ ডোবানোর ঘটনা সংবাদে আসে। লঞ্চডুবির পরও অজস্র লাশ ভাসে। একাত্তর সালে, পাকিস্তানি বাহিনী নদীর ধারে সারবেঁধে বাঙালিদের দাঁড় করিয়ে গুলি করত। দেহগুলো নদীতে পড়ে ভাসতে ভাসতে কাক-শকুন আর মাছের খোরাক হতো। পুরাকালে সাপে কাটা কিংবা বেওয়ারিশ লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেওয়ার রীতিও ছিল। এখনকার রীতি হলো বন্দুকযুদ্ধ। সবাই জানে এসব আসলে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড।
এত মৃত্যুর জন্য পেশাদার বাহিনী লাগে, প্রয়োজন হয় ‘ডেথ স্কোয়াডের’। আমাদেরই চারপাশে তারা থাকে, খায়, ঘুমায়, আনন্দ করে, টহল দেয়। তারপর তালিকা ধরে ধরে মধ্যরাত থেকে ভোরের কোনো সময়ে নদীর বাঁধ বা খেতের কিনারে নিয়ে শিকারকে হত্যা করে। এ রকম করে প্রতিদিন একটি রুমাল এখন কার প্রয়োজন?
এই মৃত্যুর চানমারি শুরু হয়েছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরুদ্ধে জামায়াত-শিবিরের সহিংস প্রতিরোধের মাধ্যমে। যে সহিংসতা তারা শুরু করেছিল, আজ তা-ই বহুগুণে বড় হয়ে হয়ে তাদের বিনাশ করছে। সেই ককটেল, পেট্রলবোমা—যার শুদ্ধ নাম মলোটভ ককটেল খুবই গরিব-দরদি। বেছে বেছে মেহনতি মানুষকেই তারা হত্যা করত। সেটা এমন সময়, যখন সরকারি দলের সমর্থকদেরও কেউ কেউ বোমা-বারুদসহ জনতার হাতে ধৃত হয়েছে। অন্যদিকে বিরোধী দলের লোকেরা তো আগুন নিয়ে খেলছিলই। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর হঠাৎ সেই সব বোমাবাজ গায়েব হয়ে গেল। কোথায় গেল? এখন কেন আর তাদের প্রয়োজন হচ্ছে না?
এসব ককটেল আর পেট্রলবোমা সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছে সাধারণ মানুষের, দ্বিতীয় ক্ষতিগ্রস্ত বিরোধীদের ভাবমূর্তি। এর জন্য তাদের জনপ্রিয়তা কমেছে। অন্যদিকে হিসাব করলে বোঝা যায়, লাভবান হয়েছে ‘সরকার’। সেই লাভ এমনই লাভ যে নির্বাচন, গণতন্ত্র, জনপ্রতিনিধিত্ব—সবকিছুই ওই ‘পেট্রলবোমার’ ভয়ে উবে গেল, তেমন কোনো আহাজারিও করল না কেউ।
আগুন দিয়ে চলন্ত বাস-গাড়ি-ট্রাকে নিরীহ মানুষ পুড়িয়ে মারার মতো নৃশংসতা কি একাত্তরের পরে দেখেছে বাংলাদেশ? হ্যাঁ, কি স্বৈরশাসক, কি নির্বাচিত শাসক—সব আমলেই গুলি চলেছে। কিন্তু মানুষ হত্যার এমন উৎসব আগে কখনো দেখা যায়নি। ২০১৩ সালে এ রকম রাজনৈতিক সহিংসতায় ৫০৭ জন নিহত হন। এখন শোনা যাচ্ছে, জামায়াতি সন্ত্রাসীদেরই নাকি খুঁজে খুঁজে হত্যা করা হচ্ছে। সরকারের বিভিন্ন নেতা-নেত্রী পরোক্ষভাবে এসব হত্যাকাণ্ডকে জায়েজ করে বক্তব্য দিয়েছেন।
অবাক হওয়ার কিছু নেই, আমরা যাঁরা পকেটমারকে পিটিয়ে মেরে ফেলে উচিত শিক্ষা দিই, তাঁদের অনেকেই এ রকম আইনবহির্ভূত হত্যাকে সমর্থন করছেন। এই সমর্থনের শুরু হয়েছিল বিএনপি আমলের অপারেশন ক্লিন হার্টের সময়। তারপর এল ক্রসফায়ার। অনেকেই এটাকেই সন্ত্রাস দমনের ধন্বন্তরি পথ বলে বাহবা দিলেন। কিন্তু তাতে কি জনগণের নিরাপত্তাহীনতা কমেছে? রাজনীতি থেকে সহিংসতা দূর হয়েছে? নাকি তা আরও বহুগুণে বেড়েছে। এখন আর বিচ্ছিন্ন সন্ত্রাস হয় না। এখন হয় বেআইনি ও আইনি বাহিনীর সংঘবদ্ধ হত্যাযজ্ঞ। পৌরাণিক কাহিনিতে পরশুরাম পাপের বিনাশে কুঠার হাতে নিজের বংশকেই নাশ করেছিলেন। নদীর তীর ধরে তিনি হত্যা করতে করতে এগিয়ে গিয়েছিলেন। পরিণামে সেই কুঠার তাঁর হাতের অংশ হয়ে যায়, কোনোভাবেই তাকে ছাড়ানো যায় না। অবশেষে করতোয়া নদীর জলে হাত ধুলে সেই ঘাতক
কুঠার খসে। রাষ্ট্রের হাতে যাঁরা পরশুরামের কুঠার তুলে দিয়েছেন, আশা করছেন প্রতিপক্ষ বিনাশেই সেটা শেষ হবে, তাঁরা ভুল করছেন।
র্যাবের জন্ম দিয়েছিল বিএনপি, অথচ আজ তারাই এই বাহিনীর বিচারবহির্ভূত হত্যা নিয়ে সোচ্চার। যে আওয়ামী লীগ ২০০৮-এর নির্বাচনী ইশতেহারে ক্রসফায়ার বন্ধের কথা বলেছিল, আজ তারাই হয়েছে ‘বন্দুকযুদ্ধের’ প্রবর্তক। হত্যা আরও হত্যা ডেকে আনে; এই সত্য তারা ভুলে
যেতে পারে, কিন্তু নাগরিক হিসেবে আমাদের জন্য এমন বিস্মরণ হবে আত্মঘাতী।
যারা পেট্রলবোমায় মানুষ মেরেছে, তাদের বিচার করতে অসুবিধা কোথায়? এত মৃত্যু যাদের হাতে ঘটেছে, তাদের নিশ্চয়ই একটা পরিকল্পনা ছিল, উদ্দেশ্য ছিল, সহায়-সরঞ্জাম ও তহবিল ছিল। তার চেয়েও বড় কথা, তাদের ছিল ‘নিয়োগদাতা, হুকুমদাতা’। আটক করে বিচার করলে তাদের মুখ থেকে সম্পূর্ণ সত্যটা মানুষ জানতে পারত। যে রাজনীতি এ রকম হত্যার আয়োজন চালায়, তাদের মুখোশ খসে পড়ত। কিন্তু সরকার সেই জরুরি কাজটা কেন করছে না? সত্য উন্মোচনে তাদের কিসের ভয়? এ ধরনের রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড শেষাবধি রাজনীতিকেই হত্যা করে। হত্যা করে আইন, যুক্তি ও ন্যায়কে।
সত্য নেই, রয়েছে গুজব। ভূতের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি করে না আধুনিক কোনো সরকার; কিন্তু জগতে এমন সরকার কম যে গুজবের বিরুদ্ধে লড়াই করে না। এ যেন হাওয়ায় তরবারি চালিয়ে গুজবের আগামাথা তরমুজের মতো ফালাফালা করার কারবার। যখন সত্য বিতর্কিত বা জানার অতীত, তেমন সময়ই গুজবের বসন্ত। সময়ের জ্বলন্ত প্রশ্নগুলোয় যে-ই হাত দিচ্ছে, তার হাতই পুড়ে যাচ্ছে। সরকারি প্রেসনোটের মধ্যিখানে ফোকর ধরা পড়লে জানবেন, সত্যটা ওই পথেই পগারপার। এমন দিনেই তারে বলা যায়: মতিঝিলে নাকি...রানা প্লাজার রেশমা নাকি...বিএনপি নাকি..., বন্দুকযুদ্ধ নাকি... ইত্যাদি। গুজবে উত্তর থাকে না, থাকে সময়ের সবচেয়ে জ্বলন্ত ও জরুরি প্রশ্ন। সবলের বিরুদ্ধে গুজব দুর্বলের অস্ত্র। যখন সত্যের কারবারিরা জনমনের আস্থা হারায়, তখন ‘নাকি’ শব্দটা আমাদের বাক্যের মধ্যে খিল গেড়ে প্রতিষ্ঠিত মিডিয়াকে প্রশ্ন করে, ‘তোমরা নাকি...’। আমাদের কালের দুর্ধর্ষ গুজব রাশি সেসব প্রশ্নেরই উত্তর প্রস্তাব করে, একচক্ষু সরকার যার ওপর ধামা হয়ে চেপে বসেছে; যার উত্তর দিতে ব্যর্থ হয়েছে। বন্দুকযুদ্ধ নিয়ে, প্রতিদিন একটি বা ততোধিক হত্যা নিয়েও গুজব ডানা মেলা শুরু করেছে।
তাহলেও সরকার নড়বে না চড়বে না। সাগর-রুনির মতো ব্যাখ্যাতীত অনেক মৃত্যুর প্রতিকারে ব্যাখ্যাতীত দায়িত্বহীনতা দেখিয়েই যাবে। কেবল নদীমাতৃক বাংলাদেশের নদীগুলো মায়ের মতো অসীম মমতায় অপঘাতে নিহত সন্তানদের লাশ বুকে নিয়ে বইতে থাকবে। বইতেই থাকবে। যারা বন্দুকযুদ্ধ বা ক্রসফায়ার বা পেট্রলবোমায় নিহতদের লাশ আনতে যায়, সকালে বা সন্ধ্যায়, তাদের বোবা প্রতিবাদের ভাষা পড়ার ক্ষমতা জাতি হিসেবেই হয়তো আমরা হারিয়ে ফেলেছি।
তুর্কি চলচ্চিত্রকার ইলমাজ গুনের ছবি ইওল। ছবির একটি দৃশ্যে কুর্দিস্তানের বিদ্রোহীদের লাশ নিয়ে আসতে দেখা যায় সেনাদের। তাদের ট্রাকের পেছনটায় সার সার লাশ। ট্রাকটা একের পর এক কুর্দি গ্রামে ঢোকে, আর গ্রামবাসীদের বলা হয় লাশ শনাক্ত করতে। তারা বাধ্য হয় সারবেঁধে নির্বিকার মুখে একে একে লাশগুলো দেখে যেতে। একটি লাশের সামনে এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়াতে দেখা যায় এক বাবাকে। সেনারা এগিয়ে আসে, চোখে প্রশ্ন: আপনার? লোকটি নীরবে মাথা নাড়িয়ে সরে যায়। নিজের ছেলের লাশ শনাক্ত করাও যে বিপদ! বাংলাদেশে আমরা ধন্য, আমাদের বাবাদের নিহত ছেলের লাশ শনাক্ত করার সুযোগ আছে।
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।
bagharu@gmail.com
Subscribe to:
Posts (Atom)
